ঢাকা শুক্রবার, ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

রঙিন জারবেরায় জমবে আয়

রঙিন জারবেরায় জমবে আয়
×

টিস্যু কালচারে তৈরি চারায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বাড়ছে জারবেরার চাষ। বগুড়া সদর উপজেলার একটি বাগানে ফুটেছে বাহারি রঙের জারবেরা। সম্প্রতি তোলা- সমকাল

 জাহিদুর রহমান

প্রকাশ: ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৮:৩৩ | আপডেট: ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৯:০৮

| প্রিন্ট সংস্করণ

পড়ন্ত বেলায় বাগানে লম্বা ডাঁটার ওপর দুলছে লাল, সাদা, হলুদ, বেগুনি– হরেক রঙের জারবেরা। এই দৃশ্য বগুড়া সদর উপজেলার লাহিড়ীপাড়া ইউনিয়নের পীরগাছা এলাকার। রঙিন ফুলগুলো সৌন্দর্য ছড়ানোর পাশাপাশি আয়ের পথও তৈরি করছে। 

জারবেরার এই বাগান গড়ে তুলেছেন তরুণ কৃষি উদ্যোক্তা রেজওয়ানুল ইসলাম। বিদেশি এই ফুলের চাষ করে তিনি শুধু নিজের আয় বাড়াননি; স্থানীয় কৃষকদেরও দেখাচ্ছেন নতুন সম্ভাবনার পথ।
রেজওয়ানুলের বাগানে ঢুকলেই ফুলগুলোর লম্বা ডাঁটা, উজ্জ্বল রং আর আকর্ষণীয় গড়ন সহজেই নজর কাড়ে। রেজওয়ানুল বলেন, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের টিস্যু কালচার প্রকল্পের ল্যাব থেকে চারা সংগ্রহ করে তিনি এই বাগান করেছেন। একটি গাছ থেকে বছরে প্রায় ২০০টি ফুল পাওয়া যায়। প্রতিটি ফুল ১০ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়। ভালো পরিচর্যা করতে পারলে একই গাছ থেকে টানা তিন বছর ফুল পাওয়া যায়। এখন তাঁর বাগান থেকে সপ্তাহে ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকার ফুল বিক্রি হয়।

বিদেশি ফুল, দেশি চারা
জারবেরা মূলত কাটফ্লাওয়ার হিসেবে সারাবিশ্বে পরিচিত। ফুলদানি কিংবা ফুলের তোড়ায় এর ব্যবহার অনেক। কেটে নেওয়ার পরও সাত থেকে আট দিন সতেজ থাকে বলে ফুল ব্যবসায়ীদের কাছে এর চাহিদা বেশি। বিশ্ববাজারে তাজা কাটা ফুল হিসেবে গোলাপ, কারনেশন, চন্দ্রমল্লিকা ও টিউলিপের পর জারবেরার অবস্থান পঞ্চম। বাংলাদেশেও ধীরে ধীরে বাড়ছে এর বাণিজ্যিক চাষ। 
সাধারণত ডিসেম্বর-জানুয়ারি মাসে জারবেরার চারা লাগানো হয়। এপ্রিল থেকে ফুল আসতে শুরু করে। সারাবছর ফুল ফুটলেও অক্টোবর থেকে মার্চ পর্যন্ত উৎপাদন বেশি হয়। তবে এতদিন এই ফুল চাষের একটি বড় সমস্যা ছিল ভালো জাতের চারা পাওয়া। উন্নত জাতের জারবেরার চারা পেতে কৃষকদের অনেকটাই নির্ভর করতে হতো ভারতের ওপর। ভারতের একটি চারা কিনতেই খরচ হতো প্রায় ১০০ টাকা। এর সঙ্গে ছিল পরিবহন খরচ, সময়মতো চারা না পাওয়ার ঝুঁকি এবং চারার মান নিয়ে অনিশ্চয়তা।

এখন সেই চিত্র বদলাতে শুরু করেছে। দেশেই টিস্যু কালচার প্রযুক্তিতে তৈরি হচ্ছে উন্নত জাতের জারবেরার চারা। আর সেই চারা পৌঁছে যাচ্ছে কৃষকের মাঠে। দেশে টিস্যু কালচার ল্যাবে উৎপাদিত একটি চারার দাম পড়ছে প্রায় ৩০ টাকা।

ফুলের রাজধানী হিসেবে পরিচিত যশোরের গদখালী ও আশপাশের এলাকায় জারবেরা চাষের বিস্তার রয়েছে। এখানকার অন্তত অর্ধশতাধিক শেডে কাটফ্লাওয়ার হিসেবে জারবেরা চাষ হয়। বছরে প্রয়োজন হয় প্রায় ৩০ থেকে ৪০ হাজার চারা। এতদিন এসব চারা প্রধানত ভারত থেকে আনতে হতো। প্রতিটি চারার জন্য খরচ হতো প্রায় ১০০ টাকা। দেশে টিস্যু কালচারে উৎপাদিত চারা এখন পাওয়া যাচ্ছে প্রায় ৩০ টাকায়। ফলে চাষিদের উৎপাদন খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে কমছে।

যশোর ফুল উৎপাদক ও বিপণন সমবায় সমিতির সভাপতি মো. আব্দুর রহিম বলেন, স্থানীয়ভাবে কম দামে ভালো মানের চারা পাওয়া গেলে জারবেরার চাষ আরও বাড়বে। বিদেশ থেকে চারা আমদানি বন্ধ করা গেলে এ অঞ্চলেই বছরে কোটি টাকার বেশি সাশ্রয় সম্ভব বলে মনে করেন তিনি।

৫০ হাজারের বেশি চারা মাঠে
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের টিস্যু কালচার ল্যাবরেটরি কাম হর্টিকালচার সেন্টার স্থাপন ও উন্নয়ন প্রকল্পের মাধ্যমে এখন পর্যন্ত ৫০ হাজারের বেশি জারবেরার চারা কৃষক পর্যায়ে বাণিজ্যিক চাষে যুক্ত হয়েছে। দেশের বিভিন্ন এলাকায় এসব চারা দিয়ে প্রদর্শনীও করা হয়েছে।

বগুড়ার বনানী হর্টিকালচার সেন্টার এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। গত বছর এখানকার টিস্যু কালচার ল্যাবে লাল, সাদা, হলুদ ও বেগুনি রঙের প্রায় ১০ হাজার জারবেরার চারা উৎপাদন করা হয়। পরে কৃষকদের মধ্যে এসব চারা বিতরণ করা হয়। বিভিন্ন এলাকায় প্রদর্শনী ও বাণিজ্যিক চাষেও ব্যবহার করা হয়েছে সেগুলো।
প্রকল্পের কর্মকর্তারা জানান, টিস্যু কালচার পদ্ধতিতে নির্বাচিত একটি ভালো মাতৃগাছের অতিক্ষুদ্র টিস্যু নিয়ে নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে অসংখ্য চারা তৈরি করা হয়। সঠিকভাবে উৎপাদিত এসব চারা সাধারণত রোগমুক্ত, সবল এবং একই ধরনের বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন হয়। মাঠ পর্যায়ের ফলাফলও আশাব্যঞ্জক। টিস্যু কালচারের চারা ব্যবহারে গাছ ঢলে পড়ার প্রবণতা কম দেখা যাচ্ছে। রোপণের পর চারা মারা যাওয়ার হার কম হওয়ায় বারবার নতুন চারা লাগিয়ে ঘাটতি পূরণ করতে হয় না। এতে চারা, শ্রম ও পরিচর্যার খরচ কমে।

বগুড়া সদর উপজেলার সাবগ্রাম ইউনিয়নের গোবরধনপুর গ্রামের আফছার আলী ২০২২ সালে বাণিজ্যিকভাবে শুরু করেন জারবেরা ফুল চাষ। এক বিঘা জমিতে তিনি টিস্যু কালচারের মাধ্যমে চাষ শুরু করেন। পলিনেট হাউস নামে তাঁর বাগানে লাল, সাদা, হলুদ, পিংক, মেজেন্টা, কমলা, রানী গোলাপি ও জাম রঙের জারবেরা ফুল রয়েছে। চারা রোপণের তিন মাসের মধ্যেই প্রথম সফলতা পান এ চাষি। দুই বছরে তাঁর আট লাখ টাকা খরচ হলেও ফুল বিক্রি করেছেন প্রায় ৩০ লাখ টাকার। চাষি আফছার আলী সফল উদ্যোক্তা হিসেবে পুরস্কারও পেয়েছেন। দুদিন পরপর ফুল তুলে রাজশাহী ও রংপুর বিভাগসহ ঢাকায় বিক্রি করছেন।

আফছার আলী জানান, রং অনুযায়ী চারাগুলো আলাদা সারিতে রোপণ করা হয়েছে। জারবেরা চাষে খরচ বেশি হলেও লাভও বেশি। খরচ বেশি হওয়ার প্রধান কারণ জারবেরা বাগানের ওপরে পলিশেড দিতে হয়। একটি শেডেই খরচ পড়ে প্রায় ছয় লাখ টাকার মতো। তবে একবার শেড দিলে সেটি পাঁচ-ছয় বছর পর্যন্ত ব্যবহার উপযোগী থাকে। রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর থেকে সরকারিভাবে শেড তৈরি করে দেওয়া হয়েছে। এতে তাঁর খরচ অনেকটা কমে গেছে। জারবেরার চারা রোপণের ৯০ দিনের মধ্যেই ফুল দেয়। প্রতিদিন বাগান থেকে ২০০-২৫০টি ফুল তোলা যায়।
টিস্যু কালচার প্রকল্পের পরিচালক তালহা জুবাইর মাসরুর বলেন, এরই মধ্যে ৫০ হাজারের বেশি চারা কৃষক পর্যায়ে বাণিজ্যিক চাষে যুক্ত হয়েছে। কৃষকরা ভালো মানের ফুল পাচ্ছেন এবং বাজারেও ভালো দাম পাচ্ছেন। তিনি বলেন, জারবেরার টিস্যু কালচারের নিজস্ব প্রটোকল তৈরি করা প্রকল্পের একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন। একসময় যে উন্নত চারা বিদেশ থেকে বেশি দামে আনতে হতো, এখন তা দেশেই উৎপাদন করা সম্ভব হচ্ছে। এতে কৃষকের উৎপাদন খরচ কমানোর পাশাপাশি আমদানিনির্ভরতা ও বৈদেশিক মুদ্রার ব্যয় কমানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে।

তালহা জুবাইর মাসরুর বলেন, জারবেরার টিস্যু কালচার চারা উৎপাদন এখন শুধু বগুড়ায় সীমাবদ্ধ নেই। মাদারীপুরের মোস্তফাপুর হর্টিকালচার সেন্টার এবং ময়মনসিংহের কেওয়াটখালী হর্টিকালচার সেন্টারেও তৈরি হচ্ছে জারবেরার চারা। বান্দরবানের বালাঘাটা, সাভারের রাজালাখ এবং টাঙ্গাইলের ধনবাড়ীতে টিস্যু কালচার ল্যাব নির্মাণের কাজ চলছে। চলতি বছরে এসব ল্যাব চালু হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এ ছাড়া টিস্যু কালচার প্রকল্পের আওতায় দেশে মোট ১১টি টিস্যু কালচার ল্যাব স্থাপন করা হচ্ছে। এসব ল্যাব পূর্ণ সক্ষমতায় চালু হলে বছরে এক কোটির বেশি চারা উৎপাদন করা সম্ভব হবে। শুধু জারবেরা নয়; বিভিন্ন ফুল, ফল ও সবজি ফসলের মানসম্মত চারা উৎপাদনেও এসব ল্যাব কাজে লাগানো হচ্ছে। 

সম্প্রতি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. আব্দুর রহিম বগুড়ায় জারবেরা ফুলের বাগান পরিদর্শন করেছেন। তিনি বলেন, টিস্যু কালচার ল্যাবের কারণে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে মানসম্মত চারা উৎপাদনের একটি নেটওয়ার্ক গড়ে উঠবে। কৃষকের কাছে দ্রুত চারা পৌঁছে দেওয়া সহজ হবে। একই সঙ্গে কমবে বিদেশি চারার ওপর নির্ভরতা।

আরও পড়ুন

×