মানব উন্নয়ন সূচকে এক ধাপ এগিয়েছে বাংলাদেশ
বিশেষ প্রতিনিধি
প্রকাশ: ১১ ডিসেম্বর ২০১৯ | ১০:৪৯ | আপডেট: ১১ ডিসেম্বর ২০১৯ | ১৩:২৫
বৈশ্বিক মানব উন্নয়ন সূচকে আগের বছরের চেয়ে এক ধাপ এগিয়েছে বাংলাদেশ। জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) মানব উন্নয়ন প্রতিবেদন ২০১৯ অনুযায়ী ১৮৯ দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৩৫তম, যা গত বছর ছিল ১৩৬তম।
বুধবার রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের এনইসি সম্মেলন কক্ষে এক অনুষ্ঠানে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়। পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান এতে প্রধান অতিথি ছিলেন।
অনুষ্ঠানে খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ ও বিশেষজ্ঞরা বলেন, আর্থসামাজিক খাতে বাংলাদেশের অগ্রগতি হলেও আয়বৈষম্য বেড়েছে প্রকটভাবে, যা উন্নয়নের ক্ষেত্রে বাধা। বৈষম্য বৃদ্ধির কারণ ব্যাখ্যা করে তারা বলেন, অর্থনীতির সুযোগ-সুবিধা মুষ্টিমেয় শ্রেণির নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। সর্বক্ষেত্রে ভিআইপি সংস্কৃতির আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। প্রভাবশালীরা নীতিনির্ধারণে প্রভাব বিস্তার করছেন। এসব কারণে বিত্তশালীদের সম্পদ আরও বাড়ছে। পক্ষান্তরে, গরিবের আয় কমে যাচ্ছে। মানব সম্পদ উন্নয়নে শিক্ষার গুণগতমান নিশ্চিত ও স্বাস্থ্যসেবার মান বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন তারা।
মানব উন্নয়ন সূচকে দক্ষিণ এশিয়ার তিনটি দেশ আফগানিস্তান, নেপাল ও পাকিস্তানের চেয়ে বাংলাদেশ এগিয়ে থাকলেও শ্রীলংকা, ভারত ও মালদ্বীপের চেয়ে পিছিয়ে আছে।
বৈশ্বিক মানব উন্নয়ন সূচকে এবারও নরওয়ে এক নম্বর অবস্থানে। দ্বিতীয় অবস্থানে সুইজারল্যান্ড। আর তলানিতে রয়েছে মধ্য আফ্রিকার নাইজার ও বুরুন্ডি।
প্রতিটি দেশের স্বাস্থ্য, শিক্ষা, আয় ও সম্পদের উৎস বৈষম্য, লিঙ্গ সমতা, দারিদ্র্য, কর্মসংস্থান, নিরাপত্তা বাণিজ্য ও আর্থিক প্রবাহ যোগাযোগ, পরিবেশের ভারসাম্য ও জনমিতির তথ্য বিশ্লেষণ করে এই সূচক তৈরি করে ইউএনডিপি। এসব মানদণ্ড মিলিয়ে এবার বাংলাদেশের মানব উন্নয়ন স্কোর দাঁড়িয়েছে শূন্য দশমিক ৬১৪, যা গতবার ছিল শূন্য দশমিক ৬০৮। ১৯৯০ সাল থেকে সারাবিশ্বে এই প্রতিবেদন প্রকাশ করে আসছে ইউএনডিপি।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের সদস্য (সিনিয়র সচিব) ড. শামসুল আলম। বক্তব্য দেন পিকেএসএফের চেয়ারম্যান ড. কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ, গবেষণা সংস্থা পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. হোসেন জিল্লুর রহমান, সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন, যুক্তরাজ্যভিত্তিক উন্নয়ন সংস্থা ডিএফআইডির সেলিমা আহমেদ প্রমুখ। উপস্থিত ছিলেন ইউএনডিপির আবাসিক প্রতিনিধি সুদীপ্ত মুখার্জী ও পরিকল্পনা সচিব নুরুল আমিন।
পরিকল্পনামন্ত্রী বলেন, আমাদের দেশে ভিআইপি কালচার বড় একটি সমস্যা। তবে এটাকে বাদ দেওয়া যাবে না। ধীরে ধীরে এই সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে আসতে হবে। তা না হলে বাধাগ্রস্ত হবে উন্নয়ন।
বৈষম্য বাড়ছে– এ কথা স্বীকার করে তিনি বলেন, এটা কমাতে নানামুখী কাজ চলছে। ক্ষুধা নিবারণে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। কমিউনিটি ক্লিনিকে দরিদ্র জনগণের সেবা নিশ্চিত করা হয়েছে। গ্রামের মানুষ সুপেয় পানি পান করছে। বাজেটে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যে বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে। এসব কারণে মানুষের প্রত্যাশিত গড় আয়ু বেড়েছে।
ড. কাজী খলীকুজ্জমান বলেন, বৈষম্য ব্যাপক আকার ধারণ করেছে। জলবায়ুজনিত পরিবর্তন এর ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলেছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ মানুষকে আরও গরিব করছে। চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হলে দক্ষ মানব সম্পদের দিকে নজর দিতে হবে। বাড়াতে হবে সৃজনশীলতা।
ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, অর্থনীতির সুযোগ-সুবিধাগুলো কিছু লোকের হাতে বন্দি। নীতিনির্ধারণের বিষয়টিও কিছু গোষ্ঠীর হাতে কুক্ষিগত। ব্যাংক খাতে সংস্কারের কথা বলা হলেও ভিআইপিদের বিরোধিতার কারণে হচ্ছে না। ভিআইপি সংস্কৃতি থেকে বের হতে না পারলে কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন হবে না। পরিবহন, বাসা ভাড়াসহ খাদ্যবহির্ভূত খাতে ব্যয় অনেক বেড়ে গেছে। ফলে বৈষম্য বাড়ছে।
ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, শিক্ষার প্রসার ঘটলেও মান নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। দক্ষ জনশক্তি, অবকাঠামো এবং পরিবেশে বিনিয়োগ আরও বাড়াতে হবে। দক্ষমানব সম্পদ উন্নয়নে মানসম্মত শিক্ষা খুবই জরুরি। বাংলাদেশে জিডিপির তুলনায় রাজস্ব আহরণ অনেক কম। আদায় বাড়াতে রাজস্ব প্রশাসনে ব্যাপক সংস্কারের কথা বলেন তিনি।
সভাপতির বক্তব্যে ড. শামসুল আলম বলেন, 'বৈষম্য যে বাড়ছে এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই। তবে এটাও ঠিক, জাতীয় আয় ক্রমে বাড়ছে। আমরা ক্রমাগত এগিয়ে যাচ্ছি।'
তিনি বলেন, পরিসংখ্যানে দেখা যায়, জনসংখ্যার নিচের দিকের ৫ শতাংশ মানুষ প্রতিনিয়ত সম্পদ হারাচ্ছে। আর ওপরের দিকের ৫ শতাংশ মানুষের হাতে সম্পদের পরিমাণ ক্রমাগত বাড়ছে। এটা অবশ্যই উদ্বেগের বিষয়। এ জন্য বৈষম্য কমিয়ে আনতে হবে। তা না হলে টেকসই উন্নয়ন সম্ভব হবে না। প্রবৃদ্ধির সুফল সবাই পাবে না।
ড. শামসুল আলম আরও বলেন, কর্মক্ষেত্রে নারীদের অংশগ্রহণ এখনও অনেক কম। এখনও ১৬ লাখ শিশু স্কুলের বাইরে রয়েছে। বস্তির সংখ্যা বাড়ছে। এসব বিষয়কে গুরুত্ব দিয়ে অষ্টম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা দলিলের খসড়া চূড়ান্ত করা হচ্ছে।
- বিষয় :
- মানব উন্নয়ন সূচক
