ঢাকা শুক্রবার, ০৩ জুলাই ২০২৬

মফিজ পাগলার জবানবন্দি

টেকা দেয় অনেকে কিন্তু রাইন্ধা কেউ দেয় না

টেকা দেয় অনেকে কিন্তু রাইন্ধা কেউ দেয় না
×

আবু সালেহ রনি

প্রকাশ: ২৯ মার্চ ২০২০ | ১৩:০২

'কাল (শুক্রবার) রাতে ভুনা খিচুড়ি খাইছি, আর আজ এখন (রাতে) আবার ভাত-ভাজি খাইছি। সারাদিনই না খাওয়া। টেকা দেয় অনেকে, কিন্তু রাইন্ধা কেউ দেয় না। খাবার হোটেলও বন্ধ।' বলছিলেন ছিন্নমূল ভাঙাড়ি টোকানি মফিজ পাগলা। গতকাল রোববার রাতে ঢাকার কারওয়ান বাজার সার্ক ফোয়ারার ফুটপাতে বসেছিলেন তিনি।
মাথাভর্তি ঝাঁকড়া সাদা চুল ও দাড়ির আবেশে মফিজ পাগলাকে প্রথম দেখায় একজন শক্তসামর্থ্য বাউলশিল্পী বলে মনে হয়। একটু পাশেই ঘুমিয়ে ছিলেন এক মধ্যবয়স্ক নারী।
'কেমন আছেন?'
করোনাভাইরাসের কারণে দোকানপাট, হোটেল বন্ধের সমস্যার কথা তুলে ধরেন মফিজ পাগলা। তিনি বলেন, 'ভাঙাড়ি টোকানোর পর যা পেতাম তাতে দিনে ২০০-৩০০ টাকা আসত। দোকানপাট বন্ধ, রাস্তায় মানুষও নাই। তাই প্লাস্টিকের বোতল-ক্যান এসব এখন আর রাস্তায় পাই না।'
'মফিজ পাগলা নাম কেন?'
'সবাই ওহন এ নামেই ডাকে।'
কাজকর্ম কী করেন, জানতে চাইলে ৭২-৭৫ বছর বয়সী মফিজ পাগলা বলেন, '২০০১ সালের আগে কারওয়ান বাজারসহ ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় বানরের খেলা দেখাতাম। তখন ভালোই চলত। দুটো বানর ছিল। একদিন আমার সঙ্গেরই একজন বানর নিয়ে পালিয়ে যায়। তার পর থেকে ভাঙাড়ি টোকানোর কাজ করছি।'
ঢাকায় বর্তমানে কোন এলাকায় থাকেন, জানতে চাইলে তিনি বলেন, 'এখানে (সার্ক ফোয়ারা) একটু বাতাস আছে, এজন্য এখানে রাতে থাকি। বাতাসে মশাও কম কামড়ায়। দিনের বেলা ভাঙাড়ি টোকানোর পর একুশে টিভির ওদিকে থাকি।'
রাজবাড়ীর পাংশার মফিজ পাগলা
মুক্তিযুদ্ধের পরপরই ঢাকায় চলে আসেন। বিয়ে করেন ময়মনসিংহের এক মেয়েকে। তবে সেই সংসার আর নেই। হঠাৎ দুটো মোটরসাইকেলে দুই ব্যক্তি এসে হাজির হয় সার্ক ফোয়ারার সামনে। তাদেরই একজন একটি খাবার প্যাকেট তুলে দিয়ে যান মফিজ পাগলাকে।
করোনাভাইরাস সংক্রমণ রোধে ঢাকাসহ সারাদেশে ১০ দিনের ছুটি ঘোষণা করেছে সরকার। সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানসহ জনসাধারণের দৈনন্দিন চলাচলেও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। ফলে শুধু মফিজ পাগলাই নন, ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় বসবসরত ছিন্নমূল মানুষেরা চরম বিপাকে পড়েছে। হোটেল বন্ধ থাকায় তাদের জন্য রান্না করা খাবার পাওয়াই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
২০১৬ সালের সরকারি সমীক্ষা বলছে, ঢাকায় ছিন্নমূল মানুষের সংখ্যা এক হাজার ৬০০। তবে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলোর হিসাবে তা ৫০ হাজার ছাড়িয়ে গেছে। ফুটপাতে দিনযাপন করা এসব ছিন্নমূল মানুষ নূ্যনতম নাগরিক অধিকার থেকে যেমন বঞ্চিত, তেমনি নেই কোনো সামাজিক নিরাপত্তাও। তাই তাদের রাষ্ট্রীয় মূলধারায় নিয়ে আসার দাবি সমাজকর্মীদের। হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট মনজিল মোরসেদ বলেন, 'যে কোনো দুর্যোগে সব সেক্টরের মানুষকে বিভিন্ন সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়। এর মধ্যে ছিন্নমূল এবং দুস্থ মানুষকে সবচেয়ে বড় যে চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হয়, সেটি হলো খাবার। যদিও বর্তমান পরিস্থিতিতে অনেকে চাল-ডাল দিচ্ছেন কিন্তু যার রান্নম্না করার সুযোগ নেই, তার সমস্যার তো সমাধান হচ্ছে না। এ ক্ষেত্রে প্রশাসনের উচিত, প্রত্যেক এলাকাভিত্তিক ছিন্নমূল মানুষের খাবারের নিশ্চয়তা করা।'
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, 'হোম কোয়ারেন্টাইনে দেশবাসীকে পাঠিয়ে নিতান্তই অপ্রতুল ও বিক্ষিপ্ত কিছু প্রতিরোধমূলক কার্যক্রমের ওপর নির্ভর করে হাত গুটিয়ে বসে থাকার সময় নেই। এখনই সংশ্নিষ্ট দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞদের সম্পৃক্ত করে একটি সমন্বিত স্বল্প, মধ্যম ও দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনা ও সম্মিলিত জাতীয় কৌশল চূড়ান্ত করতে হবে এবং একই সঙ্গে তা বাস্তবায়নের জন্য জিডিপির অন্তত ১০ শতাংশের সমপরিমাণ অর্থের জোগানের পাশাপাশি বহুমুখী উদ্যোগ চালিয়ে যেতে হবে।'



আরও পড়ুন

×