বন্যা
খোলা হলো তিস্তা ব্যারাজের সব জলকপাট
ভারী বৃষ্টির আভাস, কুড়িগ্রামে নদীভাঙন শুরু
উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে লালমনিরহাটে তিস্তা নদীর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। এরই মধ্যে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হতে শুরু করেছে। গতকাল মঙ্গলবার লালমনিরহাট থেকে তোলা -সংগৃহীত
জলবায়ুবিষয়ক প্রতিবেদক
প্রকাশ: ২৪ জুন ২০২৬ | ০৮:৩৯ | আপডেট: ২৪ জুন ২০২৬ | ০৯:২৬
| প্রিন্ট সংস্করণ
দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ভারী বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস দিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। বিশেষ করে উত্তরাঞ্চল, ময়মনসিংহ, সিলেট ও চট্টগ্রাম বিভাগের বিভিন্ন এলাকায় আগামী কয়েক দিন ভারী থেকে অতিভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। উজানে অব্যাহত বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলের কারণে তিস্তা, ব্রহ্মপুত্র, ধরলা, দুধকুমারসহ উত্তরাঞ্চলের প্রধান নদীগুলোর পানি দ্রুত বাড়ছে। এরই মধ্যে গতকাল মঙ্গলবার নীলফামারীর ডালিয়া পয়েন্টে তিস্তা নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করেছে।
তিস্তা নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় তিস্তা ব্যারাজের ৪৪টি জলকপাটের সব খুলে পানি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। কুড়িগ্রামে শুরু হয়েছে নদীভাঙন। অন্যদিকে, ময়মনসিংহের সীমান্তবর্তী হালুয়াঘাটে পাহাড়ি ঢলে অন্তত ১৪টি গ্রামের হাজারো মানুষ ব্যাপক দুর্ভোগে পড়েছেন।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ হাফিজুর রহমান বলেন, দেশের উত্তরাঞ্চলে বৃষ্টিপাতের প্রবণতা সবচেয়ে বেশি থাকবে। পাশাপাশি ময়মনসিংহ, সিলেট ও চট্টগ্রাম বিভাগের কিছু এলাকায়ও ভারী বর্ষণ হতে পারে। উজানের ভারী বৃষ্টির প্রভাব দেশের নদনদীতেও পড়ছে।
পাউবো ডালিয়া ডিভিশন সূত্রে জানা গেছে, মঙ্গলবার বিকেল ৩টায় তিস্তা নদীর পানি ডালিয়া পয়েন্টে ৫২ দশমিক ১৬ মিটার উচ্চতায় প্রবাহিত হয়। এ পয়েন্টে বিপৎসীমা ৫২ দশমিক ১৫ মিটার। অর্থাৎ, পানি বিপৎসীমার ১ সেন্টিমিটার ওপরে উঠে যায়। পানি বৃদ্ধির কারণে তিস্তা ব্যারাজের ৪৪টি জলকপাট খুলে দেওয়া হয়েছে। এতে উজানের ঢলের পানি দ্রুত নিষ্কাশনের চেষ্টা করা হচ্ছে।
ভারতের সেন্ট্রাল ওয়াটার কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, তিস্তার উজানের দোমোহনী পয়েন্টে মঙ্গলবার দুপুরে পানি বিপৎসীমার ৩৭ সেন্টিমিটার নিচে থাকলেও বাংলাদেশ সীমান্তের কাছাকাছি মেখলিগঞ্জ পয়েন্টে পানি বিপৎসীমার ১০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। ফলে তিস্তার নিম্ন অববাহিকায় পানি বৃদ্ধির চাপ তৈরি হয়েছে।
পাউবোর ডালিয়া ডিভিশনের নির্বাহী প্রকৌশলী অমিতাভ চৌধুরী বলেন, উজানের ঢলের কারণে নদীর পানি বেড়েছে। তবে আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। নদীতীরবর্তী এলাকার মানুষের নিরাপত্তার জন্য প্রশাসন ও পাউবো সার্বক্ষণিক নজরদারি করছে।
তবে পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার পূর্ব ছাতনাই, খগাখড়িবাড়ী, টেপাখড়িবাড়ী, খালিশা চাপানী, ঝুনাগাছ চাপানী ও গয়াবাড়ী ইউনিয়ন এবং জলঢাকা উপজেলার গোলমুন্ডা, ডাউয়াবাড়ী ও শৌলমারী ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
উজানের ঢলের প্রভাবে কুড়িগ্রামের ব্রহ্মপুত্র, ধরলা, তিস্তা, দুধকুমার, জিঞ্জিরাম, অর্জুনডারাসহ জেলার ৩২টি নদনদীর পানি বাড়ছে। যদিও সব নদীর পানি বিপৎসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে, তবু বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র নিম্নাঞ্চলে স্বল্পমেয়াদি বন্যার আশঙ্কা প্রকাশ করেছে।
কুড়িগ্রাম পাউবোর তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় ধরলা নদীর পানি সেতু পয়েন্টে ১৬ সেন্টিমিটার, তিস্তার পানি কাউনিয়া পয়েন্টে ২১ সেন্টিমিটার, ব্রহ্মপুত্রের পানি চিলমারী পয়েন্টে ১২ সেন্টিমিটার এবং নুনখাওয়া পয়েন্টে ১৮ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়েছে।
পানি বৃদ্ধির পাশাপাশি জেলার বিভিন্ন নদনদীতীরবর্তী অন্তত ৩৫টি স্থানে ভাঙন শুরু হয়েছে। এতে নদীপারের বাসিন্দাদের মধ্যে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে। অনেক পরিবার ইতোমধ্যে ঘরবাড়ি ও গবাদি পশু নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতি শুরু করেছে।
কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী উপজেলায় ব্রহ্মপুত্র, দুধকুমার, গঙ্গাধর, শংকোষ ও ফুলকুমার নদীর পানি বৃদ্ধিতে বন্যার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। কয়েক দিন ধরে চলা বৃষ্টি এবং উজান থেকে নেমে আসা ঢলের কারণে চরের নিম্নাঞ্চল তলিয়ে যেতে শুরু করেছে।
গতকাল সরেজমিন দেখা গেছে, বল্লভেরখাসের ফান্দের চর, বামনডাঙ্গার চর লুছনি, কেদারের চর বিষ্ণুপুর, শৌলমারী, ঝাউকুটি, মাঝিয়ালীসহ বিভিন্ন চরাঞ্চলের নিচু জমিতে পানি প্রবেশ করেছে। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, এভাবে পানি বাড়তে থাকলে রাস্তাঘাট, বসতভিটা এবং রোপা আমনের বীজতলা তলিয়ে যেতে পারে। এতে কৃষকদের বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়তে হবে।
টানা বৃষ্টি ও ভারতের মেঘালয় থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে ময়মনসিংহের সীমান্তবর্তী হালুয়াঘাট উপজেলার কয়েকটি গ্রামের হাজারো মানুষ দুর্ভোগে পড়েছেন। ঢলের পানিতে ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট ও ফসলি জমি তলিয়ে গেছে। পানি কিছুটা নেমে গেলেও ঘরে জমে থাকা কাদা ও পলিমাটি সরাতে হিমশিম খাচ্ছেন ক্ষতিগ্রস্তরা।
উপজেলার গাজিরভিটা ইউনিয়নের বোয়ালমারা, আনচেংগ্রী, মহাজনীকান্দা, ধলাপানি, সূর্যপুর, নলকুড়া ও ভালুকাকুড়া গ্রামসহ ১৪টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। পাশাপাশি নড়াইল ও হালুয়াঘাট সদর ইউনিয়নের কয়েকটি গ্রামেও মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন।
সোমবার বিকেলে সূর্যপুর ও বোয়ালমারা গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, বোরাঘাট নদীর তীব্র স্রোতে কয়েকটি স্থানে নদীতীর ভেঙে গেছে। অনেক বাড়ির আঙিনায় কাদার স্তর জমে রয়েছে। স্থানীয় লোকজন ঘর পরিষ্কার ও আসবাব শুকানোর কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন।
পানি বৃদ্ধির কারণে উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় পাটক্ষেত ও নিচু জমির ফসল ঝুঁকির মুখে পড়েছে। কুড়িগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় পাটক্ষেতে পানি ঢুকেছে। কৃষকদের আশঙ্কা, দীর্ঘ সময় পানি স্থায়ী হলে পাট ও আমন মৌসুমের প্রস্তুতি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
(প্রতিবেদন তৈরিতে তথ্য দিয়েছেন জেলা ও উপজেলা প্রতিনিধি)
- বিষয় :
- বন্যা
- তিস্তা ব্যারেজ
- বৃষ্টি
