সামিটের এলএনজি টার্মিনালও বন্ধ, গ্যাস সরবরাহ ১৬ বছরে সর্বনিম্ন
ফাইল ছবি
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ১৪ আগস্ট ২০২৬ | ০০:৩২ | আপডেট: ১৪ আগস্ট ২০২৬ | ০১:১৬
দেশের গ্যাস সংকট আরও তীব্র হয়েছে। বৈরী আবহাওয়ার কারণে বৃহস্পতিবার বিকেল ৫টা থেকে মহেশখালীর সামিট এলএনজি টার্মিনাল জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ করে দিয়েছে। নতুন এলএনজি কার্গো টার্মিনালে যুক্ত হতে না পারায় এতদিন মজুত থাকা এলএনজি দিয়ে কম পরিমাণে সরবরাহ চালিয়ে আসছিল প্রতিষ্ঠানটি। মজুত শেষ পর্যায়ে পৌঁছানোর পর সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়। এতে জাতীয় গ্রিডে দৈনিক গ্যাস সরবরাহ নেমে এসেছে প্রায় ১৯০ কোটি ঘনফুটে। দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট।
২০০৯ সালে দেশে দৈনিক গ্যাস উৎপাদন ছিল ১৭৪ কোটি ৪০ লাখ ঘনফুট। এরপর উৎপাদন বেড়ে ২০১৮ সালে শুধু দেশীয় উৎস থেকেই প্রায় ২৭০ কোটি ঘনফুট গ্যাস পাওয়া যায়। কিন্তু দীর্ঘদিন নতুন গ্যাস অনুসন্ধানে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি না হওয়া এবং পুরোনো কূপগুলোর উৎপাদনক্ষমতা কমে যাওয়ায় বর্তমানে দেশীয় উৎপাদন নেমে এসেছে ১৬০ থেকে ১৭০ কোটি ঘনফুটে। ফলে এলএনজির ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। এখন সামিটের সরবরাহ বন্ধ হওয়ায় জাতীয় গ্রিডে গ্যাসের সংকট আরও প্রকট হয়েছে।
সামিটের টার্মিনাল বন্ধ
মহেশখালীতে এলএনজি সরবরাহের জন্য দুটি ভাসমান টার্মিনাল রয়েছে। এর মধ্যে এক্সিলারেট এনার্জির সক্ষমতা দৈনিক ৬০ কোটি ঘনফুট এবং সামিটের ৫০ কোটি ঘনফুট। গত ২১ জুলাই অগ্নিদুর্ঘটনার পর এক্সিলারেটের টার্মিনাল বন্ধ হয়ে যায়। ফলে জাতীয় গ্রিডে এলএনজি সরবরাহের বড় অংশ সামিটের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে।
এরপর সামিট থেকে দিনে সর্বোচ্চ ৫৬ কোটি ঘনফুট পর্যন্ত গ্যাস দেওয়া হয়। পরে সরবরাহ ৫০ কোটি ঘনফুটে রাখা হয়। তবে সোমবার এলএনজি নিয়ে একটি কার্গো বঙ্গোপসাগরে পৌঁছালেও সমুদ্র উত্তাল থাকায় সেটি সামিটের টার্মিনালে যুক্ত করা সম্ভব হয়নি। ফলে কার্গো থেকে এলএনজি নেওয়া যায়নি। টার্মিনালের মজুত দিয়েই সাময়িকভাবে সরবরাহ চালিয়ে যেতে হয়।
মজুত দ্রুত শেষ হওয়া ঠেকাতে সোমবার সন্ধ্যা থেকে সরবরাহ কমাতে শুরু করে সামিট। মঙ্গলবার তা ২০ কোটি ঘনফুটে নামানো হয়। বুধবার থেকে বৃহস্পতিবার বিকেল পর্যন্ত মাত্র ১০ কোটি ঘনফুট করে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস দেওয়া হচ্ছিল। শেষ পর্যন্ত বৃহস্পতিবার বিকেল ৫টায় সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়।
গত ৬ আগস্ট থেকে এক্সিলারেটের এফএসআরইউ আংশিক চালু রয়েছে। তা থেকেই এখন ৩০ কোটি ঘনফুট করে গ্যাস আসছে।
কার্গো নিয়েও জটিলতা
এর মধ্যে সৌদি আরামকোর সরবরাহ করা ‘আল হামরা’ নামের একটি এলএনজি কার্গো মহেশখালীর কোনো টার্মিনাল গ্রহণ করেনি। এডিএনওসির মাধ্যমে সরবরাহ করা কার্গোটি নিয়ে বিমা-সংক্রান্ত আপত্তি রয়েছে। এ কারণে কার্গোটি গ্রহণ করা হয়নি।
পেট্রোবাংলার ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মো. আবদুল মান্নান জানান, কার্গোটি পরিবর্তনের জন্য সৌদি আরামকোকে অনুরোধ করা হয়েছে।
বিদ্যুতে অগ্রাধিকার, চাপে শিল্প
গ্যাসের সামগ্রিক সরবরাহ কমলেও বিদ্যুৎ উৎপাদন সচল রাখতে এ খাতে গ্যাসের বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে। আগে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো দিনে ৬৮ কোটি ঘনফুট গ্যাস পেত। এখন দেওয়া হচ্ছে প্রায় ১০০ কোটি ঘনফুট। সার উৎপাদনে যাচ্ছে ১৪ কোটি ঘনফুট। শিল্প, বাসাবাড়ি ও অন্যান্য খাতে অবশিষ্ট থাকছে মাত্র ৮৫ কোটি ঘনফুট। তিন সপ্তাহ আগেও এসব খাতে সরবরাহ ছিল ১৬০ থেকে ১৬৫ কোটি ঘনফুট।
ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদন সচল রাখার চেষ্টা হলেও শিল্প খাতে গ্যাসের সংকট আরও বেড়েছে। উৎপাদননির্ভর শিল্পে গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
আমদানিনির্ভরতা বাড়ছে
২০১৮ সালে ঘাটতি মেটাতে প্রথমবারের মতো দৈনিক ৩০ থেকে ৫০ কোটি ঘনফুট এলএনজি জাতীয় সরবরাহে যুক্ত করা হয়েছিল। বর্তমানে পেট্রোবাংলা গড়ে প্রায় ১০০ কোটি ঘনফুট এলএনজি আমদানি করে মোট সরবরাহ প্রায় ২৭০ কোটি ঘনফুটে রাখার চেষ্টা করছে। কিন্তু সমুদ্রে বৈরী আবহাওয়া, কার্গো খালাসে জটিলতা এবং টার্মিনালের কারিগরি সমস্যায় এলএনজি সরবরাহ বারবার ব্যাহত হচ্ছে।
ফলে দেশীয় গ্যাস উৎপাদন কমে যাওয়া এবং এলএনজি সরবরাহে অনিশ্চয়তা—দুই দিক থেকেই গ্যাসের সংকট বাড়ছে। দীর্ঘমেয়াদি অনুসন্ধান ও নতুন গ্যাসের উৎস তৈরি না হলে শিল্প ও বাণিজ্য খাতে এর প্রভাব আরও বাড়তে পারে।
গ্যাস সংকটের বিষয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, এলএনজি টার্মিনালের পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত পরিস্থিতি সামাল দেওয়া ছাড়া আপাতত সরকারের সামনে আর কোনো পথ নেই। সংকটের সময়ে হঠাৎ করে নতুন করে গ্যাস উত্তোলন বাড়ানোও সম্ভব নয় বলে জানান তিনি।
পেট্রোবাংলার একজন পরিচালক জানান, সমুদ্র পরিস্থিতির উন্নতি হলে শুক্রবার রাতে কার্গো টার্মিনালে যুক্ত করার প্রস্তুতি শুরু হতে পারে। সবকিছু অনুকূলে থাকলে শনিবার ভোরে কার্গো থেকে এলএনজি নেওয়া এবং দুপুরের পর সামিট থেকে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ শুরু হতে পারে।
তবে সামগ্রিক সংকট দ্রুত কাটার সম্ভাবনা কম। অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত এক্সিলারেটের টার্মিনাল পূর্ণ সক্ষমতায় চালুর আগে ৭২ ঘণ্টার পরীক্ষা-নিরীক্ষা প্রয়োজন হবে। ওই সময়ও টার্মিনাল থেকে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ রাখতে হবে। ফলে সামিটের সরবরাহ পুনরায় শুরু হলেও গ্যাস পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে আরও কয়েক দিন সময় লেগে যেতে পারে।
- বিষয় :
- গ্যাস
- কারখানা
- বিদ্যুৎ সরবরাহ
- এলএনজি সরবরাহ