করোনা মোকাবিলায় ১৫ উদ্যোগ গ্রহণের দাবি প্রাণ-প্রকৃতি সুরক্ষা মঞ্চসহ বিভিন্ন সংগঠনের
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ২৯ এপ্রিল ২০২০ | ১১:১৬
মহামারি করোনাভাইরাসের কারণে সৃষ্ট পরিস্থিতিতে সরকারের পরবর্তী করণীয় নির্ধারণে ১৫টি উদ্যোগ গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন প্রাণ-প্রকৃতি সুরক্ষা মঞ্চ ও সমমনা সংগঠনের পক্ষে ২৩ বিশিষ্ট নাগরিক। মঙ্গলবার এ বিষয়ে প্রাণ-প্রকৃতি সুরক্ষা মঞ্চের সমন্বয়ক জ্যোতির্ময় বড়ুয়া এক বিবৃতিতে দাবিগুলো তুলে ধরেন।
বিবৃতিতে স্বাক্ষরকারীদের মধ্যে রয়েছেন– টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান, তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির সদস্য সচিব প্রফেসর আনু মুহাম্মদ, বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের সভাপতি অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল, বাংলাদেশ লিগাল এইড সার্ভিসেস অ্যান্ড ট্রাস্টের নির্বাহী পরিচালক ব্যারিস্টার সারা হোসেন, ব্যারিস্টার জোতির্ময় বড়ুয়া, অ্যাসোসিয়েশন ফর ল্যান্ড রিফর্ম অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের নির্বাহী পরিচালক শামসুল হুদা, বাংলাদেশ এনভায়রনমেন্ট লয়ার্স অ্যাসোসিয়েশনের নির্বাহী পরিচালক অ্যাডভোকেট সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান, ব্রতীর নির্বাহী পরিচালক শারমিন মোর্শেদ, বৈদেশিক দেনা বিষয়ক বাংলাদেশ কর্মজোটের সদস্য সচিব হাসান মেহেদী, খাদ্য নিরাপত্তা নেটওয়াকের সদস্য সচিব নুরুল আলম মাসুদ।
বিবৃতিতে বৈশ্বিক এ মহাদুর্যোগের সময়ে দল-মত নির্বিশেষে ও বিভেদ ভুলে দেশের মানুষ, অর্থনীতি ও প্রাণ-প্রকৃতি সুরক্ষিত রাখার জন্য সকলে মিলে একসাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করা যায়, এমন পরিবেশ তৈরির তাগিদ দেন নাগরিকরা। তাদের পক্ষ থেকে করোনাভাইরাস সংক্রমণের ফলে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সরকারের পরবর্তী করণীয় সম্পর্কে সুস্পষ্ট দাবি তুলে ধরা হয়।
দাবিগুলো হলো- ১. দ্রুত ‘দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা আইন–২০১২’ অনুযায়ী জাতীয় দুর্যোগ ঘোষণা করতে হবে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় রাষ্ট্রের সর্বশক্তি নিয়োগের পাশাপাশি সব রাজনৈতিক দল ও নাগরিকদের সমন্বয়ে ‘জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটি’ গঠন করাসহ প্রতিটি বিপর্যস্ত খাতের জন্য আলাদা আলাদা সাব-কমিটি গঠন করতে হবে। এসব কমিটিতে বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত বিশেষজ্ঞ ব্যক্তি ও কর্মীদের যুক্ত করতে হবে।
২. করোনাভাইরাস প্রতিরোধে সুনির্দিষ্ট ও সমন্বিত পদক্ষেপ নিতে যেসব ব্যবস্থা নিতে হবে:
করোনা শনাক্তের পরীক্ষার সুযোগ সারাদেশে ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি করা। সরকারের সার্মথ্য বৃদ্ধির পাশাপাশি গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রে উদ্ভাবিত করোনা টেস্ট পদ্ধতি কাজে লাগানো। করোনা চিকিৎসার জন্য অস্থায়ী ভিত্তিতে বৃহৎ আকারে বিশেষায়িত হাসপাতাল গড়ে তোলা। দ্রুত সময়রে মধ্যে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সামগ্রী সংগ্রহ করা। করোনা প্রতিরোধ ও চিকিৎসার প্রক্রিয়াগুলো শক্তভাবে মেনে চলা যাতে তা আর ছড়িয়ে পড়তে না পারে। ব্যাপকভাবে নার্সিং প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করার পাশাপাশি পল্লী চিকিৎসক ও কমিউনিটি স্বাস্থ্য কর্মীদের কাজে লাগানো। নমুনা সংগ্রহরে জন্য প্রশিক্ষিত মেডিক্যাল টেকনোলজিস্টদের কাজে লাগানো। পাশাপাশি সুরক্ষা ব্যবস্থাসহ উপজেলা ও কমিউনিটি স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলো সক্রিয় রাখতে হবে যাতে মানুষ সাধারণ রোগের চিকিৎসা পায়। সরকারি হাসপাতালসহ সব বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকে সাধারণ রোগের চিকিৎসা অব্যাহত রাখার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। এই মহাদুর্যোগের সময়ে যে সব প্রতিষ্ঠান জরুরি চিকিৎসা দিতে ব্যর্থ হবে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া। সাধারণ চিকিৎসা কেন্দ্রসমূহ যেন সংক্রমণের কেন্দ্রে পরিণত না হয় তার জন্য যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে। করোনা আক্রান্ত ও মৃতদের ব্যাপারে তথ্যের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা। এটি মানুষের মধ্যে এ বিষয়ে ভীতি ও আতঙ্ক দূর করতে সহায়ক হবে। পাশপাশি তা সামাজিক দূরত্ব কমিয়ে পারস্পরিক সহমর্মিতা ও সহযোগিতার হাতকে শক্তশালী করবে। করোনাসহ সবরকম চিকিৎসা বিনামূল্যে দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।
৩. নিম্নআয়, শ্রমজীবী, ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলায় বস্তিতে থাকা মানুষ, জেনেভা ক্যাম্পে থাকা জনগোষ্ঠী, রোহিঙ্গা ক্যাম্প, আদিবাসীসহ প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে যারা কর্ম হারিয়ে অনাহারী আছেন অগ্রাধিকার দিয়ে যথাযথ তালিকা করে তাদের প্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী অথবা নগদ অর্থ পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। এক্ষেত্রে ভোটার কার্ডে উল্লিখিত ঠিকানা বিবেচনা না করে এলাকাভিত্তিক জনসম্পৃক্ত ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে।
সরকারি-বেসরকারি উৎপাদনকারী ও বিপণনকারীদের মাধ্যমে বাজারে খাদ্য সরবরাহে স্বাভাবিক অবস্থা বজায় রাখতে হবে যাতে সবাই তাদের প্রয়োজনীয় খাদ্য-পানীয় ন্যায্যমূল্যে সংগ্রহ করতে পারেন। এক্ষেত্রে পর্যাপ্ত সুরক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে পুলিশ, বিজিবিসহ অন্য সব আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে কাজে লাগাতে হবে।
৪. সামনের দিনগুলোতে কৃষি উৎপাদনকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে শস্য ও ফসল উৎপাদনকারী কৃষকসহ সব ধরনের কৃষকের জন্য ঋণের বদলে অনুদান ভিত্তিক আর্থিক ও অন্যান্য প্রণোদনার (উপকরণ, পরিবহন) ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। উৎপাদন খরচ বিবেচনায় রেখে জীবনযাপন ব্যয়ের ভিত্তিতে উৎপাদিত ফসলে দাম নির্ধারণ করতে হবে। উক্ত পদ্ধতিতে নির্ধারিত দামে সরকারি দফতরের মাধ্যমে দুর্নীতিমুক্ত উপায়ে সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে ফসল কিনতে হবে। সরকারের ধান ও শস্য ক্রয় ক্ষমতা বর্তমানের চাইতে কয়েক গুণ বৃদ্ধি করতে হবে। বিশেষত বোরো মৌসুমে উৎপাদিত ধানের অর্ধেকের বেশি সরকারকে কিনতে হবে। কারণ সামনের দিনগুলোতে র্কমহীন ও অনাহারী মানুষের জ্ন্য ব্যাপকভাবে খাদ্য বিতরণ করার প্রয়োজন হবে। ধান ও শস্য ক্রয়ের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে সরকারের মজুত ব্যবস্থার সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে হবে। প্রয়োজনে সরকারি গুদামের পাশাপাশি বেসরকারি গুদাম সাময়িকভাবে হুকুমদখল করতে হবে।
৫. গার্মেন্টসসহ সব শ্রমিকের বেতন ও বোনাস নিয়মিত দ্রুততম সময়ের মধ্যে পরিশোধ করতে হবে। চা বাগানে কর্মরত কয়েক লাখ শ্রমিকের জন্য বিশেষ প্রণোদনার ব্যবস্থা করতে হবে। পাশাপাশি তাদের প্রাপ্য বেতন ও অন্যান্য সুবিধাদি নিয়মিত পরিশোধ করতে হবে।
৬. দেশের একটি বিশাল জনগোষ্ঠী অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে কাজ করেন। যাদের নিয়মিত বেতন নেই কিংবা অন্য কোনও প্রকার পেশাগত সুযোগ সুবিধা নেই। মোট শ্রমের সত্তর শতাংশই যেখানে অপ্রাতিষ্ঠানিক খাত থেকে আসে সেখানে তাদের জন্য কোনও প্রণোদনা নেই। আমাদের দাবি, এই অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে জড়িত শ্রমিকদের জন্য আলাদা সাহায্য ও প্রণোদনা বরাদ্দ করতে হবে।
৭. অনলাইন, কমিউনিটি রেডিও ও টেলিভিশনের মাধ্যমে শিক্ষা কার্যক্রম চালু করা হলেও প্রত্যন্ত ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ছেলেমেয়েরা এই সুবিধা গ্রহণ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। ফলে তাদের বিষয়টি বিশেষ বিবেচনায় নিতে হবে।
৮. লকডাউন চলাকালীন সময়ে নাগরিক নিরাপত্তার সংকট তৈরি হচ্ছে। পিপিই পরহিতি অবস্থায় আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও ডাক্তারের পরিচয়ে বাড়িতে ঢুকে ডাকাতি ও ধর্ষণের ঘটনা ঘটছে। এক্ষেত্রে বিশেষ দায়িত্ব পালনরতদের জন্য বিশেষ চিহ্নযুক্ত পিপিইর ব্যবস্থা করতে হবে।
৯. আন্তঃদেশীয় জরুরি পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থা সচল রাখার জন্য সুরক্ষা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা সাপেক্ষে বন্দরসমূহ সচল রাখতে হবে।
১০. জরুরি কাজে বের হওয়া নারীরা রাস্তায় নানারকম কটূক্তির শিকার হচ্ছেন। নারীর প্রতি সহিংসতা অন্য সময়ের চেয়ে কোনও অংশে কম নয়। গত জানুয়ারি থেকে মার্চ মাসেই প্রায় ৪২ জন নারী নিহত হয়েছেন। নারীর প্রতি পারিবারিক সহিংসতার যে চিত্র বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে ফুটে উঠেছে তাতে এসব সহিংসতা প্রতিরোধ ও প্রতিকারের জন্য সরকারি, বেসরকারি পর্যায়ে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এছাড়াও গর্ভবতী নারীরা জরুরি চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বিশেষ দৃষ্টি দিতে হবে।
১১. সরকারের চলমান অগ্রাধিকারভিত্তিক মেগা উন্নয়ন প্রকল্পসমূহে কর্মরত শ্রমিকের করোনাভাইরাস ঝুঁকির বিষয়টি বিশেষভাবে বিবেচনায় নিতে হবে। নির্মাণকাজ বন্ধ থাকা প্রকল্পের শ্রমিক কর্মচারীদের বেতন ও চাকরি নিশ্চয়তা দিতে হবে। কম গুরুত্বপূর্ণ ও প্রাণ-প্রকৃতির জন্য ঝুঁকিপূর্ণ অবকাঠামো প্রকল্পসমূহ বন্ধ করে ওই বাজেটে ত্রাণ ও চিকিৎসা বাবদ বরাদ্দ করতে হবে।
১২. প্রকল্প এলাকায় এবং বস্তিতে থাকা শ্রমিকদের অনেকেই বাড়ির মালিক কর্তৃক উচ্ছেদের শিকার হচ্ছেন। একই ঘটনা ডাক্তার, নার্স এবং সাংবাদিকদের ক্ষেত্রেও ঘটছে। এসব উচ্ছেদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।
১৩. করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত স্বাস্থ্য, কৃষি ও সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক রাখার জন্য সমন্বিত ব্যবস্থা অব্যাহত রাখতে হবে।। স্বেচ্ছাসেবীদের প্রশিক্ষিত করার পাশাপাশি আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত সার্বক্ষণিক মাঠে রাখতে হবে।
১৪. করোনার অর্থনৈতিক অভিঘাত কাটিয়ে ওঠার জন্য প্রাণ-প্রকৃতি সুরক্ষার বিষয়টি বিশেষ বিবেচনায় নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি ও পরিবেশবান্ধব অর্থনৈতিক উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। এক্ষেত্রে কৃষি, স্বাস্থ্য ও শিক্ষাখাতসহ মানব উন্নয়নমূলক খাতসমূহকে বিশেষ অগ্রাধিকার দিতে হবে।
১৫. সর্বোপরি করোনা সংক্রান্ত তথ্য প্রকাশ কিংবা সরকারের গৃহীত কার্যক্রম সম্পর্কে সমালোচনা করার কারণে যেসব ব্যক্তি ও সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা দায়ের করা হয়েছে তা অবিলম্বে প্রত্যাহার করতে হবে। এছাড়াও, মানবাধিকার লংঘনের ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ও দৃষ্টান্তমূলক আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।