সিজিএসের সংলাপে বক্তারা
রিকনসিলিয়েশনের আগে আ.লীগের বিচার হবে
ছবি-সংগৃহীত
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ০৫ অক্টোবর ২০২৬ | ২২:৫৩ | আপডেট: ০৬ অক্টোবর ২০২৬ | ০০:১৩
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের রিকনসিলিয়েশন (সত্য উদঘাটন ও অনুশোচনার মাধ্যমে সমঝোতা) জন্য আগে বিচার হতে হবে। যৌথ তদন্ত, ভুক্তভোগীদের ক্ষতিপূরণ এবং অপরাধীদের অনুশোচনা ও শাস্তি ছড়া রিকশনসিলিয়েশন হবে না। তবে কেবল দোষারোপে অতিরিক্ত মনোযোগ দিলে রিসকনসিলিয়েশন কঠিন হয়ে যাবে।
সোমবার রাজধানীর সোনারগাঁও হোটেলে ‘মহাসংলাপ: ন্যায়বিচার, জবাবদিহিতা ও রিকনসিলিয়েশন’ শীর্ষক সেশনে এসব কথা বলেছেন বক্তারা। সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) আয়োজিত ‘বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন-২০২৬’ এ সেশন অনুষ্ঠিত হয়।
এতে অংশ নেন ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল, নিউ এইজ সম্পাদক নুরুল কবীর, রাজস্থান বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কারোরি সিং, দক্ষিণ আফ্রিকার উইটস বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক মাদালিতসো জিলিলো ফিরি, কলম্বিয়ার সেন্টার ফর পিস এন্ড কনফ্লিক্ট স্টাডিজের নির্বাহী পরিচালক নিক্কি সিঙ্গার।
জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশনের তথ্যানুসন্ধানে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে মানবতাবিরোধী অপরাধ এবং নির্বিচার হত্যার জন্য আওয়ামী লীগ এবং দলটির তৎকালীন নেতৃত্বকে দায়ী করা হয়েছে। বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালও দলটির সভাপতি শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে এই অপরাধে।
তবে ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে আওয়ামী লীগের রিকনসিলিয়েশন নিয়ে আলোচনা রয়েছে রাজনীতিতে। যদি কার্যক্রম নিষিদ্ধ দলটি অপরাধের দায় স্বীকার করেনি, অনুশোচনাও জানায়নি। অন্তর্বর্তী সরকার রিকনসিলিয়েশেন প্রক্রিয়া শুরুর উদ্যোগ নিলেও তা থেমে যায়। বিএনপি ৩১ দফায় রিকনসিলিয়েশেনের প্রতিশ্রুতি রয়েছে। ক্ষমতাসীন দলটির মতো জামায়াতে ইসলামীও নির্বাচনের ইশতেহারে ‘ট্রুথ এন্ড হিলিং কমিশন’ গঠনের প্রতিশ্রুতি দেয়।
তবে ডেপুটি স্পিকার বলেছেন, আগে ফ্যাসিস্টদের বিচার। এরপর রিকনসিলিয়েশেন হবে। সহিংসতা সৃষ্টিকারীদের আইনি পরিণতি থেকে আড়াল করার প্রচেষ্টার কারণেই বিশ্বব্যাপী রিকনসিলিয়েশেনে প্রক্রিয়া ব্যর্থ হচ্ছে। বিচারিক এবং রাজনৈতিক কাঠামোকে নতুন করে গড়ে তুলতে হবে। যাতে নিশ্চিত করা যায়, এসব কাঠামো শাসকগোষ্ঠীর পরিবর্তে সাধারণ নাগরিকের সেবায় নিয়োজিত থাকবে।
বিচার শুধু শাস্তির জন্য দৃষ্টান্ত স্থাপনে প্রয়োজন বলে মনে করেন কায়সার কামাল। তিনি বলেন, ফ্যাসিস্টদের বিচার শুধু শাস্তি দেওয়ার জন্য নয়, বরং ভবিষ্যতে যেন কেউ আবার বাংলাদেশে এমন কর্তৃত্ববাদী ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার সাহস না পায়, সে জন্য একটি দৃষ্টান্ত তৈরি করা প্রয়োজন। একই সাথে বিদেশে অবস্থানরত অপরাধীদেরও বিচারের আওতায় আনা প্রয়োজন।
যারা আওয়ামী লীগের পক্ষে সাফাই গাইছে তাদের উদ্দেশ্য নিয়েও প্রশ্ন তোলেন ডেপুটি স্পিকার। তিনি বলেছেন, দেশে ও বিদেশে যারা রিকনসিলিয়েশনের অজুহাত দিয়ে ক্ষমতাচ্যুত সরকারের পক্ষে সাফাই গাইছেন, তাদের ধারণাকে প্রশ্রয় দিলে তা দেশকে ভয়াবহ ও অকল্পনীয় সংঘাতের দিকে ঠেলে দিতে পারে।
আওয়ামী লীগের কর্মকাণ্ডই তাদেরকে অযোগ্য করেছে বলে মন্তব্য করেন কায়সার কামাল। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের অপরাধমূলক, অমানবিক ও নিষ্ঠুর কর্মকাণ্ড তাদেরকে রাজনীতিতে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে স্থায়ীভাবে অযোগ্য করে দিয়েছে। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ব্যবহার করে তারা জনগণের বিরুদ্ধে যে সহিংসতা চালিয়েছে, এর বিচার নিশ্চিত করতেই হবে। ৫ আগস্টের ক্ষমতাচ্যুত শাসনব্যবস্থার সাথে সমঝোতার অবকাশ নেই।
কায়সার কামাল বলেন, বিশ্বজুড়ে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের অবক্ষয় রোধের লড়াইয়ে এমন শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজন, যা স্বৈরাচারীদের উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে রুখে দিতে সক্ষম। বাংলাদেশে এইসব প্রতিষ্ঠানের ভিত্তি গড়া হচ্ছে।
প্রশ্নের জবাবে ডেপুটি স্পিকার বলেন, বাংলাদেশে এক সময় বিচারহীনতার রাজনীতি ছিল। জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে আসা বর্তমান সরকার, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করে কাজ করে যাচ্ছে। সরকার অবশ্যই জুলাই-আগস্টের হত্যাকারীদের বিচারের আওতায় আনবে।
রিকনসিলিয়েশনের জন্য তিনটি উপাদানের প্রয়োজন রয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন নুরুল কবির। তিনি বলেন, যৌথ তদন্ত, ভুক্তভোগীদের ক্ষতিপূরণ এবং অপরাধীদের অপরাধ স্বীকার ও শাস্তি দিতে হবে। এই তিনটি বিষয় সম্পন্ন হওয়ার পরেই প্রকৃত রিকনসিলিয়েশন হবে।
উপনিবেশ বিরোধী সংগ্রামের উদাহরণ দিয়ে নুরুল কবীর বলেন, এর অনেক সমাজ রাজনৈতিক স্বাধীনতা অর্জন করেছিল। দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত নিরসনের কাঠামো তৈরি করে উত্তর আয়ারল্যান্ড, কলম্বিয়া এবং দক্ষিণ আফ্রিকা রিকনসিলিয়েশনে সক্ষম হয়েছে।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের উত্তরাধিকার, পার্বত্য চট্টগ্রামের সংঘাত এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানের রিকনসিলিয়েশন এখনও হয়নি বলে মন্তব্য করেন নুরুল কবীর। তিনি বলেন, একাত্তরে যারা পাকিস্তানি বাহিনীকে সহযোগিতা করেছিল তারা এখনও তাদের দোষ মেনে নেয়নি। তাদের অনেকেই এখন জামায়াত ইসলামীর নামে রয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রামে রিকনসিলিয়েশনের জন্য বাঙালি এবং অবাঙালি উভয় সম্প্রদায়কেই তাদের ভুল স্বীকার করতে হবে।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের রিকনসিলিয়েশনে জন্য আওয়ামী লীগের অনুশোচনা প্রয়োজন বলে মনে করেন নুরুল কবীর। তিনি বলেন, ক্ষোভকারীদের হত্যায় যারা দায়ী, তারা এখনও অনুশোচনা দেখতে পাননি। বরং রাজপথে নেমে আসা লাখ লাখ আন্দোলনকারীকে দোষারোপ করছে। অপরাধের জন্য দায়ী ব্যক্তিরা যতদিন না তাদের কর্মকাণ্ড স্বীকার করছে এবং জবাবদিহিতা মেনে নিচ্ছে, ততদিন সমঝোতা শুরু হতে পারে না।
অধ্যাপক কারোরি সিং বলেন, সরকারি পদদারীরা যাতে স্বেচ্ছাচারী হতে না পারে, সেজন্য আইনে পর্যাপ্ত সুরক্ষাকবচ প্রয়োজন।
বর্ণবাদের অবসানের পর ১৯৯৪ সাল থেকে রিকনসিলিয়েশন করে দক্ষিণ আফ্রিকা। কৃষ্ণাঙ্গদের ওপর দুই শতাব্দি ধরে নিপীড়ন চালানো শ্বেতাঙ্গদের বিচার এবং অনুশোচনার মাধ্যমে ক্ষমা করা হয়। যেসব কৃষ্ণাঙ্গ শ্বেতাঙ্গদের ওপর প্রতিশোধমূলক হামলা করেছিল তাদেরকেও একই পরিণতি ভোগ করতে হয়। দক্ষিণ আফ্রিকার মাদালিতসো জিলিলো ফিরি বলেন, ন্যায়বিচার ও রিকনসিলিয়েশন আলোচনার জন্য কাঠামোগত বৈষম্যগুলোও দূর করা দরকার। যার মধ্যে বর্ণ, আঞ্চলিক, জাতিগত এবং লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্য রয়েছে।
কম্বোডিয়ার রিকনসিলিয়েশনের অভিজ্ঞতা তুলে নিকি সিঙ্গার বলেন, আনুষ্ঠানিক সংঘাত শেষ হওয়ার পরও কয়েক দশক ধরে সমঝোতার প্রক্রিয়া চলতে পারে। তবে কেবল দোষারোপ করার ওপর অতিরিক্ত মনোযোগ দিলে সমাজের পক্ষে সামনে এগিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
- বিষয় :
- সংলাপ