পিআরআইয়ের সেমিনারে বক্তারা
শুধু আধুনিক পরিকাঠামো দিয়ে 'স্মার্ট সিটি' হবে না
অনুষ্ঠানে অতিথিরা- সংগৃহীত
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ১১ ডিসেম্বর ২০১৯ | ১০:০৪
বাংলাদেশে উন্নয়নের সঙ্গে নগরায়নও বাড়ছে। এখন সময় এসেছে শহরগুলোকে 'স্মার্ট সিটিতে' রূপান্তর করার। এতে নগরে দূষণ কমবে। শ্রম ঘণ্টা বাঁচবে। নগর ব্যবস্থাপনা সহজ হবে। এজন্য সবার আগে শহরে বসবাসকারী নাগরিকদের সচেতনতা বাড়াতে হবে। পাশাপাশি সেবাদাতা সংস্থাগুলোর জনবলকে প্রযুক্তিগত সেবা দেওয়ার কাজে দক্ষ করে তুলতে হবে। শুধু আধুনিক পরিকাঠামো দিয়ে নগরকে স্মার্ট সিটিতে রূপান্তর করা যাবে না। এজন্য পরিকাঠামোতে বিনিয়োগের আগে মানব উন্নয়নে বিনিয়োগ করতে হবে।
বুধবার পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট (পিআরআই) আয়োজিত 'চায়না স্মার্ট সিটির অভিজ্ঞতা এবং বাংলাদেশের জন্য শিক্ষা' শীর্ষক এক সেমিনারে বক্তারা এসব কথা বলেন।
স্যানিটেশন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ, পরিবহন, বিদ্যুতের মতো সেবাগুলোর ব্যবস্থাপনা প্রযুক্তি ভিত্তিতে হচ্ছে এবং জনগণও এই ব্যবস্থাপনার অংশ সেইসব শহরগুলোকে স্মার্ট সিটি বলা হচ্ছে।
সেমিনারে কিংডম ইঞ্জিন ইন্টারন্যাশনাল নামক একটি চায়না কোম্পানির সিইও লিং লিংগ্যাং ও এটি ক্যাপিটালের ম্যানেজিং পার্টনার ইফতি ইসলাম আলাদা প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। দু'জনই তাদের প্রবন্ধে ঢাকাসহ দেশের অন্যান্য বড় শহরে প্রযুক্তিভিত্তিক ব্যবস্থাপনায় জোর দেন।
তারা বলেন, চীনের স্মার্ট
সিটিগুলোতে জনগণ নিজের সেবা নিজেই নিতে পারছেন। অন্যদিকে বর্জ্য
ব্যবস্থাপনা, পরিবহন ব্যবস্থাপনা, বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনা হচ্ছে
স্বয়ংক্রিয়ভাবে। ব্যাপক জনগণকে হাতেকলমে সেবা দেওয়ার চেয়ে প্রযুক্তির
মাধ্যমে সেবা দেওয়া সহজ ও কম সময়ের। এতে সরকার ও জনগণ উভয়পক্ষ লাভবান হয়।
অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেন,
দেশে বর্তমানে শহরের পরিধি বাড়ছে। বাংলাদেশ 'টাউনশিপ কান্ট্রিতে' পরিণত
হয়েছে। কিন্তু সুশাসন, বিকেন্দ্রীকরণ ততটা হয়নি। এগুলো না হলে স্মার্ট সিটি
বলতে যা বোঝায় তা হবে না। স্মার্ট সিটি পরিচালনার জন্য অবশ্যই নগর পরিচালন
ব্যবস্থা এক সরকারের অধীনে থাকতে হবে। কিন্তু বাংলাদেশে একই সঙ্গে একাধিক
সরকার কাজ করছে। তবে নগরায়নে বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণের ফলে বাংলাদেশের
ঝুপড়ি পরিস্থিতি বদলেছে। কোনো শহরকে স্মার্ট সিটিতে রূপান্তর করতে হলে
সেখানেও সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি খাতকে সম্পৃক্ত হতে হবে।
নগর বিশেষজ্ঞ সেলিম রশিদ বলেন, ঢাকার ব্যবস্থাপনা হতে হবে ঢাকার পরিস্থিতির ওপর বিচার করে। বিশ্বের অন্য শহরের আদলে এখানে করতে গেলে লাভ হবে না। এজন্য প্রথমে নিজস্ব ব্যবস্থাপনার উদ্ভাবন দরকার। দরকার বিকেন্দ্রীকরণও। কারণ এত জনগণের চাপ কোনো ব্যবস্থাই ভালোভাবে নিতে পারবে না।
নগর পরিকল্পনাবিদ স্থপতি ইকবাল হাবিব বলেন, ঢাকা শহরের যে পরিমাণ জনগণ বসবাস করছে, তাতে স্মার্ট সিটি ব্যবস্থা এখানে জরুরি। কিন্তু এখানে কিছু পরিকাঠামো দিয়ে স্মার্ট সিটি হবে না। সবার আগে দরকার জনগণকে স্মার্ট সিটির ধারণা সম্পর্কে সচেতন করা। পাশাপাশি নগরে যেসব সংস্থা কাজ করছে, সেখানকার জনবলকে আধুনিক প্রযুক্তি পরিচালনায় দক্ষ হতে হবে। নতুন কোনো পরিকাঠামোতে নগর স্মার্ট হবে না। শুধু পরিচালনার দক্ষতার অভাবে উত্তর সিটি করপোরেশনে নগর অ্যাপ চালু করে তা পরিচালনা করা যায়নি। সিসিটিভি, স্মার্ট ট্রাফিক লাইট সফল হয়নি। বছরে বছরে রাস্তা কাটা আর নতুন করে বানানোর মতো লোক দেখানো ও টাকা খরচের ব্যবস্থা থাকলে স্মার্ট সিটি হবে না। আগে এসব বন্ধ করতে হবে। এজন্য সরকারের চিন্তায় স্মার্ট হওয়া দরকার। ঢাকা শহরে ৫৪টি সংস্থা কাজ করছে। এদের সমন্বয় দরকার। এজন্য সরকার আগে জনগণ ও সেবাদাতাদের সচেতন করায় বিনিয়োগ করতে হবে।
পিআরআইয়ের চেয়ারম্যান জাইদি সাত্তার বলেন, স্মার্ট সিটির জন্য প্রযুক্তিগত উন্নয়ন জরুরি। এটি এমন একটি ধারণা যে, স্মার্ট সিটি মানে স্মার্ট ফোনের মতো। নিজের হাতেই অনেক কাজ করা যায়।
পিআরআইয়ের পরিচালক নগর পরিকল্পনাবিদ সারওয়ার জাহান বলেন, একটি শহর হচ্ছে মানবদেহের মতো। মানবদেহে যেমন একাধিক অঙ্গপ্রত্যঙ্গ আছে, যেগুলো মস্তিস্কের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত ও পরিচালিত হয়, তেমনি শহরে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পরিবহন, বিদ্যুৎ, জ্বালানি, পানির মতো বিষয় রয়েছে। এগুলো একেকটি একেক সংস্থার মাধ্যমে পরিচালিত। এই সংস্থাগুলোর চিন্তায় স্মার্ট না হলে স্মার্ট সিটি সম্ভব নয়।
পটুয়াখালী পৌর মেয়র মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, নগরের উন্নয়নের জন্য অবকাঠামো উন্নয়ন দরকার। দরকার বসবাসকারীদের বিস্তারিত তথ্যভাণ্ডার। কিন্তু ভোটের স্বার্থে অনেক সময় স্থানীয় সরকারের প্রতিনিধিরা অনেক ক্ষেত্রে আপস করেন। এ ক্ষেত্রে সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে নীতিমালা দরকার। উন্নয়নের স্বার্থে কোনো আপস করা যাবে না। তাহলেই প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব।
সেমিনারের সভাপতি পিআরআইয়ের নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর বলেন, নগরকে স্মার্ট সিটিতে রূপান্তর নির্ভর করছে জনগণ ও নগরের সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলো প্রযুক্তিতে কতটা দক্ষ হতে পারছে তার ওপর। সেবা দেওয়া ও গ্রহণ প্রযুক্তিভিত্তিক না হলে স্মার্ট সিটি হবে না। এজন্য প্রযুক্তির অন্তর্ভুক্তিকরণ খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
বারভিডা সভাপতি আব্দুল হক বলেন, স্মার্ট সিটির জন্য আগে সরকারের কাঠামো পাল্টাতে হবে। জনগণকে সচেতন করতে হবে।
ডিজিটাল সিলেট সিটির প্রকল্প পরিচালক মহিদুর রহমান খান বলেন, তার প্রকল্পের
মাধ্যমে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, সেবায় আধুনিকতা, নারীদের জন্য আলাদা সেবা ও
ইন্টারনেট সেবা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
- বিষয় :
- স্মার্ট সিটি
