ঢাকা শনিবার, ০৬ জুন ২০২৬

নতুন করে ৫৫ জনকে পুশইনের চেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়েছে বিজিবি

নতুন করে ৫৫ জনকে পুশইনের চেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়েছে বিজিবি
×

ছবি: সংগৃহীত

সমকাল ডেস্ক

প্রকাশ: ০৬ জুন ২০২৬ | ০৪:৩৮ | আপডেট: ০৬ জুন ২০২৬ | ০৪:৩৮

নওগাঁ, লালমনিরহাট ও পঞ্চগড় সীমান্ত দিয়ে নতুন করে ৫৫ জনকে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার (পুশইন) চেষ্টা করেছে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ। এর মধ্যে নওগাঁয় ১৭, লালমনিরহাটে ২৮ ও পঞ্চগড় সীমান্ত দিয়ে ১০ জনকে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। তবে বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) তাদের এই অপচেষ্টা রুখে দিয়েছে।

এর আগের ২৪ ঘণ্টায় সীমান্তের ১১ পয়েন্ট দিয়ে ১২৯ জনকে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করে বিএসএফ। বিজিবির তৎপরতায় তাদের সে চেষ্টাও ব্যর্থ হয়। সে সময় চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্তে পুশইনে ব্যর্থ ২৮ জন শূন্যরেখায় দুদিন ধরে আটকে আছে।

এদিকে বিএসএফের পুশইন ঠেকাতে ও চোরাচালান রোধে সীমান্তগুলোতে নজরদারি ও জনবল বৃদ্ধি করেছে বিজিবি। জওয়ানদের সহযোগিতা করছে সীমান্ত এলাকার লোকজন।

নওগাঁর সাপাহার সীমান্ত দিয়ে গতকাল শুক্রবার ১৭ জনকে পুশইনের চেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়েছে বিজিবি। ঘটনার পর সীমান্তে বিজিবি-বিএসএফ মুখোমুখি অবস্থানে রয়েছে। বিজিবি জানায়, হাঁপানিয়া সীমান্তের ২৩৮/এমপি সীমান্ত পিলার দিয়ে বিএসএফ ১৭ জন মানুষকে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করে। খবর পেয়ে হাঁপানিয়া বিওপির টহল দল গিয়ে তাদের ভারতীয় শূন্যরেখায় অবস্থানরত দেখতে পায়। বর্তমানে তারা শূন্যরেখায় অবস্থান করছে। নওগাঁ ব্যাটালিয়ন ১৬ বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ আরিফুল ইসলাম মাসুম বলেন, ওই এলাকায় টহল বাড়ানো হয়েছে। অবৈধভাবে কাউকে বাংলাদেশে ঢুকতে দেওয়া হবে না।

লালমনিরহাটের পাটগ্রাম, হাতীবান্ধা ও আদিতমারী উপজেলার চারটি সীমান্ত দিয়ে পুশইনের উদ্দেশ্যে বিএসএফ ২৮ জনকে শূন্যরেখায় জড়ো করে। তবে বিজিবির কঠোর নজরদারি ও স্থানীয়দের প্রচেষ্টায় বিএসএফের সে চেষ্টা ব্যর্থ হয়। ওই ২৮ জন বর্তমানে সীমান্তের শূন্যরেখায় অবস্থান করছে। বিজিবির রংপুর সেক্টর কমান্ডার সূত্রে এই তথ্য জানা গেছে।

পঞ্চগড়ের সীমান্ত দিয়ে ১০ জনকে পুশইনের চেষ্টা করে বিএসএফ। গত বৃহস্পতিবার গভীর রাতে নীলফামারী ৫৬ বিজিবি ব্যাটালিয়নের আওতায় বড়বাড়ি প্রধানপাড়া সীমান্ত দিয়ে তাদের ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। স্থানীয় লোকজনের সহায়তায় বিজিবি তাদের ঠেকিয়ে দেয়। নীলফামারী ৫৬ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল মো. সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘সীমান্তে পুশইন ও অবৈধ অনুপ্রবেশ ঠেকাতে বিজিবি সজাগ রয়েছে। সদর উপজেলার বড়বাড়ি প্রধানপাড়া সীমান্ত দিয়ে বিএসএফ ১০ জনকে পুশইনের চেষ্টা করে। বিজিবি সদস্যরা তাদের ঠেকিয়ে দেন। বর্তমানে ওই ১০ জন সীমান্তের শূন্যরেখায় অবস্থান করছে।’

চাঁপাইনবাবগঞ্জে শূন্যরেখায় দুদিন ধরে আটকে ২৮ জন

কোম্পানি কমান্ডার ও অধিনায়ক পর্যায়ে তিন দফায় পতাকা বৈঠকের পরও কমেনি চাঁপাইনবাবগঞ্জের বাঙ্গাবাড়ি সীমান্তের উত্তেজনা। এ উত্তেজনার মধ্যেই পুশইনের জন্য বিএসএফের জড়ো করা ২৮ জন ঝোপের মধ্যে শূন্যরেখা থেকে ৫০ গজ ভারতীয় অংশে অবস্থান করছে। গতকাল শুক্রবার সকালে খাদ্যের সন্ধানে তাদের শূন্যরেখার গাছগুলো থেকে আম পাড়তে ও এদিক-ওদিক ছুটতে দেখা গেছে।

দুপুরে বিষয়টি নিশ্চিত করেন ১৬ বিজিবির (নওগাঁ ব্যাটালিয়ন) সহকারী পরিচালক রবিউল ইসলাম। তিনি জানান, সকালে ওই সীমান্তে বিজিবি-বিএসএফের কোম্পানি কমান্ডার পর্যায়ে বৈঠক কোনো সিদ্ধান্ত ছাড়াই শেষ হয়েছে। বিষয়টি সুরাহার জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছে বলে বৈঠকে বিএসএফ জানিয়েছে। এদিকে, গোমস্তাপুর উপজেলার পাঁচ সীমান্ত এলাকায় বৃহস্পতিবার রাতে বিজিবি স্থানীয় লোকজনকে সঙ্গে নিয়ে পাহারা দেয় বলে জানা গেছে।

অন্যদিকে, জনবল বৃদ্ধিসহ সীমান্তে কঠোর নজরদারি ও তৎপরতা বাড়িয়েছে বিজিবি। নতুন করে সদস্য বাড়ানোর পাশাপাশি নজরদারি বাড়াতে পরিখা খনন শুরু করেছে।

সীমান্তে উত্তেজনাকর পরিস্থিতি থাকায় বিজিবি জনসাধারণকে সচেতন করতে প্রচার শুরু করছে। এ ছাড়া বৃহস্পতিবার গভীর রাতে কিরণগঞ্জ সীমান্তের কাঁটাতার উন্মুক্ত এলাকা দিয়ে শূন্যরেখায় কিছু অপরিচিত লোককে দেখতে পেয়ে স্থানীয়রা চিৎকার শুরু করলে উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। কিছুক্ষণ পর তারা সরে গেলে পরিস্থিতি শান্ত হয়।

১৬ বিজিবি নওগাঁ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল মোহাম্মদ আরিফুল ইসলাম মাসুম বলেন, কোনোভাবেই কাউকে বাংলাদেশে প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না।

এর আগে বৃহস্পতিবার ভোরে গোমস্তাপুর উপজেলার বাঙ্গাবাড়ি ইউনিয়ন সীমান্তের ২০৩/৬-আর পিলারসংলগ্ন এলাকা দিয়ে ২৮ জনকে পুশইনের চেষ্টা করে বিএসএফ।

মেহেরপুর সীমান্তে বিজিবি ও স্থানীয়দের কড়া নজরদারি

ভারতে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতার পালাবদলে সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে পুশইন তৎপরতা বেড়ে গেছে। বিএসএফ প্রতিদিন কোনো না কোনো সীমান্ত দিয়ে তাদের দেশের নাগরিকদের বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করছে। বিএসএফের অপতৎপরতা রুখে দিতে বিজিবিও কঠোর অবস্থান নিয়েছে। জওয়ান এবং স্থানীয় অধিবাসীদের সতর্ক অবস্থান বিএসএফের অপচেষ্টা নস্যাৎ করে দিচ্ছে।

মেহেরপুর সীমান্তে এখনও পুশইনের কোনো ঘটনা ঘটেনি। তবে যেকোনো সময় মানুষ ঠেলে দিতে পারে বিএসএফ—এই আশঙ্কায় বিজিবি সদস্য ও স্থানীয় অধিবাসীরা সীমান্তে কঠোর নজরদারি করছেন।

৭১৬ বর্গকিলোমিটার আয়তনের মেহেরপুর জেলার তিন দিকে প্রায় ৮৬ কিলোমিটার সীমান্ত রয়েছে। সীমান্ত দিয়ে বিএসএফের পুশইন তৎপরতার আলোচনা এখন সর্বত্র। রাতে সীমান্তে ভারতীয় সার্চলাইটের দিকে সজাগ দৃষ্টি রেখে সীমান্ত পাহারা দিচ্ছেন বিজিবি সদস্যরা। তাঁদের সঙ্গে স্থানীয় বাসিন্দারা সতর্ক দৃষ্টি রাখছেন। বাড়ানো হয়েছে গোয়েন্দা তৎপরতা, স্থাপন করা হয়েছে বিশেষ চেকপোস্ট। সন্দেহজনক চলাচলের ওপর রাখা হচ্ছে সার্বক্ষণিক নজরদারি।

বিজিবি সূত্র জানায়, সীমান্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চুয়াডাঙ্গা ও কুষ্টিয়া ব্যাটালিয়নের আওতায় মেহেরপুর ও চুয়াডাঙ্গা জেলার মোট ১৯টি বিওপি ও একটি আইসিপির মাধ্যমে প্রতিদিন ৮১টি টহল পরিচালনা করা হচ্ছে। পাশাপাশি স্থানীয় প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, গোয়েন্দা সংস্থা, আনসার ও ভিডিপির সঙ্গে সমন্বয় করে সীমান্তবর্তী এলাকায় নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।

সদর উপজেলার কুতুবপুর গ্রামের মিজানুর রহমান বলেন, ‘সীমান্ত পাহারায় আমরা সব সময় বিজিবির সঙ্গে আছি। বিএসএফের পুশইন তৎপরতা রুখে দেওয়া হবে। আমরা সীমান্ত দিয়ে মাদক, চোরাচালান ও অবৈধ পুশইন যেন না হয়, সে ব্যাপারে বিজিবিকে সহায়তা করছি। আমাদের দেশ, আমাদেরও দায়িত্ব আছে। তাই গ্রামের সবাই মিলে পালাক্রমে বিজিবির সঙ্গে পাহাড়ায় অংশ নিচ্ছি। রাতে পাহারা বেশি জোরদার করা হয়েছে।’

চুয়াডাঙ্গা ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল নাজমুল হাসান বলেন, ‘মেহেরপুরে ৮৬ কিলোমিটার সীমান্ত রয়েছে। এর মধ্যে ৬৩ কিলোমিটার মেহেরপুর অঞ্চলের দায়িত্ব পড়েছে আমাদের ওপর। বাকিটা নিয়ন্ত্রণ করে কুষ্টিয়া ব্যাটালিয়ন। এসব সীমান্তে অবৈধ পুশইন ঠেকাতে টহল জোরদার করা হয়েছে। অবৈধভাবে কাউকে ঠেলে দিলে বিজিবি তা মানবে না। বিজিবি সদস্য ছাড়াও সাধারণ মানুষকেও সচেতন করা হচ্ছে। তারা যেন সীমান্তের যেকোনো অবৈধ তৎপরতা রুখতে বিজিবির পাশে থাকে।’

৪৭ বিজিবি কুষ্টিয়া ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল রাশেদ কামাল রনি বলেন, মেহেরপুরের সীমান্ত এলাকায় এখন পাটক্ষেত থাকায় দূর থেকে দেখতে অনেকটা সমস্যা হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে সীমান্তের কৃষকেরা বিভিন্ন তথ্য দিয়ে ভালো ভূমিকা রাখছেন। পরিস্থিতি মোকাবিলায় টহল জোরদার করা হয়েছে।

সাতক্ষীরা সীমান্তেও কঠোর অবস্থানে বিজিবি

সাতক্ষীরা জেলার সীমান্ত এলাকাগুলোতে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে বিজিবি। বিশেষ করে জেলার গাজিপুর, ভোমরা, পদ্মশাখরা, কাকডাঙ্গা, কেড়াগাছি ও চন্দনপুর সীমান্ত এলাকায় টহল ও নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।

সাতক্ষীরা-৩৩ বিজিবির ভাষ্য, পশ্চিমবঙ্গের উত্তর চব্বিশ পরগনা জেলার বাদুড়িয়া থানার অন্তর্গত হাকিমপুর সীমান্তে বেশ কিছু লোক জড়ো করা হয়েছিল। বিএসএফ তাদের বাংলাদেশে পুশইনের চেষ্টা করে। তবে বিজিবির কঠোর অবস্থানের কারণে সেই চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে।

সাতক্ষীরা-৩৩ ব্যাটালিয়ন অধিনায়ক লে. কর্নেল কাজী আশিকুর রহমান বলেন, ‘পুশইন ঠেকাতে সাতক্ষীরার সীমান্তগুলোতে বিজিবির টহল জোরদার করা হয়েছে। এ ব্যাপারে বিজিবি কঠোর অবস্থানে রয়েছে।’

আরও পড়ুন

×