ঢাকা বুধবার, ০৮ জুলাই ২০২৬

বীর জাতি বাঙালিকে পারতেই হবে

বীর জাতি বাঙালিকে পারতেই হবে
×

ড. কাজী ছাইদুল হালিম

ড. কাজী ছাইদুল হালিম

প্রকাশ: ২৯ এপ্রিল ২০২০ | ০৪:৩৬

চীনের উহান শহর থেকে ইউরোপ হয়ে হঠাৎ করেই বাংলাদেশে প্রবেশ করে করোনাভাইরাস। বাংলাদেশে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ প্রথম চিহ্নিত হয় রাজধানী ঢাকায় এবং পরবর্তী সময়ে তা ছড়িয়ে পড়ে বাংলাদেশের অন্যান্য জেলায়। করোনাভাইরাসের বিস্তারকে আমরা বিশ্বায়নের একটা ফলাফলও বলতে পারি। বিশ্বায়নের যেমন অনেক সুফল আছে তেমনই চীনের উহান শহর থেকে পৃথিবীর অন্যান্য দেশে করোনার বিস্তারকে আমরা বিশ্বায়নের একটা কুফল হিসেবেও ভাবতে পারি। ব্যবসা-বাণিজ্য, চাকরি, উচ্চ শিক্ষা, খেলাধুলা, ভ্রমণ, চিকিৎসা এবং আরো অনেক প্রয়োজনে এক দেশ থেকে অন্য দেশে মানুষের যাতায়াত সেই প্রাচীনকাল থেকেই চলে আসছে। সুতরাং আমরা বলতে পারি যে বিশ্বায়ন নতুন কোনো কিছু না, এটা অনেক পুরনো একটা চল। বিশ্বায়ন ছিল, আছে এবং আগামীতেও থাকবে।

করোনার হঠাৎ প্রবেশের কারণে একে মোকাবেলা করার মত যথেষ্ট প্রস্তুতি যেমন অনেক দেশেরই ছিল না, তেমনটি ঘটেছে বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও। সংক্রমণের দিক দিয়ে ইউরোপের অনেক দেশ যেমন ইতালি, স্পেন, ফ্রান্স, জার্মানি এবং অষ্ট্রিয়া বিপজ্জনক অবস্থা পার করছে। বাংলাদেশের অবস্থাও  কোনো দ্বিধা ছাড়াই বলতে পারি যে খারাপের দিকে যাচ্ছে দিনকে দিন। তবে আমাদের অবস্থা যেন আরও খারাপের দিকে না যায় সে জন্য সকলে মিলে চেষ্টা করতে হবে। করোনা একটা খুবই নতুন ধরনের ভাইরাস আর তাই এর চিকিৎসায় নির্দিষ্ট কোনো ওষুধ এখনও আবিষ্কার হয়নি, এর প্রতিরোধে নেই কোন টিকাও। অধিকন্তু, করোনাভইরাসের সংক্রমণ হয় জ্যামিতিক হারে, আর আজ কারো টেস্ট রেজাল্ট নেগেটিভ হলেও দুই দিন পরে একই ব্যক্তির রেজাল্ট হতে পারে পজিটিভ। এর প্রধান কারণ হল ভাইরাসটি সুপ্ত অবস্থায় কারো শরীরে দুই সপ্তাহ থাকতে পারে; এই দুই সপ্তাহের মধ্যে ভাইরাসটি নিজে থেকেই নিষ্ক্রিয় হয়ে যেতে পারে আবার ভাগ্য খারাপ হলে বাহকের শরীরে সক্রিয় হয়ে রোগের উপসর্গ আকারে দেখা দিতে পারে। করোনার উপসর্গ দেখা দিলে সময় ক্ষেপণ না করে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে।

করোনাভাইরাস থেকে আমাদের সাবধান হতে হবে, কারণ এর সংক্রমণে সৃষ্ট উপসর্গ নিয়ে  মানুষ মারা যাচ্ছে বাংলাদেশে এবং বাংলাদেশের বাইরে। আর করোনাভাইরাসের সংক্রমণের হারটা উদ্বেগজনক হারে বেশি, ওই যে বললাম জ্যামিতিক হারে; ১ থেকে ২, ২ থেকে ৪, ৪ থেকে ৮, ৮ থেকে ১৬, ১৬ থেকে ৩২ এভাবে। জনসংখ্যার দিক দিয়ে ফিনল্যান্ড খুব ছোট হলেও আয়তনের তুলনায় বাংলাদেশের আড়াই গুণ বড়।  মাত্র ৫৫ লাখ মানুষের দেশ ফিনল্যান্ড। অনেক চেষ্টা করেও ফিনল্যান্ড করোনাভাইরাসের সংক্রমণ এবং তা থেকে মৃত্যু কমাতে পারছে না। ২১ এপ্রিল পর্যন্ত ফিনল্যান্ডে ৪ হাজার ১২৯ জন করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে, যাদের মধ্যে মৃত্যুবরণ করেছে ১৪৯ জন। বাংলাদেশ অনেক ঘনবসতিপূর্ণ দেশ, ফিনল্যান্ডের চেয়ে আমাদের অনেক বেশি সতর্ক হতে হবে করোনাভাইরাস সংক্রমণ রোধে।

করোনাভাইরাসের সংক্রমণের হার কমাতে হলে সংক্রমণ শৃঙ্খল বা সংক্রমণের চেইনকে ভাঙতে হবে, যার সর্বোত্তম উপায় হচ্ছে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা এবং জরুরি প্রয়োজন ব্যাতীত গৃহ অভ্যন্তরে অবস্থান করা। অধিকন্তু, নিয়মিত সাবান দিয়ে হাত ধোওয়া, শরীর চর্চার মাধ্যমে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার বৃদ্ধি করণ, বাড়ির বাইরে গেলে মাস্ক ব্যবহার করা এবং স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য সরকারি নির্দেশনা মেনে চলা। করোনার এই সংকটকালে সবাই যে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে তা নয়, অনেক সুযোগ সন্ধানী এই সংকটকে পুঁজি করে নিজ স্বার্থ হাসিল করার চেষ্টা করছে। যেমন কিছু কিছু জনপ্রতিনিধি দুঃস্থদের জন্য বরাদ্দকৃত চাল আত্মসাৎ করছে নিজ স্বার্থ সিদ্ধির জন্য। সরকারের উচিৎ হবে এই সুযোগ সন্ধানীদের তাদের কৃতকর্মের জন্য উপযুক্ত শাস্তি প্রদান করা।

করোনা সংকট মোকাবেলায় সরকারকে এখন অনেক কিছু কেনাকাটা করতে হচ্ছে, যেমন করোনা টেস্টিং কিট, কেমিক্যাল, মানসম্মত পিপিই, টেস্টিং ল্যাব ইত্যাদি। সরকারি কেনাকাটা মানে অনেকটাই পুকুর চুরির মত ঘটনা। আর স্বাস্থ্য বিভাগে এটা মনে হয় অনেক ক্ষেত্রে সাগর চুরি মত ব্যাপার হয়ে যায়। অবাক লাগে উচ্চ শিক্ষিত মানুষগুলো কেমন করে এমন অমানুষ হয়! জনপ্রশাসনের যে সব কর্মকর্তা স্বাস্থ্য বিভাগে কর্মরত আছেন তাদের উচিৎ হবে জনগণের করের টাকার সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করা। কেউ এর ব্যত্যয় ঘটালে, অতি স্বল্প সময়ে তার কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করা। অতি সম্প্রতি বিভিন্ন মিডিয়ায় খবর এসেছে, হাসপাতালে নকল N-95 মাস্ক দেয়া হচ্ছে; প্যাকেটের গায়ে ঠিকই লিখা আছে N-95 মাস্ক কিন্তু প্যাকেটের ভেতরে N-95 মাস্কের পরিবর্তে নিম্নমানের অন্য মাস্ক দেয়া হচ্ছে। আমাদের তদন্ত করে দেখতে হবে যে এটা হাসপাতালে কর্মরত আমাদের চিকিৎসক এবং স্বাস্থ্য কর্মীদের সংক্রমণ করার একটা হীন চক্রান্ত কিনা।

একটা কথা এখানে না বললেই নয় যে চীনের সাথে আমাদের ব্যবসা বাণিজ্যের সম্পর্ক বেশ  ভালো। তবে এও মনে রাখতে হবে যে সব  চাইনিজ ব্যবসায়ীর সততা কিন্তু প্রশ্নের উর্ধ্বে নয়। অধিকন্তু, চীন বিশ্বের অধিক দুর্নীতিগ্রস্থ দেশগুলোর মধ্যে একটা। তাই চীন থেকে এই করোনা সংকট মোকাবেলায় যদি আমাদের হাসপাতালে কর্মরত চিকিৎসক এবং স্বাস্থ্য কর্মীদের ব্যবহারের জন্য পিপিই আমদানি করতে হয় তাহলে আমাদের বেশ সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে, যাতে তারা আমাদের কাছে তাদের প্রতিশ্রুতিবদ্ধ মানের পিপিই সরবরাহ করে। অন্যথায় আমাদের হাসপাতালে কর্মরত চিকিৎসক এবং স্বাস্থ্য কর্মীদের জীবন বিপন্ন হতে পারে। এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে কিছু চাইনিজ কোম্পানি ফিনিশ সরকারের কাছে হাসপাতালে কর্মরত চিকিৎসক এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের ব্যবহারের জন্য ব্যক্তিগত সুরক্ষাসামগ্রী সরবরাহ করে, যা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ মানের ছিল না। ফিনিশ সরকার চাইনিজ কোম্পানির সরবরাহকৃত সেই নিম্নমানের ব্যক্তিগত সুরক্ষাসামগ্রী গ্রহণ করে নাই। আর এই সুরক্ষাসামগ্রী কেলেঙ্কারির জন্য সরকারি ক্রয় বিভাগের প্রধানকে পদত্যাগ করতে হয়েছে।  বাংলাদেশেও এমনটিই হওয়া উচিত।

করোনা মোকাবেলায় বর্তমানে অনেক দেশের মত বাংলাদেশেও সরকারি আদেশে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা এবং লকডাউন চলছে। এতে করে ভেঙে পড়ছে সামষ্টিক অর্থনীতির বৃত্তাকার প্রবাহ; উৎপাদন, ভোগ, আমদানি, রপ্তানি, সঞ্চয় এবং বিনিয়োগ। ব্যাহত হচ্ছে স্বাভাবিক বাজার ব্যবস্থা; চাহিদা,সরবরাহ,বাজার ভারসাম্য, মূল্য সিস্টেম এবং কর আহরণ। এমতাবস্থা দীর্ঘায়িত হলে জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতে আসবে মন্দা; জিডিপির হার নেমে যাবে, বেকারত্ব বাড়বে, ক্রয় ক্ষমতা কমে যাবে এবং খাদ্যাভাব দেখা দিবে। আসন্ন মন্দাকে মোকাবিলার জন্য বাংলাদেশের মত উন্নয়নশীল দেশের অন্যতম উপায় হচ্ছে খাদ্য নিরাপত্তা ঠিক রাখা। বাংলাদেশে আমরা যেহেতু সারা বছর সূর্যের আলো পাই এবং আমাদের অনেক উর্বর জমি আছে তাই কৃষকদের জন্য উদার প্রণোদনার ব্যাবস্থা করতে হবে। খাদ্য নিরাপত্তার সাথে কোনো ছাড় দেয়া যাবে না- বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ কিন্তু তিন বেলা পেট ভরে ভাত  খেতে পারলে আর কিছু চায় না।

জাতি হিসেবে আমরা অনেক আবেগপ্রবণ, দলবদ্ধভাবে থাকতে খুব বেশি পছন্দ করি, সদালাপীও বটে আমরা এবং অনেক সময় আড্ডাতে আমাদের সব কিছু হারিয়ে যায়। এমন একটা জাতির জন্য সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে চলা এবং লকডাউনের মধ্যে থাকা যে কত কঠিন তা বলার অপেক্ষা রাখে না। সামষ্টিকভাবে আমরা এখন জীবন এবং মৃত্যুর মাঝামাঝি অবস্থায় অবস্থান করছি এই করোনাভাইরাস সংক্রমণের জন্য। এই সংক্রমণ থেকে বাঁচতে হলে এর সংক্রমণ শৃঙ্খলকে ভাঙতে হবে সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে চলে এবং লকডাউনের মধ্যে থেকে– অনেক কষ্ট করে হলেও এ দুটো আমাদের পারতে হবে, আমরা পারবো। বাঙালি বীরের জাতি, বাঙালি পারে।


লেখক: ফিনল্যান্ড প্রবাসী বাংলাদেশি, শিক্ষক, গবেষক এবং কলামিস্ট

আরও পড়ুন

×