নাগরিক সংলাপে বিশেষজ্ঞরা
গণভোট বিতর্কের সমাধান জনগণের রায়ের মধ্যেই
ছবি: সংগৃহীত
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ০৯ মার্চ ২০২৬ | ০৯:২৬
অন্তর্বর্তী সরকার সংবিধানের ভিত্তিতে নয়, গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ফলে গণভোটের প্রশ্নেও সমাধান খুঁজতে হবে রাজনৈতিক বাস্তবতা ও জনগণের রায়ের মধ্যে। গতকাল রোববার দুপুরে রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে ‘জুলাইয়ের সাংবিধানিক স্বীকৃতি ও নতুন সংসদের কাছে নাগরিক প্রত্যাশা’ শীর্ষক নাগরিক সংলাপে এসব কথা বলেন সংশ্লিষ্টরা। সংলাপটির আয়োজন করে প্ল্যাটফর্ম ভয়েস ফর রিফর্ম।
সংলাপে সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, গণভোট নিয়ে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তার সমাধান সংবিধানে নেই। সরকার ইতোমধ্যে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ জারি করেছে এবং গণভোটে জনগণ তাদের মতামত দিয়েছে– সেখানে এর সমাধান নিহিত রয়েছে।
তিনি বলেন, আইন অঙ্গনে ‘ডকট্রিন অব পলিটিক্যাল কোয়েশ্চেন’ নামে একটি ধারণা রয়েছে। এর অর্থ হলো কিছু বিষয় রাজনৈতিক সমঝোতা ও ঐকমত্যের মাধ্যমে নিষ্পত্তি হওয়া উচিত, যেগুলো আদালতের এখতিয়ারের বাইরে থাকে। বহু আলোচনার মাধ্যমে রাজনীতিবিদরা যে ঐকমত্যে পৌঁছেছেন, সেখানে এ নীতির প্রয়োগ হতে পারে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ না নিয়ে অযথা বিতর্ক তৈরির পেছনে কার লাভ হচ্ছে– এ প্রশ্নও তোলেন সুজন সম্পাদক। তিনি বলেন, সরকার গঠনের শুরু থেকে বিভক্তি ও অনৈক্য সৃষ্টি করা হলে তা দেশের জন্য নতুন জটিলতা তৈরি করবে। এ ধরনের জটিলতার কারণে পলাতক শক্তির ফিরে আসার সুযোগ তৈরি হতে পারে বলে সতর্ক করেন বদিউল আলম মজুমদার। তাঁর ভাষায়, এমন সিদ্ধান্ত শেষ পর্যন্ত আত্মঘাতী হতে পারে।
তিনি আরও বলেন, জুলাই সনদে রাজনৈতিক দলগুলোর সুস্পষ্ট লিখিত অঙ্গীকার রয়েছে। এখন যেহেতু এই সনদের বাস্তবায়ন আদেশ নিয়ে এক পক্ষ আদালতে গেছে, যারা এতে ক্ষুব্ধ হয়েছেন তাদেরও আদালতে গিয়ে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরা উচিত।
সংলাপে আমার বাংলাদেশ পার্টির (এবি পার্টি) চেয়ারম্যান মুজিবুর রহমান মঞ্জু বলেন, জুলাই সনদ তৈরিতে যারা ভূমিকা রেখেছেন, তারা সম্মিলিতভাবে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে সমঝোতার প্রস্তাব দিতে পারেন। রাজনৈতিক বিষয় আদালতে না নিয়ে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান খোঁজা উত্তম। দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের অভিজ্ঞতায় সবাই ক্লান্ত, তাই নতুন সংঘাত নয়– দেশরক্ষায় ঐক্যের পথ বেছে নেওয়া উচিত। তিনি বলেন, আমরা আরেকটি গণঅভ্যুত্থান আপনাদের বিরুদ্ধে করতে চাই না। কারণ, আপনার রক্তের দাগ আমার শার্টে আছে, আমার রক্তের দাগ আপনার মাফলারে আছে। আমরা একসঙ্গে লড়াই করেছি, কারাগারে থেকেছি, একই হাতকড়া ভাগাভাগি করেছি। তাই বাংলাদেশকে আমাদের একসঙ্গে রক্ষা করতে হবে।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী শিশির মনির বলেন, সংবিধান সংস্কার পরিষদের সভা
রাষ্ট্রপতি আহ্বান না করলে বিপ্লবীদের উচিত আগামী ১৩ মার্চের আগের সংবিধান সংস্কার পরিষদের সভা আহ্বান করা। সেখানে সংবিধান কীভাবে সংস্কার করবেন, সে বিষয়ে আলোচনা করতে পারেন। বিপ্লবীরা এ সভা ডাকতে পারেন। কারণ, তারা শপথ নিয়েছেন। অন্যরা তো শপথ নেননি। তিনি আরও বলেন, পৃথিবীর কোনো অভ্যুত্থান আদালতের সিদ্ধান্ত মেনে সংঘটিত হয় না। বিপ্লব আদালতের বিবেচনার বিষয় নয়। আদালতকে ব্যবহার করে জুলাই সনদের বাস্তবায়ন আদেশ স্থগিত করার চেষ্টা আত্মঘাতী পদক্ষেপ হতে পারে।
এবি পার্টির সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান ফুয়াদ মন্তব্য করেন, বিএনপি সরকার ইতোমধ্যে অন্ধ আচরণ শুরু করেছে। তাঁর দাবি, শেখ হাসিনা কয়েক বছর পর যে আচরণ শুরু করেছিলেন, তারা শপথের দিন থেকে তা শুরু করেছেন। তিনি অভিযোগ করেন, গণঅভ্যুত্থানের সরকারকে তার প্রাপ্য আইনি মর্যাদা দেওয়া যায়নি। তাঁর ভাষায়, একটি গণঅভ্যুত্থানকে ক্যান্টনমেন্ট হয়ে বঙ্গভবন হয়ে অ্যাটর্নি জেনারেলের পকেট থেকে সংবিধানের ১০৬ ধারার মাধ্যমে সুপ্রিম কোর্টের ডাস্টবিনে ফেলে দেওয়া হয়েছে। এটাই আমাদের আদি পাপ। এর ফল এখনও বহন করতে হচ্ছে।
সংলাপটি সঞ্চালনা করেন ভয়েস ফর রিফর্মের উদ্যোক্তা ফাহিম মাশরুর। এতে আরও বক্তব্য দেন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী দিলারা চৌধুরী, আলোকচিত্রী শহিদুল আলম, বাংলাদেশ রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের সভাপতি হাসনাত কাইয়ূম, এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষারসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা।
- বিষয় :
- গণঅভ্যুত্থান
