ঢাকা বৃহস্পতিবার, ১৩ আগস্ট ২০২৬

‘মধ্যরাতে বিদ্যুৎ গেলে গরমে ঘুমাব কী করে’

‘মধ্যরাতে বিদ্যুৎ গেলে গরমে ঘুমাব কী করে’
×

ছবি: সংগৃহীত

হাসনাইন ইমতিয়াজ

প্রকাশ: ১৩ আগস্ট ২০২৬ | ০২:২২ | আপডেট: ১৩ আগস্ট ২০২৬ | ০৩:০৬

দেশের গ্রাম ও মফস্বল এলাকায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা লোডশেডিং চলার পর এবার রাজধানী ঢাকাতেও এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। বুধবার মধ্যরাতে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় একাধিকবার বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার অভিযোগ করেছেন নগরবাসী। কোথাও ২০ মিনিট, কোথাও এক ঘণ্টার বেশি বিদ্যুৎ না থাকার কথা জানিয়েছেন ঢাকাবাসী। মধ্যরাতে বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় তীব্র গরমে ঘুমাতে না পেরে ভোগান্তিতে পড়েছেন অনেকে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া বিভিন্ন স্ট্যাটাসে ঢাকার বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দারা লোডশেডিংয়ের কথা জানিয়েছেন। দীর্ঘদিন পর রাজধানীতে লোডশেডিংয়ের অভিজ্ঞতা নিয়ে কেউ বিস্ময় প্রকাশ করেছেন, কেউ আবার তীব্র গরমে দুর্ভোগের কথা তুলে ধরেছেন।

জেরিন নামে এক ফেসবুক ব্যবহারকারী তার ওয়ালে লিখেছেন, ‘মধ্যরাতে বিদ্যুৎ গেলে গরমে ঘুমাব কী করে।’ হৃদয় খান নামে আরেকজন লিখেছেন, ‘ঢাকায় লোডশেডিং! প্রায় এক ঘণ্টা যাবৎ সিদ্ধ হচ্ছি। ঢাকায় আর কোথাও লোডশেডিং হচ্ছে?’

শেরেবাংলা নগর এলাকার এক বাসিন্দা জানান, ‘রাতে প্রায় ২০ মিনিট বিদ্যুৎ ছিল না। বিদ্যুৎ অফিসে যোগাযোগ করলে তাকে আরও প্রায় ৩০ মিনিট পর বিদ্যুৎ আসতে পারে বলে জানানো হয়। রাজধানীর অন্য কয়েকটি এলাকাতেও একই সময়ে বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে।’

আতিকুজ্জামান নামে এক ব্যবহারকারী লিখেছেন, ‘প্রায় পাঁচ বছর ধরে ঢাকার একটি সরকারি কোয়ার্টারে থাকলেও কখনো ৩০ মিনিটের বেশি লোডশেডিং হয়নি। অথচ বুধবার রাতে এক ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকার পাশাপাশি ওই দিন তৃতীয়বারের মতো বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার অভিজ্ঞতা হয়েছে তার।’

আতাউর রহমান নামে এক সাংবাদিক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, ‘সারাদিনের কর্মব্যস্ততা শেষে রাত সোয়া ১১টার দিকে বাসায় ফেরার সময়ই বিদ্যুৎ চলে যায়। দীর্ঘ দিনের কাজ শেষে ঘরে ফিরে বিশ্রামের বদলে বিদ্যুৎহীন অবস্থায় থাকতে হয়েছে তাকে।’

ঢাকার বাইরে ১০ থেকে ১৬ ঘণ্টা

রাজধানীর বাইরে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি আরও খারাপ। দেশের বিভিন্ন গ্রাম ও মফস্বল এলাকায় দিনে ১০ থেকে ১৬ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিংয়ের খবর পাওয়া যাচ্ছে। কোথাও কোথাও এর চেয়েও বেশি সময় বিদ্যুৎ থাকছে না বলে অভিযোগ করছেন গ্রাহকেরা। এতে তীব্র গরমের মধ্যে মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। কলকারখানা, ব্যাবসাপ্রতিষ্ঠান ও সেচ ব্যবস্থাতেও এর প্রভাব পড়ছে।

সাম্প্রতিক সময়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনে জ্বালানি সংকট তীব্র হওয়ায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে লোডশেডিং বেড়েছে। বিশেষ করে গ্যাসের সরবরাহ কমে যাওয়ায় গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। পাশাপাশি বিদ্যুৎ আমদানির ক্ষেত্রেও ঘাটতি তৈরি হওয়ায় জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ ও চাহিদার মধ্যে বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে।

ঢাকাতেও বাড়ছে চাপ

ঢাকার বিদ্যুৎ বিতরণের দায়িত্বে রয়েছে ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি (ডিপিডিসি) ও ঢাকা ইলেকট্রিক সাপ্লাই কোম্পানি (ডেসকো)। দুই সংস্থার আওতাভুক্ত এলাকায় মোট বিদ্যুতের চাহিদা ৩ হাজার মেগাওয়াটের বেশি।

এতদিন দেশের অন্য এলাকার তুলনায় রাজধানীতে বিদ্যুৎ সরবরাহ তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল ছিল। ফলে ঢাকার বাসিন্দাদের কাছে দীর্ঘ সময়ের লোডশেডিং অনেকটা গ্রামাঞ্চলের সমস্যা হিসেবেই পরিচিত ছিল। কিন্তু এবার রাজধানীর বিভিন্ন এলাকাতেও বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় সেই পরিস্থিতির পরিবর্তন হচ্ছে।

ফারিন আহমেদ নামে এক ব্যবহারকারী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, ‘গ্রাম ছেড়ে লোডশেডিং এখন ঢাকায়।’ আরেক ব্যবহারকারী লিখেছেন, ‘এতদিন জানতেন গ্রামাঞ্চলে পল্লি বিদ্যুতের কারণে ঘন ঘন লোডশেডিং হয়।’ তার প্রশ্ন, ‘ঢাকাতে তো পল্লি বিদ্যুৎ না, তো লোডশেডিং কেন?’

লোডশেডিং নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা ধরনের ব্যঙ্গ-বিদ্রূপও দেখা গেছে। কেউ দীর্ঘদিন পর রাজধানীতে বিদ্যুৎ বিভ্রাটের অভিজ্ঞতা নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেছেন, আবার কেউ মধ্যরাতে বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় গরমে ঘুমাতে না পারার কথা জানিয়েছেন।

জ্বালানি সংকটই বড় কারণ

সংশ্লিষ্টদের মতে, বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় গ্যাসের সরবরাহ কমে যাওয়াই বর্তমান সংকটের অন্যতম বড় কারণ। গ্যাসের অভাবে অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্র পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না। ফলে জাতীয় গ্রিডে চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ সরবরাহ করা কঠিন হয়ে পড়েছে।

এদিকে দেশে গ্যাসের সংকটও তীব্র। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় দিনের নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত গ্যাস না থাকার অভিযোগ রয়েছে। বিদ্যুৎ ও গ্যাস—দুই সংকট একসঙ্গে দেখা দেওয়ায় নগরজীবনে দুর্ভোগ আরও বাড়ছে।

সাবির হোসেন নামে এক ব্যবহারকারী রাতে বিদ্যুৎ না থাকায় তীব্র গরমে ভোগান্তির কথা জানিয়ে লিখেছেন, দেশের বিভিন্ন এলাকায় ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ না থাকার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। তার প্রশ্ন, ‘কী একটা অবস্থা।’

এতদিন রাজধানীর বাইরে দীর্ঘ লোডশেডিংয়ের খবরই বেশি ছিল। এখন ঢাকার বিভিন্ন এলাকাতেও বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় সংকটের ব্যাপ্তি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তীব্র গরমের মধ্যে উৎপাদন ও জ্বালানি সংকট দ্রুত না কাটলে রাজধানীসহ সারাদেশের বিদ্যুৎ পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

আরও পড়ুন

×