আইসিসিবির সম্মেলনে বক্তারা
টেকসই উন্নয়নে আর্থিক সেবা সহজ হতে হবে
এসডিজি অর্জনে অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থায়ন নিয়ে প্রথম অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান- সমকাল
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ১১ ডিসেম্বর ২০১৯ | ১১:০১
টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য (এসডিজি) অর্জনে আর্থিক সেবা সবার জন্য সহজ হতে হবে। দরিদ্র জনগোষ্ঠী এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) উদ্যোক্তাদের কম সুদে ঋণের ব্যবস্থা করতে হবে। অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থায়ন নিশ্চিত করতে পারলে তা এসডিজি অর্জনে কার্যকর ভূমিকা পালন করবে।
বুধবার রাজধানীর ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলে অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই উন্নয়নের ওপর এশিয়া-প্যাসিফিক সম্মেলনের দ্বিতীয় দিনের প্রথম দুটি অধিবেশনে বক্তারা এমন মতামত দেন।
ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্স বাংলাদেশ (আইসিসিবি), জাতিসংঘের এশীয় ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের অর্থনৈতিক ও সামাজিক কমিশন (এসকাপ) এবং এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের ট্রেড ফাইন্যান্স প্রোগ্রাম (টিএফপি) এ সম্মেলনের আয়োজক। এতে পৃষ্ঠপোষক হিসেবে রয়েছে বাংলাদেশের অর্থ মন্ত্রণালয়।
এসডিজি অর্জনে অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থায়ন নিয়ে প্রথম অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান। তিনি বলেন, এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের টেকসই উন্নয়নে আঞ্চলিক ও বহুমাত্রিক সহযোগিতা জোরদার করা প্রয়োজন। বাংলাদেশ সরকার আঞ্চলিক যোগাযোগ বাড়াতে প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন করছে। আর্থিক সেবা আগের চেয়ে অনেক সহজ করা হয়েছে। এরই মধ্যে নানা সাফল্য এসেছে। এরপরও অনেক চ্যালেঞ্জ আছে, বিশেষ করে ঋণের সুদহার কমানো এবং তা স্থিতিশীল রাখা।
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, টেকসই উন্নয়নের জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থায়নের নীতি বাস্তবায়নে পদক্ষেপ নিতে হবে। এ ক্ষেত্রে জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন, বৈষম্য ও দারিদ্র্য দূরীকরণ এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদ দিয়ে সবার জন্য সমান সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। সহজ ঋণ ও সঞ্চয় সুবিধা ব্যাংকের মাধ্যমে নিশ্চিত করতে হবে। গরিব মানুষ ও এসএমই উদ্যোক্তাদের জন্য কম সুদে ঋণের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, সম্পদের সুষম বণ্টন ও আয়বৈষম্য দূর করা বড় চ্যালেঞ্জ। এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দারিদ্র্য দূর করা এবং সবার জন্য শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে অর্থায়ন বাড়াতে হবে।
কম্বোডিয়ার সহকারী বাণিজ্যমন্ত্রী বান চ্যানথি বলেন, এসডিজি অর্জনে সব খাতের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। তবে কর্মসংস্থানের জন্য অর্থায়নে জোর দিতে হবে।
এডিবির কান্ট্রি ডিরেক্টর মনমোহন প্রকাশ বলেন, সবার জন্য সুবিধা মিলবে– এমনভাবে অর্থায়ন নিশ্চিত করা প্রয়োজন। সহজ প্রক্রিয়ায় রাজস্ব আদায় বাড়াতে হবে। বৈদেশিক তহবিল দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়নে ব্যয় করতে হবে। বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। সক্ষমতা বাড়ানো নতুন প্রযুক্তি সংযোজনের মাধ্যমে অর্থায়ন সহজ করতে হবে। এ ছাড়া বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের মাধ্যমে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।
ইউএন-এসকাপের আন্ডার সেক্রেটারি জেনারেল আরমিদা সালসিয়াহ আলিসজাবানা এসডিজি অর্জনে তিনটি কৌশলের কথা বলেন। প্রথমত, নিজস্ব অর্থায়নে জোর দিতে হবে; দ্বিতীয়ত, বৈদেশিক তহবিল এবং তৃতীয়ত, সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। নারীদের প্রাধান্য দিয়ে ক্ষুদ্র ও মাঝারি খাতে জোর দিতে হবে।
নেপালের জাতীয় পরিকল্পনা কমিশনের ভাইস চেয়ারম্যান ড. পুষ্প রাজ কাডেল বলেন, অবৈধ অর্থ যাতে পাচার না হয়, সে ব্যাপারে নজর দেওয়া উচিত। একই সঙ্গে কর ফাঁকি বন্ধ করতে হবে। তিনি স্থানীয় আয় বাড়াতে করের হার না বাড়িয়ে করের আওতা বাড়ানোর পরামর্শ দেন। ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক মোহাম্মদ আলী তসলিম বলেন, বিশ্বব্যাপী অনেক অর্জন রয়েছে। এত অর্জনের পরও দারিদ্র্য আছে। এখনও ১০ ভাগের এক ভাগ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করছে। দারিদ্র্য বিমোচনে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানো প্রয়োজন।
একই বিষয়ে দ্বিতীয় অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা সৈয়দ মঞ্জুর এলাহী। তিনি বলেন, আর্থিক ও সামাজিক উন্নয়নে অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি খুব গুরুত্বপূর্ণ। এ জন্য আর্থিক খাতে স্থিতিশীলতা দরকার। ব্যাংকিং খাতে সংস্কার দরকার। স্থানীয় পর্যায়ে বাজার সুবিধা নিশ্চিত করার পাশাপাশি উদ্ভাবনী পণ্য তৈরিতে এসএমইদের সহযোগিতা বাড়ানো প্রয়োজন।
কম্বোডিয়ার সহকারী শিল্পমন্ত্রী লিয়াম কিমলেং তার দেশের বিভিন্ন পদক্ষেপ তুলে ধরেন। একই সঙ্গে তিনি তরুণ উদ্যোক্তা তহবিল গঠন ও এসএমই উদ্যোক্তা উন্নয়নে জোর দেওয়ার পরামর্শ দেন।
মালদ্বীপের জাতীয় পরিকল্পনা ও অবকাঠামো উপমন্ত্রী রিয়াজ মনসুর বলেন, তাদের সরকার অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নে ২০ বছরের উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। একই সঙ্গে সুনির্দিষ্ট তহবিল গঠন করা হয়েছে। এতে পিপিপি, ইসলামিক অর্থায়ন ও শেয়ারবাজার থেকে অর্থের সংস্থান করেছে।
শ্রীলংকার প্রধানমন্ত্রীর জ্যেষ্ঠ অর্থনৈতিক উপদেষ্টা অজিত নিভাড কাবরাল বলেন, শ্রীলংকা সবার জন্য বিদ্যুৎ নিশ্চিত করতে ১০ বছরের পরিকল্পনা নিয়েছে। এরই মধ্যে শিক্ষা ও যোগাযোগ উন্নয়নে বেশ অগ্রগতি হয়েছে। দক্ষতা উন্নয়নে বেশ গুরুত্ব দিয়েছে তার দেশের সরকার।
তিনি বলেন, দেশে বিনিয়োগ বাড়ানোর জন্য ঋণের সুদহার ও বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার স্থিতিশীল থাকা জরুরি।
ইনস্টিটিউট ফর ইনক্লুসিভ ফাইন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের প্রধান নির্বাহী মুস্তফা কে মুজেরি বলেন, টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যে স্থানীয় সম্পদের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করতে হবে। এটি নিশ্চিত করা বড় চ্যালেঞ্জ। এ ছাড়া দারিদ্র্য দূরীকরণে জোর দেওয়া প্রয়োজন।
