শর্ত পূরণ না হলে মিয়ানমারে ফিরতে চান না ৮৭% রোহিঙ্গা: গবেষণা
ছবি: ফাইল
বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবেদক
প্রকাশ: ০৮ অক্টোবর ২০২৬ | ০২:৫৬ | আপডেট: ০৮ অক্টোবর ২০২৬ | ০২:৫৯
নাগরিকত্ব ও স্বীকৃতিসহ পাঁচটি মৌলিক শর্ত পূরণ না হলে বাংলাদেশ থেকে মিয়ানমারে ফিরতে অনিচ্ছুক ৮৭ শতাংশ রোহিঙ্গা। বুধবার (৭ অক্টোবর) ঢাবির নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবন মিলনায়তনে ‘অনিশ্চিত ঘরে ফেরা: উখিয়ার ক্যাম্প থেকে নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন নিয়ে রোহিঙ্গাদের ভাবনা’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদনে এ তথ্য প্রকাশ করা হয়।
প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অপরাধবিজ্ঞান গবেষণা ফোরামের (ডিইউসিআরএফ) সভাপতি সাফায়েত হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক আদৃতা আরিফ। প্রতিবেদন প্রকাশ উপলক্ষে দিনব্যাপী প্যানেল আলোচনারও আয়োজন করা হয়। গবেষণা
রোহিঙ্গাদের পাঁচ শর্ত হলো- নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক তদারকি, জমি-ঘর ফিরিয়ে দেওয়া ও পুনর্বাসন, অবাধ চলাচলের অধিকার এবং স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও জীবিকার মতো মৌলিক সেবা নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে বিচার ও জবাবদিহির নিশ্চয়তাও চান তারা।
গবেষণায় বলা হয়েছে, রোহিঙ্গাদের কাছে সবচেয়ে বিশ্বাসযোগ্য প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ সরকার। জরিপে অংশ নেওয়া প্রায় ৫৬ শতাংশ রোহিঙ্গা বাংলাদেশ সরকারের ওপর আস্থা প্রকাশ করেছেন। এরপর জাতিসংঘের ওপর আস্থা রয়েছে প্রায় ২১ শতাংশের। বিপরীতে মাত্র ৪ শতাংশ রোহিঙ্গা মিয়ানমার সরকারকে সবচেয়ে বিশ্বাসযোগ্য প্রতিষ্ঠান হিসেবে মনে করেন। আর প্রায় ১৬ শতাংশ জানিয়েছেন, তারা কোনো প্রতিষ্ঠানকেই বিশ্বাস করেন না। 
গবেষণা বলছে, প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে রোহিঙ্গাদের সিদ্ধান্ত শুধু মিয়ানমারের পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করছে না; বাংলাদেশের শিবিরে তাদের বর্তমান জীবনও সেই সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করছে। একদিকে তাদের বিতাড়িত করা দেশ মিয়ানমার, অন্যদিকে বাংলাদেশেও তাদের স্থায়ীভাবে একীভূত হওয়ার সুযোগ নেই। এর মধ্যে জরুরি মানবিক সহায়তাও কমছে, অথচ দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের পথ এখনও অনিশ্চিত।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জয়েন্ট রেসপন্স প্ল্যানের অর্থায়ন কমে ৭১০ মিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় ২৬ শতাংশ কম। একই সময়ে মাথাপিছু মাসিক রেশন ১২ ডলার থেকে কমে ৭ ডলারে নেমেছে। রেশন কমে যাওয়ায় কিছু পুরুষ শিবিরের বাইরে অনানুষ্ঠানিক কাজে যুক্ত হচ্ছেন। এতে অপহরণ ও গ্রেপ্তারের ঝুঁকিও বাড়ছে বলে গবেষণায় উঠে এসেছে।
শিবিরে কর্মসংস্থানের সুযোগ না থাকায় রোহিঙ্গাদের মধ্যে জুয়া, পারিবারিক সহিংসতা, ঋণগ্রস্ততা ও মানব পাচারের মতো সমস্যাও বাড়ছে বলে সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন অংশগ্রহণকারীরা।
গবেষণায় শিবিরের আবাসন ও সেবা পরিস্থিতির চিত্রও উঠে এসেছে। ১০ ফুট বাই ১৫ ফুটের একটি ঘরে ছয় থেকে ১০ জন পর্যন্ত বসবাসের কথা জানিয়েছেন সাক্ষাৎকারদাতারা। শিক্ষাব্যবস্থা সনদপ্রাপ্ত নয়, স্বাস্থ্যসেবা সীমিত এবং চলাচল নিয়ন্ত্রিত। একই সঙ্গে আইনগতভাবে চাকরি করার সুযোগও নেই তাদের।
সাক্ষাৎকারে অংশ নেওয়া কয়েকজন রোহিঙ্গা অভিযোগ করেছেন, বিকেলের পর শিবিরগুলো পাঁচ থেকে ছয়টি সশস্ত্র গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। শিশু ও প্রাপ্তবয়স্কদের মুক্তিপণের জন্য অপহরণের ঘটনাও ঘটে। এ ক্ষেত্রে দুই লাখ থেকে ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত মুক্তিপণ দাবি করা হয় বলেও জানান তারা।
প্যানেল আলোচনায় অংশ নেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মুহাম্মদ সাজ্জাদ হোসেন সিদ্দিকী এবং মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক (নিরোধ শিক্ষা) শামীম আহম্মেদ। আলোচনা সঞ্চালনা করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক শাহারিয়া আফরিন।
অনুষ্ঠানে রোহিঙ্গা প্রতিনিধি মো. শফিক বলেন, তাদের প্রধান সমস্যা নাগরিকত্ব। নাগরিকত্ব, ভূমির অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে প্রত্যাবাসন করা হলে তা টেকসই হবে না। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে এসব বিষয়ে নজর দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, রোহিঙ্গারা প্রতিশোধ নয়, ন্যায়বিচার চান।