শাবির আহত শিক্ষার্থী
'শুধু এক হাতেই বহন করছি শটগানের ৩৪টা মেটাল'
পুলিশের ছিটাগুলির আঘাতে আহত শাবি শিক্ষার্থী সজল কুন্ডু। ছবি: সমকাল
শাবি প্রতিনিধি
প্রকাশ: ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২২ | ০৫:৪৭ | আপডেট: ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২২ | ০৫:৪৭
তিন দফা দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা উপাচার্য অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন আহমেদকে অবরুদ্ধ করলে পুলিশ শিক্ষার্থীদের উপর লাঠিচার্জ, রাবার বুলেট এবং সাউন্ড গ্রেনেড ছুড়ে ছত্রভঙ্গ করে উপাচার্যকে উদ্ধার করে। পুলিশি এই হামলায় ৪০ জনের অধিক শিক্ষার্থী লাঠিচার্জে এবং স্প্রিন্টারের আঘাতে আহত হয়েছিল। সে সময় জুনিয়র শিক্ষার্থীদের আহত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখে তাদের উদ্ধার করতে গিয়ে পুলিশের ছিটাগুলির আঘাতে আহত হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সজল কুন্ডু। সজল এখন ঢাকায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেডিকেল হাসপাতালে প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের তত্বাবধানে চিকিৎসাধীন রয়েছে।
জানা যায়, সজল কুন্ডু শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকোত্তরের শিক্ষার্থী। গরীব পরিবার পক্ষে পড়াশোনা খরচ বহন করা সম্ভব ছিলো না বলে বিশ্ববিদ্যালয়ে জীবনযাপনের জন্য কখনো টিউশনি, কখনো হলে হলে মিষ্টি ও চা বিক্রি করেছে। শেষের দিকে স্বাবলম্বী হওয়ার আশায় মেসে মেসে খাবার বিক্রি করেছে সে। সর্বশেষ গত ২ জানুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. এমএ ওয়াজেদ মিয়া আইআইসিটি ভবনের ক্যাফেটেরিয়া পরিচালনার দায়িত্ব নিয়েছিল। এখন তার স্বাবলম্বী হওয়ার সেই স্বপ্ন যেন হাসপাতালে বেডে শুয়ে আছে।
সজলের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করলে তিনি সমকালকে বলেন, 'আমার শারীরিক অবস্থা তেমন ভালো নেই। ডাক্তাররা জানিয়েছেন আগামী বুধবার আমার ডান হাত সার্জারী হবে। শরীরের অন্যান্য জায়গার থাকা স্প্রিন্টারের কিছুটা বের করা সম্ভব হয়তো, কিন্তু কিছু স্প্রিন্টার বের করা যাবে না। এগুলো নিয়েই আমাকে বাঁচতে হবে।' ওখানে তার সঙ্গে কে আছেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, 'বন্ধুরা আছে। তারাই পাশে আছে সবসময়। পরিবারের কাউকে বিস্তারিত সেভাবে জানানো হয়নি।'
এদিকে শুক্রবার সে তার ফেসবুক ওয়ালে একটি স্ট্যাটাস দেন। সেখানে বলা হয়, "শরীরের এমন কোন অংশ নেই যেখানে স্প্রিন্টারের আঘাত নেই। নতুন করে স্কালে (মাথার খুলি) স্প্রিন্টারের উপস্থিতি ধরা পরেছে। বিষয়টা কতটুকু স্পর্শকাতর সেটা এখনও বুঝে উঠতে পারছি না। ডাক্তার এবং শুভাকাঙ্ক্ষীরা সবসময় সাহস যোগাচ্ছে। কিন্তু শরীরটা তো আমার বর্তমান এবং ভবিষ্যত। এটা আমি ব্যতিত অন্য কারও উপলব্ধি করা কঠিন। বৃহস্পতিবার পর্যন্ত ১৭ দিন হয় ঠিক মত দাঁড়াতে এবং হাঁটতে পারি না। শোয়া অবস্থায় থেকে উঠতে গেলে পেটে যে চাপ লাগে সেটা লিখে ঠিক কি করে প্রকাশ করা যায় তা আমার জানা নেই।

'তবে এই যন্ত্রণা গুলো আমার ডান হাতের কাছে একদমই পাত্তা পায় না। শুধু এক হাতেই বহন করছি শটগানের ৩৪টা মেটাল। মেটাল গুলো বেশ সরেশ! হাত টান করে কিছু করতে গেলে তারা আমাকে মনে করায় না আমি হাত সোজা করতে পারবো না। হাতে যে পাঁচটা আঙুল আছে সেটা গত ১৬ জানুয়ারির পর থেকে আমি আর অনুধাবন করতে পারি না। আমার ডান হাতের অনুভূতি বলতে, কেউ একজন সুঁচ দিয়ে কন্টিনিউাস (সর্বদা) আমার হাতটাকে ক্ষতবিক্ষত করতে ব্যস্ত।'
'ডাক্তার বলেছে সবগুলো মেটাল বের করা যাবে না। অর্থাৎ বাকি জীবন এগুলো বহন করেই বাঁচতে হবে। এবং সময়ে অসময়ে এই যন্ত্রণা বয়ে বেড়াতে হবে আমাকে।'
'শুনেছি শাবিপ্রবি প্রশাসন নাকি মামলাও করেছে, মামলা উঠিয়ে নেওয়ার কথা থাকলেও এখনও নেয়নি। হয়ত কারণে-অকারণে সেগুলো ঢাল হিসেবে ব্যবহৃত হবে। সিনিয়ররা জুনিয়রদের সহযোগিতা করায় উপহারস্বরুপ হয়রানিমূলক মামলা খেয়েছে। এই হয়রানি কতদিন চলবে তা আমার ক্ষুদ্র মস্তিষ্ক আঁচ করতে পারে না।'
'ইয়াসির ভাইয়ের মারফত খবর পাইছিলাম, অনশনরত শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন শারীরিক সমস্যায় ভুগছে। ঈশ্বর তদের দ্রুত সুস্থ করে তুলুক।'
'আমি সাধারণ। আমার বলার অনেক কিছু থাকলেও করার কিছু নাই। শুধু বলব আমার সাথে, আমাদের সাথে অন্যায় হয়েছে...'
উল্লেখ্য, ১৩ জানুয়ারি রাতে বেগম সিরাজুন্নেছা চৌধুরী ছাত্রী হলের সমস্যা নিয়ে ছাত্রীরা প্রভোস্ট জাফরিন আহমেদ লিজার সঙ্গে কথা বলে এবং সেসময় প্রভোস্ট শিক্ষার্থীদের সঙ্গে অসদাচরণ করে এমন অভিযোগ এনে শিক্ষার্থীরা তিনদফা দাবিতে আন্দোলন করে। এরপর গত ১৬ জানুয়ারি উপাচার্য অবরুদ্ধ হলে পুলিশ শিক্ষার্থীদের উপর লাঠিচার্জ, রাবার বুলেট এবং সাউন্ড গ্রেনেড দিয়ে হামলার পর থেকে শিক্ষার্থীরা উপাচার্যের পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলন করছে।
- বিষয় :
- শাবি
- আহত শিক্ষার্থী
- উপাচার্য
- পদত্যগ দাবি
- শটগান
- মেটাল
