শুঁটকির মৌসুম
কর্ণফুলী তীরে উৎসব
চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর তীরে মাচায় মাচায় শুঁটকি তৈরির ব্যস্ততা- মো. রাশেদ
সারোয়ার সুমন, চট্টগ্রাম
প্রকাশ: ০৭ ডিসেম্বর ২০১৯ | ১৫:২৯ | আপডেট: ০৭ ডিসেম্বর ২০১৯ | ১৫:৫৪
'ও বিদেশি বন্ধু, দাওয়াত দিলাম চাটগাঁয় আইবুল্লায়/ক'দিনর লাই যাইওরে বেড়াই/পতেঙ্গা বেড়াইতাম নিয়ুম/শুঁটকি মাছ দি ভাত হাবাইয়ুম/একবার হাইলে ভুইলতা নঅ রে ভাই'- আঞ্চলিক গানের খ্যাতিমান শিল্পী সঞ্জিত আচার্য্যের কথায় শুঁটকি এসেছে এমন রসালো রূপে। যদিও বাংলা অভিধানে শুঁটকি শব্দের অর্থ লেখা হয়েছে 'অত্যন্ত কৃশকায়' ও 'লাবণ্যহীনা'। অভিধান লাবণ্যহীনা বললেও চট্টগ্রামের ঐতিহ্যের সঙ্গে মিশে আছে এই শুঁটকি। তাই প্রতি বছর হালকা শীতে শুঁটকি তৈরির ধুম পড়ে চট্টগ্রামের সাগরপাড়ে। নভেম্বরের শুরুতে কদর বেশি থাকে ছোট জাতের শুঁটকির। আর বড় শুঁটকির মৌসুম শুরু হবে বেশি শীতে।
শীতকালে বাতাসে আর্দ্রতা কম থাকায় দ্রুত শুকায় শুঁটকি। এ জন্য বছরের এ সময়ে কর্ণফুলীর দুই পাড়ে শুরু হয় শুঁটকি তৈরির উৎসব। একটু বড় আকারের শুঁটকির জন্য বাঁশ দিয়ে 'চাঙ' সাজানো হয়। আর ছোট জাতের শুঁটকি শুকাতে তৈরি করা হয় মাচাঙ। সরেজমিন দেখা যায়, শুঁটকি শুকানো হচ্ছে কয়েক ধাপে। প্রথমে মাছের পেট থেকে নাড়ি-ভুঁড়ি বের করে একটি দল। আরেক দল পেট কাটা মাছ ধুয়ে নিচ্ছে পানিতে। কেউ সেই ধোয়া মাছ শুকাচ্ছে। কেউবা হালকা শুকানো মাছে লাগাচ্ছে লবণ। শুঁটকি নিয়ে এমন কর্মব্যস্ত সময় কাটাতে দেখা গেছে ইছানগর গ্রামের শত শত মানুষকে। এখানকার একেকটি চাঙে এক মৌসুমে প্রায় ৩০ লাখ টাকার শুঁটকি উৎপাদন হয়।
স্বাদের মতো নামেও বৈচিত্র্য আছে শুঁটকির। এখন যেসব মাছের শুঁটকি বেশি তৈরি হচ্ছে তার মধ্যে আছে ট্যাংরা, ছোট চান্দা, বাঁশপাতি, ছুরি, সামুদ্রিক চান্দা, সামুদ্রিক মলা, চাপিলা, নোনা কাটা ইলিশ, দেশি মলা, খইলশা, চাপিলা বড়, লইট্যা, নোনা আস্ত ইলিশ, পুঁটি মাছ, রূপচাঁদা, পুঁটি মাছের শুকনা, বরিশালের শুকনা ছোট চিংড়ি, সামুদ্রিক বাইল্যা। আঞ্চলিক সীমা ছাড়িয়ে এসব শুঁটকি চট্টগ্রাম থেকে যাচ্ছে ইউরোপ, আমেরিকা এবং মধ্যপ্রাচ্যেও।
শুঁটকির ইতিহাস প্রসঙ্গে উইকিপিডিয়া বলছে, বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকার প্রায় ৭ দশমিক ৩ মিলিয়ন লোক প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সামুদ্রিক মৎস্য আহরণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করে। খাদ্য থেকে প্রাপ্ত প্রাণীজ আমিষের প্রায় ৬০ শতাংশ আসে মৎস্য ও মৎস্যজাত খাদ্য থেকে। দেশের মানুষের বার্ষিক জনপ্রতি মাছের চাহিদা ২০ দশমিক ৪৪ কেজি। চাহিদার বিপরীতে বার্ষিক জনপ্রতি খাদ্য হিসেবে মাছ গ্রহণ হয় ১৮ দশমিক ৯৪ কেজি অর্থাৎ ১ দশমিক ৫০ কেজি ঘাটতি থাকে। এই গ্রহণকৃত মাছের প্রায় ৫ শতাংশ আসে শুঁটকি থেকে। বছরে প্রায় ৫ দশমিক ৪৬ লাখ টন মৎস্য আহরিত হয় সমুদ্র থেকে, যার ২০ শতাংশ শুঁটকি হিসেবে প্রক্রিয়াজাতকরণ করা হয়। এক কেজি শুঁটকি মাছ তৈরিতে প্রজাতিভেদে ৩ থেকে ৫ কেজি কাঁচা মাছ প্রয়োজন।
দেশে উৎপাদিত শুঁটকির প্রায় ৮০ শতাংশ তৈরি হয় সদর উপজেলার কুতুবদিয়া পাড়া এলাকার নাজিরারটেকে। আর চট্টগ্রামে সবচেয়ে বেশি শুঁটকি তৈরি হয় কর্ণফুলী নদীর দুই তীরে। আবহাওয়াগত কারণে কর্ণফুলীর তীরে প্রক্রিয়াজাত হওয়া শুঁটকি স্বাদ ও গুণগতমানে অন্য এলাকার চেয়ে আলাদা। ইছানগর গ্রামের ডাঙ্গাচর, জুলধা, কর্ণফুলী এলাকায় দেখা গেছে বেশ কয়েকটি চাঙ। এসব চাঙে শুঁটকি শুকানো হচ্ছে আলাদাভাবে।
শুঁটকি ব্যবসায় যুক্ত ডাঙ্গারচরের ফয়েজ আহমদ বলেন, 'প্রতি বছর অক্টোবর মাস এলে শুঁটকির মাচাঙ তৈরি করি আমরা। নভেম্বর থেকে পুরোদমে শুরু করি কাজ। আমার একটি মাচাঙে এখন ২০ জন শ্রমিক কাজ করছে। এদের মধ্যে পুরুষ যেমন আছে, তেমনি নারীও। আমার পরিবারের আটজন সদস্যও কাজ করছে শুঁটকি তৈরিতে। প্রতি বছর আমি তিন থেকে চার লাখ টাকার শুঁটকি বিক্রি করি।' ফয়েজ আহমদের মাচাঙের পাশেই শুঁটকি শুকানোর কাজে ব্যস্ত দেখা গেছে রমজিলা খাতুনকে। তিনি জানান, তার স্বামী আবদুর রহমান তিনটি মাচাঙে শুঁটকি তৈরির কাজ করছেন। লইট্যা, ফাইস্যা, বাইল্যা ও ছুরি মাছের শুঁটকি বেশি তৈরি করছেন তারা। এ ধরনের শুঁটকির চাহিদাও বেশি। তাদের পরিবারের মোট সাতজন সদস্য আছে শুঁটকি তৈরির এ কাজে। বাইরে থেকেও ১২ জন শ্রমিক কাজ করছে।
নদীপাড়ে শুঁটকি শুকানোর পর চট্টগ্রামের আছাদগঞ্জে পাইকারি দরে বিক্রি করেন বলে জানান ইছানগর গ্রামের শুঁটকি কারিগররা। কারণ চট্টগ্রামের আছাদগঞ্জ চাকতাই এলাকায় শুঁটকির বড় মোকাম গড়ে উঠেছে। এখানে প্রতি বছর এ মৌসুমে শতকোটি টাকার শুঁটকি বেচাকেনা হয়।
- বিষয় :
- শুঁটকির মৌসুম
- চট্টগ্রাম
