ঢাকা রোববার, ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬

বিদ্যুৎ সংকট

বরফ উৎপাদন নেমেছে এক-তৃতীয়াংশে

বরফ উৎপাদন নেমেছে এক-তৃতীয়াংশে
×

বরগুনার পাথরঘাটা বিএফডিসি মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রে ইলিশ মাছ সংরক্ষণে বরফ দিচ্ছেন দুই শ্রমিক। গতকাল সোমবার তোলা সমকাল

সুমন চৌধুরী, বরিশাল, ইমাম হোসেন, পাথরঘাটা (বরগুনা) ও আসাদুজ্জামান মিরাজ, কুয়াকাটা (পটুয়াখালী)

প্রকাশ: ২৫ আগস্ট ২০২৬ | ০৮:২৫

| প্রিন্ট সংস্করণ

বঙ্গোপসাগরের মোহনা থেকে বরগুনার পাথরঘাটা বিএফডিসি মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রের দূরত্ব ২০ কিলোমিটারের মতো। স্থানীয় ট্রলারের পাশাপাশি চট্টগ্রামসহ অন্যান্য এলাকার গভীর সাগরগামী মাছ ধরার ট্রলার, মাছ বিক্রি ও বরফের জন্য আসে এই মোকামে। এসব কারণে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম মাছের মোকাম হিসেবে পাথরঘাটার পরিচিতি। উপজেলার অর্থনীতির প্রায় পুরোটাই মৎস্যসম্পদ নির্ভর। কিন্তু সাম্প্রতিক বিদ্যুৎ সংকটে বরফ উৎপাদন কমে নেমেছে এক-তৃতীংয়াশে। এতে পুরো ব্যবসায় বড় ধাক্কা লেগেছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। দক্ষিণাঞ্চলের আরেক বড় মোকাম পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার মহিপুর-আলীপুরের ব্যবসায়ীরাও অভিন্ন সংকটের মুখোমুখি। 

মৎস্য ব্যবসায়ীরা বলছেন, ইলিশের ভরা মৌসুম চলছে। এরই মধ্যে উৎপাদন কমে যাওয়ায় চাহিদা অনুযায়ী বরফ পাচ্ছেন না। যে বরফ পাচ্ছেন, এ জন্য গুণতে হচ্ছে প্রায় দ্বিগুণ টাকা। এ দুই কারণে পাথরঘাটা, মহীপুর-আলীপুর মোকামের ব্যবসায়ীরা বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছেন। 

পাথরঘাটার খাজা বরফকলের কর্মরত আছেন ২০-২৫ জন শ্রমিক কাজ করেন। বিদ্যুৎ না থাকায় তাদের বসিয়ে বেতন দিতে হচ্ছে বলে জানান প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী মিহির কুমার। তাঁর ভাষ্য, কয়েক মাসে অনেক টাকার লোকসান হয়েছে। এভাবে চলতে থাকলে শ্রমিক ছাঁটাই করে বরফকল বন্ধ রাখতে বাধ্য হবেন।
পাথরঘাটা বরফকল মালিক সমিতি সূত্রে জানা গেছে, পাথরঘাটার ২৪টি বরফকলে আগে ৮ ঘণ্টায় ২৮ হাজার ৮০০ ক্যান বরফ উৎপাদন করা হতো। বিদ্যুৎ সংকটে ৮ ঘণ্টায় উৎপাদন হয় সর্বোচ্চ ১০ হাজার ক্যান। এ সংকটের সুযোগে প্রতি ক্যান বরফের দাম ১০০-১৫০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে।

সমিতির সাধারণ সম্পাদক সেলিম চৌধুরীর ভাষ্য, ১২৫ কেজি ওজনের এক ক্যান বরফ তৈরি করতে অন্তত ৮ ঘণ্টা নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের প্রয়োজন। একটানা ৮ ঘণ্টা বিদ্যুৎ পাওয়া এখন স্বপ্নের মতো। বারবার বিদ্যুৎ বন্ধ হওয়ায় একটি ক্যানে সর্বোচ্চ ৬০ কেজি ওজনের বরফ তৈরি হচ্ছে। 

কলাপাড়ার মহিপুর-আলীপুর বন্দরে বরফকলের সংখ্যা ২৭টি। জননী আইসপ্লান্ট নামের একটি কলের স্বত্বাধিকারী মো. কবির হোসেন বলেন, পানি ঠাণ্ডা হতে প্রায় ৮ ঘণ্টা সময় লাগে। এরপর বরফ তৈরি করতে আরও সময় প্রয়োজন হয়। ১২-১৬ ঘণ্টা নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ না পেলে পরিপূর্ণ বরফ হয় না। ২৪ ঘণ্টায় ৮-১০ বার লোডশেডিং হয়। প্রতি দফায় দুই ঘণ্টার বেশি বিদ্যুৎ বন্ধ থাকে।
সাগরগামী জেলেদের দেওয়া তথ্যমতে, ট্রলার নিয়ে গভীর সাগরে যাওয়ার সময় ২৫০-৩০০ ক্যান বরফ নিতে হয়। আবার মাছ নিয়ে ফিরে আসার পর সংরক্ষণেও বিপুল পরিমাণ বরফের প্রয়োজন। কিন্তু সাম্প্রতিক বিদ্যুৎ সংকটে উৎপাদন কমে যাওয়ায় যা প্রয়োজন, তার কম বরফ পাচ্ছেন তারা। 

পাথরঘাটার মাছ ব্যবসায়ী জাকির হোসেন জানান, উৎপাদন কমে যাওয়ায় বরফ ব্যবসায়ও সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। যে বরফের ক্যান কিছুদিন আগেও ১২০ টাকা পাওয়া যেত, এখন সেই ক্যানের জন্য ২০০-২৫০ টাকা গুণতে হচ্ছে। 
আলীপুরের আড়তদার মো. মিজানুর রহমানের ভাষ্য, বরফ ছাড়া মাছ সংরক্ষণ ও পরিবহন কোনোভাবেই সম্ভব নয়। বরফ উৎপাদন ব্যাহত হলে মাছের মান ও ব্যবসা দুটিই ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

বরগুনা জেলা ট্রলার মালিক সমিতি সূত্রে জানা গেছে, তাদের অধীনে সাগরগামী ট্রলার রয়েছে এক হাজার ৩৫০টি। পাশাপাশি ছোট ট্রলার রয়েছে অনেক, যেগুলো গভীর সাগরে যায় না। সব মিলিয়ে মোট সাড়ে ৩ হাজার নৌযান রয়েছে। গভীর সাগর থেকে অন্যান্য জেলার ট্রলারও বরফ সংগ্রহের 
জন্য পাথরঘাটায় আসে। তাই এ মোকামে বরফের চাহিদা অনেক। সে অনুযায়ী উৎপাদন না হওয়ায় সংকট দিন দিন বাড়ছে। 
গত বৃহস্পতিবার সকাল ৭টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত পাথরঘাটা পুরো উপজেলা ছিল বিদ্যুৎহীন। রাতে লোডশেডিং দেওয়া হয় তিনবার। প্রতি দফায় দুই ঘণ্টা করে বন্ধ ছিল বিদ্যুৎ। এসব স্বীকার করেন পল্লী বিদ্যুতের পাথরঘাটা সাব স্টেশনের অতিরিক্ত মহাব্যস্থাপক আরিফ শাহরিয়ার। তাঁর দেওয়া তথ্যমতে, উপজেলায় বিদ্যুতের চাহিদা ১৩ মেগাওয়াট। তারা পাচ্ছেন ৭-৮ মেগাওয়াট। চাহিদার অর্ধেক সরবরাহ পাওয়ায় প্রতিটি ফিডারে ২ ঘণ্টা করে লোডশেডিং দিতে বাধ্য হচ্ছেন। এক একটি ফিডারে ২৪ ঘণ্টায় ৫-৭ বার লোডশেডিং করতে হয়। 
পল্লী বিদ্যুতের কুয়াকাটা সাবজোনাল কার্যালয়ের ডিজিএম মোস্তফা আমিনুর রাশেদ বলেন, পর্যটনকেন্দ্র কুয়াকাটাসহ মহিপুর-আলীপুর বন্দরে বিদ্যুতের চাহিদা ১০ মেগাওয়াট। কিন্তু ৫-৬ মেগাওয়াটের বেশি সরবরাহ পাচ্ছেন না। ফলে ২৪ ঘণ্টায় ৭-৮ বার লেডশেডিং হয়।

আরও পড়ুন

×