যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়
এক দিনের রোভার-অভিযান
আমরা রোভার: শিখি, গড়ি, সেবা করি
জিন্নাতুন নেসা শান্তা
প্রকাশ: ২৬ অক্টোবর ২০২৬ | ১২:৫১
সোমবার। দিনটি আর দশটা দিনের মতো ক্লাস কিংবা ল্যাবের ছিল না; বরং ছিল নতুন কিছু শেখা, নতুন অভিজ্ঞতা অর্জন আর রোভারিংয়ের আনন্দে নিজেকে রাঙিয়ে নেওয়ার দিন। উপলক্ষ– যশোর পৌর পার্কে আয়োজিত ‘ডে ক্যাম্প রোভার–২০২৬, যশোর জেলা রোভার’।
যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (যবিপ্রবি) রোভার স্কাউট ও গার্ল-ইন-রোভারের দুটি দল এবং ৪২টি কলেজের মোট ৩৩১ জন রোভারের অংশগ্রহণে বসেছিল প্রাণবন্ত এই মিলনমেলা।
ভোর ৬টায় আমি ও তাজমীম বেরিয়ে পড়ি রোভার ইউনিফর্ম সংগ্রহ করতে। শ্রাবণী আপু ও বিউটি দির কাছ থেকে নিজেদের পাশাপাশি দলের অন্য সদস্যদের ইউনিফর্ম সংগ্রহ করে সকাল ৭টার মধ্যে সবার কাছে পৌঁছে দিই। দ্রুত তৈরি হয়ে সকাল ৭টা ২০ মিনিটের ক্যাম্পাসের বাস ধরতে ছুটলাম। ক্যাম্পাসে পৌঁছে দেখি, সজীব ভাই আগেই অপেক্ষা করছেন। একে একে যোগ দিলেন বিউটি দি, অন্বেষা আপু, প্রোজ্জ্বল দাসহ অন্য সদস্যরা। গল্প, হাসি আর আড্ডায় শুরু হলো আমাদের যাত্রা। কোটচাঁদপুর মোড়ে নেমে সেখান থেকে হেঁটে পৌঁছালাম যশোর পৌর পার্কে। পার্কে পা রাখতেই চোখে পড়ল এক উৎসবমুখর ব্যস্ততা। কোথাও তাবু সাজানোর তোড়জোড়, আবার কোথাও রিপোর্টিং ও নিবন্ধনের কাজ। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের রোভারদের উপস্থিতিতে পুরো প্রাঙ্গণ যেন প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছিল। আমাদের রোভার স্কাউট লিডার (আরএসএল) স্যার পৌঁছানোর পর সবাই মিলে দলীয় ছবি তুলে ১০ জন সদস্য নিবন্ধন সম্পন্ন করলাম। প্রার্থনা সংগীতের মধ্য দিয়ে সূচনা হলো উদ্বোধন অনুষ্ঠানের। এরপর ছিল ডেঙ্গু প্রতিরোধে সচেতনতামূলক বক্তব্য এবং সকালের নাশতা পর্ব। নাশতা শেষ হতেই শুরু হলো দিনের সবচেয়ে আকর্ষণীয় অংশ– দশটি চ্যালেঞ্জ অতিক্রম করে দশটি ব্যাজ অর্জনের অভিযান!
তাবু জলসা: শুরুতেই গেলাম তাবু জলসায়। বিউটি দি ও সজীব ভাইয়ের নেতৃত্বে সবাই মিলে গাইলাম ‘তীর হারা এই ঢেউয়ের সাগর’।
গেরো ও ল্যাশিং: মাহফুজ ভাইয়ের কাছ থেকে শিখলাম নানা ধরনের গেরো বাঁধার কৌশল। সজীব ভাই ডাক্তারি গেরো এবং বিউটি দি জেলে গেরো দিয়ে দক্ষতার পরিচয় দিলেন। স্কাউট সালাম ও তালি দিয়ে এগিয়ে চললাম পরের চ্যালেঞ্জের দিকে, যেখানে শিখলাম ল্যাশিং করার পদ্ধতি।
পরিমাপ ও কম্পাস: এরপর শিখলাম উঁচু গাছের উচ্চতা ও পুকুরের পাড় নির্ণয়ের কৌশল এবং কম্পাসের নিখুঁত ব্যবহার।
প্রাথমিক প্রতিবিধান ও হিচ: একজন ম্যামের কাছ থেকে শিখলাম প্রাথমিক প্রতিবিধানের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো। অন্যদিকে, সজীব ভাই যাচাই করে নিলেন হিচ করার কৌশল। প্রতিটি স্টেশনে ছিল নতুন কিছু শেখা এবং নিজেদের দক্ষতা যাচাইয়ের দারুণ সুযোগ। কোথাও শেখার আনন্দ, কোথাও বা চ্যালেঞ্জ জয়ের উত্তেজনা– সব মিলিয়ে সময় যেন চোখের পলকে কেটে গেল। সফলভাবে একের পর এক চ্যালেঞ্জ অতিক্রম করে অর্জন করে নিলাম ১০টি ব্যাজ। দুপুরের খাবারের পর শুরু হলো আলোচনা ও দিকনির্দেশনামূলক পর্ব। আমন্ত্রিত অতিথিরা তাদের অভিজ্ঞতা ও দিকনির্দেশনা তুলে ধরলেন এবং আসন্ন ন্যাশনাল ক্যাম্পিংয়ের প্রস্তুতি সম্পর্কে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিলেন। সবশেষে সার্টিফিকেট বিতরণের মধ্য দিয়ে শেষ হলো দিনব্যাপী এই বর্ণাঢ্য আয়োজন। সারাদিনের অভিজ্ঞতা ও আনন্দের স্মৃতি ঝুলিতে পুরে আমরা ক্যাম্পাসে ফিরে এলাম।
বিশ্ববিদ্যালয়জীবনের ক্লাস, সিটি, অ্যাসাইনমেন্ট আর ল্যাবের টানা ব্যস্ততার মাঝে এই দিনটি হয়ে উঠেছিল শিক্ষা, নেতৃত্ব আর সুশৃঙ্খল অভিজ্ঞতায় ভরা এক বিশেষ অধ্যায়। রোভারিং আমাদের শিখিয়েছে শৃঙ্খলা, নেতৃত্ব, পারস্পরিক সহযোগিতা এবং মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মূলমন্ত্র। দিনশেষে শরীরে কিছুটা ক্লান্তি থাকলেও মনে ছিল পরম তৃপ্তি, নতুন অভিজ্ঞতা আর একরাশ প্রেরণা।