ঢাকা রোববার, ১৬ আগস্ট ২০২৬

গ্যাস সংকট

রাত ৮টায় লাইনে, গ্যাস মিলল না রাত ১টায়

বেড়েছে লোডশেডিং

রাত ৮টায় লাইনে, গ্যাস মিলল না রাত ১টায়
×

সিএনজি স্টেশনে গ্যাসের জন্য অপেক্ষা

হাসনাইন ইমতিয়াজ

প্রকাশ: ১৬ আগস্ট ২০২৬ | ০১:৫৯

রাজধানীর তেজগাঁওয়ের অল ইন ওয়ান সিএনজি স্টেশনে শনিবার রাত ৮টায় গ্যাসের জন্য লাইনে দাঁড়িয়ে ছিলেন অটোচালক আক্তার। রাত ১টায়ও তাঁর গাড়িতে গ্যাস ঢোকেনি। পাম্পের সামনে তখনও তাঁর সঙ্গে আরও ১০টি গাড়ি অপেক্ষায়। আক্তার বলেন, ‘রাত আটটায় লাইনে দাঁড়িয়েছি। এখন একটা বাজে, গ্যাস পাইনি।’

শুধু রাতে নয়, দিনেও রাজধানীর বিভিন্ন সিএনজি স্টেশনে একই চিত্র দেখা গেছে। কোথাও গ্যাস থাকলেও চাপ কম। কোথাও ‘গ্যাস নেই’ সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে। আবার কোথাও কয়েক ঘণ্টা অপেক্ষার পর অল্প গ্যাস নিয়ে ফিরতে হয়েছে চালকদের। যদিও শনিবার জাতীয় গ্রিডে গ্যাসের সরবরাহ কিছুটা বাড়লেও সিএনজিখাতে তার সুফল মেলেনি।

সিএনজি স্টেশনগুলোতে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ১৬ কোটি ঘনফুট। বিপরীতে এখন পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ১ থেকে ২ কোটি ঘনফুটের মতো। ফলে চাহিদার তুলনায় সরবরাহ নেমে এসেছে একেবারে তলানিতে। কোথাও গ্যাসের চাপ ২ থেকে ৩ পিএসআই পর্যন্ত নেমে আসায় গাড়িতে গ্যাস দিতে দীর্ঘ সময় লাগছে। এতে স্টেশনগুলোতে তৈরি হচ্ছে দীর্ঘ সারি।

আটকে যাচ্ছে চালকদের দিন
আক্তার জানান, সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত সিএনজি সরবরাহ বন্ধ থাকে। রাত ৯টায় পাম্প খুললেও পর্যাপ্ত গ্যাস না থাকায় কিছুক্ষণ পর আবার সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়া হয়। ফলে চালকদের দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও গ্যাস মিলছে না।

তেজগাঁওয়ের ওই স্টেশনের সামনে রাত ১টা পর্যন্ত অপেক্ষা করা চালকদের কয়েকজন জানান, দিনে গাড়ি চালিয়ে যতটা আয় করার সুযোগ থাকে, তার বড় অংশই এখন গ্যাসের লাইনে কেটে যাচ্ছে। কখন গ্যাস পাওয়া যাবে, তারও নিশ্চয়তা নেই।

রাজধানীর গাবতলী, কালশী, উত্তরা ও ডেমরাসহ বিভিন্ন এলাকার স্টেশনে শনিবার দীর্ঘ সারি দেখা গেছে। কোনো কোনো চালক ৩ থেকে ৫ ঘণ্টা অপেক্ষা করেও চাহিদামতো গ্যাস পাননি। গ্যাসের চাপ কম থাকায় একটি গাড়িতে গ্যাস দিতে স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় বেশি সময় লাগছে।

এক চালক বলেন, আগে অল্প সময়ের মধ্যে গ্যাস নিয়ে রাস্তায় নামা যেত। এখন কয়েক ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকার পরও অল্প গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে। এতে যাত্রী পরিবহনের সময় কমে যাচ্ছে, কমছে ট্রিপ ও আয়।

চালকদের এই দুর্ভোগ শুধু রাজধানীতেই সীমাবদ্ধ নয়। চট্টগ্রামেও গ্যাস না পেয়ে চালকেরা সড়কে অবস্থান নিয়েছেন। সেখানে কোনো কোনো চালকের অভিযোগ, ২৪ ঘণ্টার বেশি সময় অপেক্ষা করেও গ্যাস পাননি। ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় গ্যাস সংকটে সবকটি সিএনজি ফিলিং স্টেশন বন্ধ থাকার খবরও পাওয়া গেছে।

‘চাহিদার তুলনায় গ্যাস পাচ্ছি না’
সিএনজি রিফুয়েলিং স্টেশন ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব ফারহান নুর বলেন, সিএনজি স্টেশনগুলোতে দীর্ঘদিন ধরেই গ্যাসের সংকট চলছে। সাম্প্রতিক সময়ে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে। গ্যাসের চাপ অনেক কমে ২ থেকে ৩ পিএসআই পর্যন্ত নেমে এসেছে। ফলে স্টেশনগুলোতে চাহিদার তুলনায় গ্যাস দেওয়া যাচ্ছে না।

তিনি বলেন, এলএনজি সরবরাহ কিছুটা স্বাভাবিক হওয়ায় পরিস্থিতি ধীরে ধীরে উন্নতির দিকে যাচ্ছে। তবে স্টেশনগুলোতে পর্যাপ্ত গ্যাস সরবরাহ না বাড়লে সংকট পুরোপুরি কাটবে না।

ফারহান নুর বলেন, দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে থাকায় চালকদের দৈনিক আয় কমে যাচ্ছে। কিন্তু গাড়ির মালিকের দৈনিক জমার টাকা দিতে হচ্ছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এই জমা ১ হাজার ২০০ টাকা পর্যন্ত। ফলে আয়-ব্যয়ের ভারসাম্য রাখতে না পেরে চালকেরা ভাড়া বাড়াতে বাধ্য হচ্ছেন। এর প্রভাব পড়ছে যাত্রীদের ওপরও।

তিনি বলেন, গ্যাসের সরবরাহ না বাড়ালে শুধু সিএনজি স্টেশনের সমস্যা নয়, পরিবহন খাতেও এর প্রভাব আরও বাড়বে।

গ্যাস বাড়লেও শিল্পে, বিদ্যুতে নয়
জাতীয় গ্রিডে গ্যাসের সরবরাহ অবশ্য আগের তুলনায় বেড়েছে। শুক্রবার দুই এলএনজি টার্মিনালের সরবরাহে বড় ধাক্কার পর জাতীয় গ্রিডে গ্যাসের প্রবাহ নেমে গিয়েছিল প্রায় ১৬৫ কোটি ঘনফুটে। পরে সামিট থেকে শুক্রবার সন্ধ্যা ৬টা ১০ মিনিটে আবার সরবরাহ শুরু হয়।

শনিবার সন্ধ্যা ৬টায় জাতীয় গ্রিডে মোট গ্যাসের প্রবাহ দাঁড়ায় ২৪৩ কোটি ৮০ লাখ ঘনফুট। এর মধ্যে দেশীয় গ্যাস ১৬১ কোটি ৫০ লাখ এবং আমদানি করা এলএনজি ৮২ কোটি ৮০ লাখ ঘনফুট।

সন্ধ্যা ৬টার হিসাবে বিদ্যুৎকেন্দ্রে গেছে ৯৩ কোটি ১০ লাখ ঘনফুট গ্যাস। সার কারখানায় ১৫ কোটি ৩০ লাখ এবং অন্যান্য খাতে গেছে ১৩৫ কোটি ৪০ লাখ ঘনফুট।

অর্থাৎ সরবরাহ বাড়লেও তার বড় অংশ গেছে শিল্পসহ অন্যান্য খাতে। সিএনজি স্টেশন ও বিদ্যুৎ উৎপাদনে সেই অনুপাতে বাড়তি গ্যাস দেওয়া হয়নি। ফলে একদিকে কিছু শিল্পকারখানা শনিবার উৎপাদনে ফিরতে পেরেছে, অন্যদিকে সিএনজি স্টেশনে সংকট রয়ে গেছে এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনেও ঘাটতি তৈরি হয়েছে।

পাওয়ার গ্রিডের তথ্য অনুযায়ী, শনিবার সকাল ৬টায় বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৪ হাজার ৩৭২ মেগাওয়াট, সরবরাহ ১৩ হাজার ১১৮ মেগাওয়াট। ঘাটতি ছিল ১ হাজার ২৫৪ মেগাওয়াট। দুপুরের পর ঘাটতি আবার বাড়তে থাকে। বিকেল ৩টায় তা দাঁড়ায় ১ হাজার ৬১৬ মেগাওয়াট। রাত ৮টায়ও ঘাটতি ছিল ১ হাজার ৩৩৫ মেগাওয়াট।

টার্মিনালেই সংকটের শুরু
মহেশখালীর দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের সরবরাহে একের পর এক সমস্যা তৈরি হওয়ায় বর্তমান সংকটের শুরু।

এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনালের একটি বয়লার গত ২১ জুলাই অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরে সীমিতভাবে সরবরাহ শুরু হলেও শুক্রবার কারিগরি সমস্যায় আবার টার্মিনালটি বন্ধ হয়ে যায়। অন্যদিকে বৈরী আবহাওয়ার কারণে সামিটের টার্মিনালে সময়মতো এলএনজি কার্গো যুক্ত করা যায়নি। এতে মজুত কমে গিয়ে একপর্যায়ে সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়।

শনিবার সামিট থেকে সরবরাহ বাড়লেও এক্সিলারেট পুরোপুরি চালু না হওয়ায় সংকট পুরোপুরি কাটেনি। সংশ্লিষ্টদের আশা, এক্সিলারেটের মেরামত শেষ হলে সরবরাহ আরও বাড়বে। তবে তার আগ পর্যন্ত গ্যাসের চাপ স্বাভাবিক হওয়ার নিশ্চয়তা নেই।

ফলে জাতীয় গ্রিডে গ্যাসের সরবরাহ কিছুটা বাড়লেও তার সুফল এখনো সব খাতে পৌঁছায়নি। শিল্পে বাড়তি গ্যাসে কিছু কারখানা উৎপাদনে ফিরলেও সিএনজি স্টেশনগুলোতে দীর্ঘ সারি, কম চাপ ও অল্প সরবরাহের ভোগান্তি অব্যাহত রয়েছে। পাশাপাশি বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাসের ঘাটতির কারণে লোডশেডিংও কমছে না। 

আরও পড়ুন

×