ঢাকা শনিবার, ১১ জুলাই ২০২৬

বেসরকারি হাসপাতালে করোনা চিকিৎসা

খরচ বহন করতে হবে রোগীকেই

খরচ বহন করতে হবে রোগীকেই
×

প্রতীকী ছবি

রাজবংশী রায়

প্রকাশ: ২৯ মে ২০২০ | ১২:০০ | আপডেট: ২৯ মে ২০২০ | ১৫:০০

জ্যামিতিক হারে বাড়ছে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ। চিকিৎসার জন্য নির্ধারিত সরকারি হাসপাতালগুলো রোগীর চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে। করোনা ডেডিকেটেড হাসপাতালগুলোতে শয্যা ফাঁকা নেই বললেই চলে। প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে করোনা আক্রান্তদের চিকিৎসা সুবিধা সম্প্রসারণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। গত সোমবার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এ সংক্রান্ত একটি নির্দেশনা জারি করে। সেখানে ৫০ ও এর বেশি শয্যাসংখ্যার প্রত্যেকটি সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে করোনা রোগীর চিকিৎসা দিতে বলা হয়েছে। ওই নির্দেশনায় বলা হয়- স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বিভিন্ন দেশের কভিড-১৯ রোগীদের চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা পর্যালোচনা করে একই হাসপাতালে কভিড ও নন-কভিড রোগীদের পৃথক অংশে রেখে স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার পরামর্শ দিয়েছেন। এ অবস্থায় জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রস্তাবনা অনুযায়ী, কভিড ও নন-কভিড রোগীদের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ৫০ শয্যা ও এর বেশি শয্যাবিশিষ্ট সব সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে কভিড এবং নন-কভিড রোগীদের চিকিৎসার জন্য পৃথক ব্যবস্থা চালুর নির্দেশ প্রদান করা হলো।

করোনা সংক্রমণ বৃদ্ধির পর সরকারি হাসপাতালের পাশাপাশি হলিফ্যামিলি রেড ক্রিসেন্ট মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল, আনোয়ার খান মডার্ন মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল, বসুন্ধরা গ্রুপসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করে সরকার। ওই চুক্তি অনুযায়ী হাসপাতালগুলোর পরিচালন ব্যয় সরকার বহন করবে। কিন্তু নতুন জারি করা নির্দেশনায় এ বিষয়টির উল্লেখ নেই। করোনার চিকিৎসার সঙ্গে যেসব বেসরকারি হাসপাতাল যুক্ত হবে, সেগুলোর ব্যয় সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট কিছু বলা নেই। সরকারিভাবে ব্যয় বহন করা হবে, নাকি রোগী নিজেই ব্যয় বহন করবে, সে বিষয়ে কোনো গাইডলাইন নেই। ফলে প্রত্যেকটি বেসরকারি হাসপাতালে রোগীদের নিজের পকেট থেকে চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে হবে। সেক্ষেত্রে দরিদ্র, নিম্নমধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্তদের পক্ষে চিকিৎসা গ্রহণ কষ্টসাধ্য হয়ে পড়বে।

এদিকে, বেসরকারি হাসপাতালে করোনার চিকিৎসা ব্যয় আক্রান্ত ব্যক্তিকে বহন করতে হবে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ফোকাল পারসন ও অতিরিক্ত সচিব (প্রশাসন) হাবিবুর রহমান খান। সমকালকে তিনি বলেন, করোনা চিকিৎসার সুনির্দিষ্ট কোনো ওষুধ নেই। তাছাড়া আক্রান্তদের বেশিরভাগেরই সংক্রমণ মৃদু। তাদের তেমন ওষুধের প্রয়োজন হয় না। সুতরাং ব্যয় বেশি হবে না। শ্বাসকষ্টসহ অন্যান্য সমস্যা থাকলে আইসিইউর প্রয়োজন হবে। তবে এটি লাগবে সীমিতসংখ্যক মানুষের। এর বাইরে অন্যান্য চিকিৎসা ব্যয় খুব একটা বেশি নয়।

এটি দ্বৈতনীতি- বললেন বিশেষজ্ঞরা : করোনা চিকিৎসা নিয়ে সরকারের সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছেন জনস্বাস্থ্যবিদ ও স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। তারা বলেছেন, বিশ্বব্যাপী মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়া করোনাভাইরাসের চিকিৎসা নিয়ে সরকার দ্বৈতনীতি গ্রহণ করেছে। এর ফলে ক্ষমতাশালী ব্যক্তিরা সরকারি হাসপাতালে বিনামূল্যে চিকিৎসা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুবিধা পাবেন। আর দরিদ্রদের উচ্চমূল্যে বেসরকারি হাসপাতাল থেকে চিকিৎসা নিতে হবে। যাদের পকেটে টাকা নেই, তারা চিকিৎসা সুবিধা থেকে বঞ্চিত হবেন।

এ বিষয়ে জানতে স্বাস্থ্য আন্দোলনের সভাপতি ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ডা. রশিদ-ই মাহবুব গতকাল শুক্রবার সমকালকে বলেন, এ ধরনের নির্দেশনা ভিত্তিহীন। জাতীয় দুর্যোগের সময় চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা নিয়ে দ্বৈতনীতি কোনোভাবেই কাম্য নয়। সরকার এটি করতে পারে না। প্রত্যেকটি মানুষের চিকিৎসা ব্যয় সরকারকেই বহন করতে হবে। দুর্যোগকালীন পরিস্থিতিতে এ ধরনের আইনও রয়েছে। সুতরাং দুর্যোগকালে চিকিৎসার দায়িত্ব সরকার বেসরকারি খাতের ওপর ছেড়ে দিতে পারে না। বেসরকারি খাতকে যুক্ত করা হলে সরকারই তার দেখভাল করবে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও ভাইরোলজিস্ট অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম সমকালকে বলেন, ওই আদেশ বাস্তবসম্মত হয়নি। বেসরকারি হাসপাতালকে যুক্ত করতে বলা হলেই কাজ শেষ হয়ে যায় না। হাসপাতালগুলো করোনা চিকিৎসায় কীভাবে যুক্ত হবে, ব্যয়ভার কে বহন করবে এবং কতদিনের মধ্যে হাসপাতালগুলো প্রস্তুত করতে হবে, সে সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা থাকতে হবে। দুর্যোগের এই সময়ে একশ্রেণির মানুষ বিনামূল্যে চিকিৎসা সুবিধা পাবেন। আরেক শ্রেণিকে নিজের পকেট থেকে ব্যয় মেটাতে হবে- এটি কাম্য নয়। সরকার এ বিষয়টি বিবেচনায় নেবে বলে আশা করি। অন্যথায় করোনা চিকিৎসা নিয়ে শ্রেণিবৈষম্য তৈরি হবে। দরিদ্র ও নিম্নবিত্ত মানুষ চিকিৎসার নাগালের বাইরে থাকবে। এতে পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে।

আদেশ নিয়ে বেসরকারি হাসপাতাল মালিকরাও অন্ধকারে : বেসরকারি হাসপাতালের মালিকরাও স্বাস্থ্য বিভাগের আদেশ নিয়ে অন্ধকারে রয়েছেন। ইউনিভার্সাল মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের চেয়ারম্যান প্রীতি চক্রবর্তী সমকালকে বলেন, দুর্যোগকালে সরকারকে সহযোগিতা করতে চাই। সেবার নামে বাণিজ্যের অভিপ্রায় নেই। কিন্তু এটি করতে গিয়ে অনেকগুলো সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছি। কভিড ইউনিট চালু করতে আইসিইউ বিভাগ পরিচালনার জন্য চিকিৎসক ও নার্স নিয়োগ দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করতে গিয়ে দেখা যাচ্ছে, আগে যেখানে আইসিইউর একজন কনসালট্যান্টের বেতন ৪০ হাজার টাকা এবং নার্সকে ২২ থেকে ২৫ হাজার টাকা দিতে হতো, সেখানে তারা এখন দ্বিগুণ বেতন দাবি করছেন। আবার একজন চিকিৎসক ও নার্স ১০ দিন ডিউটি করার পর ১৪ দিনের জন্য কোয়ারেন্টাইনে চলে যাবেন। এ হিসাবে এক মাস করোনা ইউনিট চালাতে তিনগুণ চিকিৎসক ও নার্সের প্রয়োজন হবে। এসব চিকিৎসক ও নার্স ৮ ঘণ্টা করে ডিউটি করবেন। ২৪ ঘণ্টার ডিউটির জন্য তিনটি শিফট প্রয়োজন হবে। এতে করে আগের তুলনায় প্রায় ৯ গুণ বেশি ব্যয় হবে। একই সঙ্গে করোনা ইউনিটে দায়িত্বরত প্রত্যেক চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীর জন্য উন্নতমানের পিপিই সরবরাহ করতে হবে। প্রতিদিন তিন শিফটে পিপিই পরিবর্তন করতে হবে। এটি অত্যন্ত ব্যয়বহুল। এই পরিমাণ টাকা কী চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের কাছ থেকে নেওয়া যাবে? এ বিষয়ে কোনো গাইডলাইন নেই।

প্রীতি চক্রবর্তী জানান, এসব কারণে তাদের প্রতিষ্ঠানে এখনও করোনা ইউনিট চালু করা সম্ভব হয়নি। সীমিত পরিসরে আইসোলেশন ওয়ার্ড চালু রয়েছে। বর্তমানে তাদের হাসপাতালে ওয়ার্ডের শয্যা ভাড়া প্রতিদিন এক হাজার টাকা করে নেওয়া হয়। কিন্তু করোনা আক্রান্তদের সেবা দিতে গেলে ওই শয্যার ভাড়া ৫ থেকে ৬ হাজার টাকা পড়বে। অন্যথায় পরিচালন ব্যয় সংকুলান করা সম্ভব হবে না।

করোনা রোগীদের জন্য পৃথক হাসপাতাল চালু করতে গিয়ে বাধার সম্মুখীন হওয়ার অভিযোগ এনে তিনি বলেন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অনুমোদন নিয়ে মহাখালী আইসিডিডিআর'বির বিপরীত দিকে হাজি শাহাবুদ্দিন ম্যানশনের নিজস্ব নার্সিং কলেজ ভবনে আইসিইউ, ডায়ালাইসিস সুবিধাসহ ১৫০ শয্যার একটি করোনা ডেডিকেটেড হাসপাতাল প্রস্তুত করা হয়। কিন্তু ওই ভবনের একটি ফ্লোরে থাকা গার্মেন্ট মালিকের বাধার কারণে হাসপাতালটি চালু করা সম্ভব হয়নি। এ বিষয়ে তিনি সরকারের হস্তক্ষেপ কামনা করেন।

ল্যাবএইড গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডা. এএম শামীম সমকালকে বলেন, সরকারের একার পক্ষে এতসংখ্যক করোনা রোগীর চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা পরিচালনা করা সম্ভব নয়। দুর্যোগকালে তারা সরকারকে সহযোগিতা করতে চান। এ কারণে সরকারি নির্দেশনার পর পরই তারা ৩০ শয্যার করোনা ইউনিট চালু করেছেন। কিন্তু এটির পরিচালন ব্যয় আছে। করোনা ইউনিটে দায়িত্বরত চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের অন্যদের তুলনায় বেতন-ভাতা বেশি দিতে হবে। এই বাড়তি ব্যয় রোগীর চিকিৎসা ব্যয়ের সঙ্গে সমন্বয় করতে হবে। এতে করে ব্যয় বেড়ে যাবে। সরকার পিপিই ও মাস্ক সরবরাহ করলে রোগীদের ওপর ব্যয় কিছুটা কমবে।

ডা. এএম শামীম আরও বলেন, সরকারি প্রতিষ্ঠানের চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য বীমা চালু করা হয়েছে। কিন্তু বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরতদের জন্য সে ব্যবস্থা নেই। মনে রাখতে হবে, দুর্যোগের এই সময়ে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের জনবলও চিকিৎসাসেবায় নিয়োজিত আছেন। তাদেরও বিশেষ সুবিধার আওতায় আনা প্রয়োজন। তা না হলে তারা কাজে উৎসাহী হবেন না।

কর্তৃপক্ষের ভাষ্য : স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ফোকাল পারসন ও অতিরিক্ত সচিব (প্রশাসন) হাবিবুর রহমান খান সমকালকে বলেন, বর্তমানে করোনা সংক্রমণের পিকটাইম চলছে। প্রতিদিন আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়বে। আক্রান্ত মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার বিষয়টি এখানে সর্বোচ্চ গুরুত্ব পাবে। এটি বিবেচনা করে ৫০ ও এর বেশি শয্যাবিশিষ্ট দেশের সব সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে করোনা চিকিৎসা নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে। এর মাধ্যমে সব মানুষকে চিকিৎসার আওতায় আনা সম্ভব হবে।

তিনি বলেন, করোনা সংক্রমণ শুরুর পর হাসপাতালে বেশকিছু চিকিৎসক-নার্স আক্রান্ত হয়েছেন। কিছু প্রতিষ্ঠান ও ইউনিটে কার্যক্রম বন্ধ রাখতে হয়েছিল। অনেক হাসপাতাল করোনা নেগেটিভ সনদ ছাড়া রোগী ভর্তি করতে চাচ্ছিল না- এমন অভিযোগ পাওয়া যায়। এতে করে অন্য রোগে আক্রান্ত রোগীদের সেবা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। এর পরিপ্রেক্ষিতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে একটি আদেশ জারি করে সাধারণ রোগীদের সেবা নিশ্চিত করার নির্দেশনা দেওয়া হয়। কিন্তু বর্তমানে করোনা আক্রান্তের সংখ্যা প্রতিদিনই বাড়তে থাকায় নতুন করে সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে। এই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ৫০ শয্যা ও তার বেশি শয্যা থাকা প্রত্যেকটি সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালকে কভিড ও নন-কভিড জোনে ভাগ করা হবে। এতে করে সব ধরনের রোগী সেবা পাবেন।

চিকিৎসা ব্যয় সম্পর্কে জানতে চাইলে হাবিবুর রহমান খান বলেন, বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসার ব্যয় রোগীকেই বহন করতে হবে। বর্তমান পরিস্থিতিতে করোনার পাশাপাশি অন্য রোগীদের চিকিৎসার বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। যেসব হাসপাতাল করোনা নেগেটিভ সনদ ছাড়া রোগী ভর্তি করতে চাচ্ছিল না, এই আদেশের ফলে তারা আর সেটি করতে পারবে না। একই সঙ্গে করোনা আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসাও নিশ্চিত হবে।

আরও পড়ুন

×