ঢাকা বুধবার, ০৮ জুলাই ২০২৬

হৃদরোগ ইনস্টিটিউটের ২৯ চিকিৎসাকর্মী যেভাবে করোনায় আক্রান্ত

হৃদরোগ ইনস্টিটিউটের ২৯ চিকিৎসাকর্মী যেভাবে করোনায় আক্রান্ত
×

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ২৯ এপ্রিল ২০২০ | ০৫:৫২ | আপডেট: ২৯ এপ্রিল ২০২০ | ০৬:১২

জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে একের পর এক চিকিৎসাকর্মী করোনাভাইরাসে (কোভিড-১৯) আক্রান্ত হচ্ছেন। বাংলাদেশের একমাত্র সরকারি এই বিশেষায়িত হৃদরোগ হাসপাতালটির আটটি সাধারণ ওয়ার্ডের মধ্যে একটিকে লকডাউনও করে রাখা হয়েছে।

সেখানকার একজন সহকারী অধ্যাপক পর্যায়ের চিকিৎসকের বরাত দিয়ে বিবিসি বাংলা জানিয়েছে, সপ্তাহ তিনেক আগে একজন রোগী ঢাকার জাতীয় হৃদরোগ হাসপাতালে এসেছিলেন হার্টের সমস্যা নিয়ে। প্রায় ১০ দিন তিনি ভর্তিও ছিলেন হাসপাতালের একটি ওয়ার্ডে। এক পর্যায়ে তিনি কোভিড-১৯ পজেটিভ শনাক্ত হন। এরপর একের পর এক চিকিৎসাকর্মী কোভিড-১৯ পজেটিভ হন, যারা প্রত্যেকেই কোন না কোনভাবে ওই রোগীটির সংস্পর্শে গিয়েছিলেন।

সব মিলিয়ে ২৯ জন স্বাস্থ্যকর্মী সংক্রমিত হয়েছেন বলে জানিয়েছেন ইনস্টিটিউটের পরিচালক মীর জামাল উদ্দীন। তবে তিনি লকডাউনের ব্যাপারটি স্বীকার করেননি।

জানা গেছে, সব মিলিয়ে যে ২৯ জন শনাক্ত হয়েছেন, তাদের মধ্যে আটজন ডাক্তার ও সাতজন নার্স।

একজন নার্সের অবস্থা গুরুতর হওয়ায় আগেই হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিলো। এখন আরো একজন ডাক্তারের অবস্থার অবনতি হওয়ায় তাকে বুধবার হাসপাতালে ভর্তি করা হবে বলে জানিয়েছে ইন্সটিটিউট কর্তৃপক্ষ। বাকিদের বাড়িতে রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।

সারাদেশ থেকেই হৃদরোগে আক্রান্ত মানুষেরা এই হাসপাতালে আসেন, যাদের জীবন বাঁচানোর জন্য জরুরি ভিত্তিতে চিকিৎসা দেওয়া বা অস্ত্রোপচার করার প্রয়োজন পড়ে। ফলে মহামারি ছড়িয়ে পড়ার কারণে এই হাসপাতালের চিকিৎসাসেবা যদি ব্যাহত হয়, তাহলে বহু মানুষের জীবন সংশয় তৈরি হতে পারে।

পরিচালক মীর জামাল উদ্দীন বলেন, একজন রোগীর মাধ্যমেই ২৯ জন চিকিৎসাকর্মী আক্রান্ত হন। যদিও তিনি এদের ব্যাপারে বিস্তারিত কিছু জানাতে রাজি হননি।

তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন সিনিয়র চিকিৎসক জানান, আক্রান্তদের মধ্যে ১৫ জন ডাক্তার-নার্স ছাড়াও রয়েছেন একজন ওয়ার্ড মাস্টার, কয়েকজ ওয়ার্ড বয় এবং নিরাপত্তারক্ষীসহ অন্যান্য সহায়তা কর্মী। এরা সবাই ওই রোগীর সংস্পর্শে এসেছিলেন।

সপ্তাহ তিনেক আগে ওই রোগী হৃদরোগের জটিলতা নিয়ে জরুরি বিভাগে আসেন এবং এরপর তাকে সাধারণ ওয়ার্ডে ভর্তি করে নেওয়া হয়। এসময় তার শরীরে করোনাভাইরাসের কোনো লক্ষণ ছিলো না। দিনকয়েক পরে কিছু উপসর্গ দেখা দিলে তার নমুনা পরীক্ষা করতে পাঠানো হয়। নমুনার ফলাফল হাতে পাওয়ার আগেই ওই রোগী হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়ে বাড়ি চলে গিয়েছিলেন। কিন্তু ফলাফলে তার কোভিড-১৯ পজেটিভ আসে।

ফলে তার সংস্পর্শে আসা চিকিৎসাকর্মীদের নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা শুরু করা হয় এবং সবারই সংক্রমণ শনাক্ত হয়।

বাংলাদেশের অনেক হাসপাতালেই এখন রোগী ভর্তি করার আগে 'করোনাভাইরাস নেই' এমন সার্টিফিকেট দেখতে চাওয়া হয় বলে অভিযোগ আছে।

পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে এক চিকিৎসক বলেন, হৃদরোগ এমন এক সমস্যা, যার চিকিৎসা শুরু করতে হয় অনতিবিলম্বে। নয়তো তার বড় ক্ষতি, এমনকি জীবননাশের হুমকি তৈরি হতে পারে। এক্ষেত্রে ভর্তি করার আগে তার সংক্রমণ আছে কি-না, তা পরীক্ষা করে দেখার কোন সুযোগই থাকে না।

হৃদরোগ ইনস্টিটিউটের পরিচালক বলেন, এখন পর্যন্ত মোট ১০ জন রোগী তারা পেয়েছেন যারা করোনাভাইরাস আক্রান্ত হওয়ায় কোভিড-১৯ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। শুধু একজন রোগীর ক্ষেত্রে বিষয়টি আগে ধরতে না পারার কারণে তিনি বহু চিকিৎসাকর্মীকে আক্রান্ত করে ফেলেছেন।

তবে বড় এই হাসপাতালের আরো দুটি জায়গায় দুজন কর্মী কোভিড-১৯ পজেটিভ শনাক্ত হন, যারা ওই রোগীর সংস্পর্শে আসেননি। এদের একজন হাসপাতালের ফার্মেসির একজন কর্মী। অন্যজন নিরাপত্তা রক্ষীদলের একজন আনসার সদস্য। ফলে আনসার সদস্যরা বিশ্রাম নেয় এমন একটি জায়গাকেও লকডাউন করা হয়েছে। আর ফার্মেসিটিকে প্রায় ১৬ দিন লকডাউন রাখার পর দিন কয়েক আগে খুলে দেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ ডক্টরস ফাউন্ডেশন নামে একটি সংগঠনের হিসেব অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত ৪৪০ জন ডাক্তারের শরীরে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে। সব মিলে মোট শনাক্ত রোগীর মধ্যে প্রায় ৭ শতাংশই ডাক্তার। আর মোট নার্স আক্রান্ত হয়েছেন ২৩৫ জনের মতো।

দেখা যাচ্ছে আক্রান্ত ডাক্তার-নার্সদের অধিকাংশই এমন সব হাসপাতালে কর্মরত, যেখানে কোভিড-১৯ রোগীদের চিকিৎসা দেওয়া হয় না।

হৃদরোগ ইনস্টিটিউটের পরিচালক জামাল উদ্দীন বলেন, যেগুলো কোভিড-১৯ হাসপাতাল, সেখানে জানে সবাই যে এরা কোভিড-১৯ রোগী। ফলে সেক্ষেত্রে তারা যে প্রস্তুতি নিয়ে এগোন, আমরা প্রায় একই প্রস্তুতি থাকলেও হয়তো অতটা খেয়াল করি না। এই কারণেই নন-কোভিড হাসপাতালে এখন সংক্রমণ একটু বেশি।

এ রকম পরিস্থিতিতে কোভিড-১৯ চিকিৎসার জন্য বিশেষায়িত হাসপাতালের সংখ্যা বাড়ানোর কথা বলেছেন ডক্টরস ফাউন্ডেশনের প্রধান সমন্বয়ক ডা. নিরুপম দাশ।

তিনি বলছেন, এভাবে যদি চলতে থাকে তাহলে যারা নন-কোভিড রোগী, তাদের চিকিৎসাসেবা অচিরেই হুমকির মুখে পড়বে।

এদিকে হাসপাতালটিতে পিপিইর মতো কোন সুরক্ষা উপকরণ দেওয়া হচ্ছিল না বলে অভিযোগ উঠেছে। ইনস্টিটিউটের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক চিকিৎসক অভিযোগ করেন, ১০ দিন আগেও তাদের পিপিইর মতো কোন সুরক্ষা উপকরণ দিচ্ছিল না হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।

ডাক্তার-নার্সদের মধ্যে সংক্রমণ ধরা পড়ার ঘটনার পর থেকে পিপিই সরবরাহ শুরু করেছে কর্তৃপক্ষ।

কিন্তু সেগুলো পর্যাপ্ত নয় এবং এগুলো একবার ব্যাবহারোপযোগী হলেও তারা জীবাণুমুক্ত করে একাধিকবার ব্যবহার করছেন বলে জানান ওই চিকিৎসক।

তিনি বলেন, এখন ব্যক্তিগত খরচে এবং নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় তারা পিপিই সংগ্রহ শুরু করেছেন।

তবে পর্যাপ্ত সুরক্ষা উপকরণ না সরবরাহ করার অভিযোগ অস্বীকার করে পরিচালক মীর জামাল উদ্দীন বলেন, পিপিই একদম প্রথম থেকেই আমরা দিচ্ছি। প্রতিদিন আড়াইশো থেকে তিনশো পিপিই দিচ্ছি। 


আরও পড়ুন

×