নিয়োগ পরীক্ষায় প্রক্সি বাড়ছে
ফাইল ছবি
সাব্বির নেওয়াজ
প্রকাশ: ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৮:২৩ | আপডেট: ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৮:৩০
| প্রিন্ট সংস্করণ
মোটা অংকের অর্থের চুক্তিতে সরকারি চাকরির পরীক্ষা একজনের হয়ে দিয়ে দিচ্ছে অন্যজন। পাবলিক সার্ভিস কমিশনের (পিএসসি) পরীক্ষা থেকে শুরু করে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের নিয়োগ পরীক্ষায় ঘটছে এমন জালিয়াতি। পরীক্ষায় জালিয়াতির নতুন নতুন কৌশল ধরা পড়লেও তা থামছে না। লিখিত, ব্যবহারিক ও মৌখিক– তিন ধাপেই প্রকৃত প্রার্থীর পরিবর্তে অন্য ব্যক্তি পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে। কেউ ধরা পড়ছে মৌখিক পরীক্ষায়, কেউ নিয়োগ পাওয়ার পর যোগদান করতে গিয়ে। সিসিটিভি ফুটেজ, হাতের লেখা ও চেহারা মিলিয়ে দেখার পর বেরিয়ে আসছে চাঞ্চল্যকর তথ্য।
সাম্প্রতিক সময়ে সরকারি চাকরির একাধিক নিয়োগ পরীক্ষায় প্রক্সি পরীক্ষার্থী (অন্যের হয়ে পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারী) আটক হয়েছে। নিয়োগপত্র পেয়ে চাকরিতে যোগ দিতে গিয়েও ধরা পড়েছে মূল আবেদনকারী। সর্বশেষ গত মঙ্গলবার পিএসসির সচিবালয়ে অফিস সহায়ক পদে যোগ দিতে গিয়ে ধরা পড়েন মো. রিপন হোসেন নামে এক প্রার্থী। পিএসসি জানিয়েছে, লিখিত ও মৌখিক; কোনো পরীক্ষাতেই তিনি নিজে অংশ নেননি। এর আগে ভূমি মন্ত্রণালয়ের অফিস সহায়ক পদে ছয়জন, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের নিয়োগে চারজন এবং কর অঞ্চল-নোয়াখালীর নিয়োগ পরীক্ষায় একাধিক প্রার্থীর ক্ষেত্রে প্রক্সি দেওয়ার ঘটনা ধরা পড়ে। এসব ঘটনায় মামলা, গ্রেপ্তারসহ আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
নিয়োগ পরীক্ষা-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, এসব জালিয়াতিতে সংঘবদ্ধ চক্র জড়িত। অর্থের বিনিময়ে দক্ষ প্রক্সি পরীক্ষার্থী সরবরাহ, পরীক্ষাকেন্দ্রে পরিচয় যাচাইয়ের দুর্বলতার সুযোগ নেওয়া; সব মিলিয়ে পরিকল্পিতভাবে জালিয়াতি করা হচ্ছে। শুধু পরীক্ষাকেন্দ্রে নিরাপত্তা বাড়িয়ে এ অপরাধ বন্ধ করা কঠিন।
পিএসসিতে লিখিত-মৌখিক দুটিতেই প্রক্সি
মঙ্গলবার পিএসসি সচিবালয়ে অফিস সহায়ক পদে যোগ দিতে গিয়ে প্রক্সি পরীক্ষার অভিযোগে আটক রিপন হোসেনের বাড়ি মানিকগঞ্জের সাটুরিয়া উপজেলার বাহা গ্রামে। পিএসসি জানিয়েছে, রিপনের পরিচয় যাচাইয়ের সময় প্রবেশপত্রের ছবির সঙ্গে মৌখিক পরীক্ষার দিনের সিসিটিভি ফুটেজে থাকা ব্যক্তির চেহারার মিল পাওয়া যায়নি। রিপনের চেহারার সঙ্গেও ফুটেজের ব্যক্তির অমিল ধরা পড়ে।
পিএসসির কর্মকর্তারা সমকালকে জানান, রিপন স্বীকার করেছেন– লিখিত ও মৌখিক; কোনো পরীক্ষাতেই তিনি অংশ নেননি। পরে তাঁকে শেরেবাংলা নগর থানায় হস্তান্তর করা হয় এবং তাঁর বিরুদ্ধে মামলা করে পিএসসি।
ভূমি মন্ত্রণালয়ে ধরা পড়েছে ছয়জন
গত ২৯ আগস্ট ভূমি মন্ত্রণালয়ের অফিস সহায়ক পদে প্রক্সির মাধ্যমে লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে মৌখিক পরীক্ষা দিতে গিয়ে ধরা পড়েন ছয়জন। তাদের শাহবাগ থানায় হস্তান্তর করা হয়। পরে আদালত তাদের জেল হাজতে পাঠান। তারা হলেন– সিরাজগঞ্জের কামারখন্দের মো. রবিউল, রংপুরের মিঠাপুকুরের মো. আসাদুজ্জামান খান, বগুড়ার সোনাতলার মো. রাকিব হাসান ও মো. শুভ মিয়া, নীলফামারীর কিশোরগঞ্জের মো. সবুজ ইসলাম এবং গোপালগঞ্জের কাশিয়ানীর মো. রাকিবুল হাসান।
মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা আসাদুজ্জামান খান সমকালকে জানান, ৮০ জন প্রার্থীর মৌখিক পরীক্ষা নেওয়ার সময় কয়েকজনের হাতের লেখা ও মেধা যাচাই করতে গিয়ে অসংগতি ধরা পড়ে। জিজ্ঞাসাবাদে ছয়জন স্বীকার করেন, তারা প্রক্সি পরীক্ষার্থীর মাধ্যমে লিখিত পরীক্ষায় অংশ নিয়ে উত্তীর্ণ হয়েছেন।
জনপ্রশাসনে যোগ দিতে গিয়ে ধরা চারজন
গত ১৯ জুলাই জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে অফিস সহায়ক পদে যোগ দিতে গিয়ে প্রক্সি পরীক্ষার অভিযোগে ধরা পড়েন চারজন। তারা হলেন– টাঙ্গাইলের গোপালপুরের মো. আ. আলিম, সিরাজগঞ্জের চৌহালীর মো. আলী হায়দার, কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরীর মো. রাসেল রানা লিটন ও গাজীপুরের শ্রীপুরের মো. মাসুদ ফকির।
মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, মৌখিক পরীক্ষার সময় প্রত্যেক প্রার্থীর ছবি তুলে রাখা হয়েছিল। নিয়োগ পাওয়ার পর যোগদানের দিন সেই ছবি মিলিয়ে দেখতেই ধরা পড়ে অসংগতি। জিজ্ঞাসাবাদে চারজন স্বীকার করেন, তাদের হয়ে অন্যেরা মৌখিক পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিলেন। এ ঘটনায় শাহবাগ থানায় অভিযোগ করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়।
হাতের লেখায়ও ধরা পড়ছে জালিয়াতি
কর অঞ্চল-নোয়াখালীর বিভিন্ন পদে নিয়োগে গত ৫ জুন তিনটি কেন্দ্রে লিখিত পরীক্ষা হয়। লিখিত, ব্যবহারিক ও মৌখিক পরীক্ষা শেষে প্রাথমিকভাবে ১১২ জনকে নির্বাচিত করা হয়। ২১ জুন নির্বাচিত প্রার্থীরা যোগদানের কাগজপত্র জমা দিতে গেলে কয়েকজনের আবেদনপত্রের হাতের লেখার সঙ্গে মৌখিক পরীক্ষার সময় পূরণ করা চেকলিস্টের লেখায় অসংগতি ধরা পড়ে। পুনরায় একই লেখা লিখতে দিলে অমিল আরও স্পষ্ট হয়। পরে জিজ্ঞাসাবাদে কয়েকজন স্বীকার করেন– লিখিত, ব্যবহারিক ও মৌখিক; তিন পরীক্ষাতেই তাদের পরিবর্তে অন্যেরা অংশ নিয়েছেন। এ ঘটনায় ২২ জুন নোয়াখালীর সুধারাম থানায় মামলা হয়। এই মামলা তদন্তের দায়িত্ব পায় পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।
তদন্তে সম্প্রতি সিআইডি জানতে পারে, একটি সংঘবদ্ধ চক্র অর্থের বিনিময়ে প্রক্সি পরীক্ষার্থী সরবরাহ করে। বিভিন্ন সরকারি চাকরির নিয়োগ পরীক্ষায় জালিয়াতি করে আসছে তারা। এ ঘটনায় গত ৩১ জুলাই তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তারা হলেন– নুরন্নবী, মো. সোহেল ও জুলফিকার আলী ওরফে রায়হান। নুরন্নবী ও সোহেল চট্টগ্রামের আগ্রাবাদে কর অঞ্চল-২ এর বিভাগীয় কর কমিশনারের কার্যালয়ে অফিস সহায়ক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। জুলফিকার আলী মাতারবাড়ী কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্পে জুনিয়র সহকারী ব্যবস্থাপক হিসেবে কর্মরত এবং সম্প্রতি ৪৫তম বিসিএসে সমবায় ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত।
সিআইডি জানায়, এ মামলায় এ পর্যন্ত এজাহারভুক্ত ছয় আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। চক্রের অন্যদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।
যেভাবে চলে প্রক্সির কারবার
সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, প্রক্সি পরীক্ষার ক্ষেত্রে প্রথমে প্রকৃত প্রার্থীর ছবি, স্বাক্ষর ও ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ করা হয়। এরপর শারীরিক গঠনে মিল রয়েছে এমন ব্যক্তিকে প্রক্সি পরীক্ষার্থী হিসেবে প্রস্তুত করা হয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তদন্তে জানা গেছে, এসব চক্র শুধু প্রক্সি পরীক্ষার্থীই সরবরাহ করে না। পরীক্ষার ফল প্রকাশ ও নিয়োগ পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়ে সহযোগিতার আশ্বাস দিয়ে তারা প্রার্থীদের কাছ থেকে অর্থ নেয়। প্রক্সি পরীক্ষার্থী ধরা পড়লেও এর পেছনের চক্র অনেক সময় আড়ালে থেকে যায়।
প্রযুক্তিনির্ভর পরিচয় যাচাইয়ের তাগিদ
ভূমি মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব এএসএম সালেহ আহমেদ বলেন, ভুয়া নিয়োগ প্রার্থীরা খুবই কৌশলী। তারা সতর্ক থাকায় ভুয়া পরীক্ষার্থীদের ধরতে পেরেছেন। সতর্ক থাকলে অন্য দপ্তরেও ভুয়া পরীক্ষার্থী ধরা সম্ভব হবে।
নিয়োগ পরীক্ষায় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, প্রক্সি বন্ধ করতে আবেদন থেকে শুরু করে নিয়োগ পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে পরিচয় নিশ্চিত করার ব্যবস্থা করতে হবে। একই সঙ্গে পরীক্ষাকেন্দ্রে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, পরিদর্শক ও নিরাপত্তাকর্মীদের জবাবদিহির আওতায় আনা জরুরি।
মেধাভিত্তিক নিয়োগে বড় হুমকি
সাবেক সচিব ও লোকপ্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের রেক্টর একেএম আবদুল আউয়াল মজুমদারের মতে, প্রশ্নপত্র ফাঁস বা অন্য অনিয়মের মতোই প্রক্সি পরীক্ষা মেধাভিত্তিক নিয়োগের জন্য বড় হুমকি। এটি ফৌজদারি অপরাধ। তাই বিচ্ছিন্নভাবে প্রক্সি পরীক্ষার্থী আটক করাই যথেষ্ট নয়। জালিয়াতির পেছনে সংঘবদ্ধ চক্র শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা এবং নিয়োগ পরীক্ষার প্রতিটি ধাপকে প্রযুক্তিনির্ভর ও জবাবদিহিমূলক করা জরুরি।
- বিষয় :
- নিয়োগ
- নিয়োগ বাণিজ্য
- পরীক্ষা