ঢাকা বুধবার, ০৮ জুলাই ২০২৬

করোনা মোকাবিলায় কমিউনিটি পুলিশিং

করোনা মোকাবিলায় কমিউনিটি পুলিশিং
×

মো. রুমান শিকদার (বাঁয়ে) ও শেখ আবু রাইহান সিদ্দিকী

মো. রুমান শিকদার ও শেখ আবু রাইহান সিদ্দিকী

প্রকাশ: ২৯ এপ্রিল ২০২০ | ০৫:১৭

এতো সচেতনতামূলক কর্মসূচি পরিচালনা ও নিষেধাজ্ঞা আরোপের পরেও কাঁচাবাজার ও দোকানপাটের সামনে আড্ডা, চায়ের দোকানে খোশগল্পের চিত্র বা প্রয়োজন ছাড়া মানুষের বাইরে থাকা এখনও গ্রামীণ জীবনের স্বাভাবিক চিত্র। অবশ্য শহরেও এই চিত্র খুব একটা ভিন্ন নয়।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরামর্শ অনুযায়ী করোনাভাইরাস থেকে নিরাপদ থাকতে লকডাউনের বিকল্প নেই। এই লকডাউন সঠিকভাবে মেনে চলে করোনা নিয়ন্ত্রণের অন্যতম উদাহরণ পর্তুগাল। করোনা সংক্রমণের প্রায় সর্বোচ্চ পর্যায়ে অবস্থান করা স্পেনের পাশের দেশ হয়েও এখানে সংক্রমণের হার স্পেনের দশ ভাগের মাত্র একভাগ।

কী কৌশলে করোনাকে এতটা নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম হয়েছে পর্তুগাল! বিষয়টি একটু খতিয়ে দেখা যেতে পারে। প্রথম ধাপে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ার আগেই সবকিছু কার্যত লকডাউন করে ফেলে দেশটি। দেশটির জনগণ লকডাউনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে ঘরে থাকাকেই বেশি গুরুত্ব দিয়েছে।  সম্প্রতি ক্যাথলিক ইউনিভার্সিটি অব পর্তুগালের সেন্টার ফর স্টাডিজ অ্যান্ড অপিনিয়ন পোলস (সিইএসওপি)-এর এক জরিপে দেখা গেছে, লকডাউনের সময়ে ৫১ শতাংশ পর্তুগিজই সপ্তাহে মাত্র একবার ঘর থেকে বের হয়েছে।

আমাদের দেশও শুরু থেকেই লকডাউনের পথে হাঁটলেও সাধারণ মানুষের অসচেতনতাই ছিল এখানে প্রধান বাঁধা। লকডাউন নিশ্চিত করতে পুলিশসহ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী অন্যান্য বাহিনীসমূহকে শুরু থেকেই যথেষ্ট তৎপর হতে দেখেছি। কিন্তু পর্তুগালের মত সাধারণ মানুষ তাদেরকে সহযোগিতা করেননি বরং অসহযোগিতা ছিল বরাবরই।

দেশের বেশিরভাগ এলাকায়ই বাজার থেকে গ্রামের প্রান্তের ঝুপড়ি দোকানটির ক্ষেত্রেও দেখা যায় পুলিশ আসার বিষয়টি তারা আগে থেকেই টের পেয়ে পালিয়ে যান। আবার পুলিশ চলে যাওয়ার সাথে সাথেই আগের মতই নিজেদের অসচেতন অস্তিত্বকে জানান দেন, ভুলে যান সামাজিক দূরত্বের কথা। তাই এই প্রক্রিয়ায় জনতার সাথে পুলিশের মুখোমুখি দেখা হওয়া এবং মানুষকে করোনার বিষয়টি বুঝিয়ে বলার সুযোগ খুব কম। তাছাড়া আমাদের সীমিত সংখ্যক পুলিশের পক্ষে গ্রামের পর গ্রাম সারাক্ষণ টহল দেওয়াও এককথায় অসম্ভব। সব মিলিয়ে সাধারণ পুলিশিংয়ের মাধ্যমে এমন জরুরি পরিস্থিতিতে ভালো ফলাফল পাওয়া অনেকটা দুরূহই বলা চলে।

এই পরিস্থিতিতে আমরা এখন কমিউনিটি পুলিশিংয়ের দিকে বেশি জোর দিতে পারি। এই ধরনের পুলিশিংয়ের মাধ্যমে পুলিশ সদস্যরা সাধারণ জনতার সাথে অনেক ঘনিষ্ঠভাবে মিশে কাজ করে থাকেন। তাছাড়া মানুষের সাথে পুলিশের আস্থার সম্পর্ক বৃদ্ধিতেও বিশ্বজুড়েই এই ধরনের পুলিশিংয়ের ভূমিকা অনেক প্রশংসিত।

বর্তমানে বাংলাদেশে কমিউনিটি পুলিশিং ফোরাম (সিপিএফ) এর মাধ্যমে সারাদেশে এই পুলিশিং কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। ‘টাওন ডিফেন্স পার্টি’ নামে ১৯৯২ সালে ময়মনসিংহে কমিউনিটি পুলিশিংয়ের যাত্রা শুরু হয়। এরপর নাটোরে ব্যবসায়ীদের অবৈধ চাঁদাবাজির হাত থেকে রক্ষার জন্য ‘লাঠি-বাঁশি বাহিনী’ নামে এটির কার্যক্রম চলমান ছিল। ১৯৯৭ সালের দিকে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের উদ্যোগে ঢাকাতে এই পুলিশিং ব্যবস্থা চালু হয়। পরবর্তী সময়ে দেশের বিভিন্ন এলাকায় কমিউনিটি পুলিশিং কার্যক্রম পরিচালনা করতে কমিউনিটি পুলিশিং ফোরাম (সিপিএফ) ও কমিউনিটি পুলিশিং কমিটি (সিপিসি) গঠিত হয়। পুলিশ হেডকোয়ার্টারের দেওয়া একটি পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে কমিউনিটি পুলিশিংয়ের গুরুত্ব সহজেই উপলব্ধি করা যায়, যেখানে উল্লেখ করা হয়েছে কমিউনিটি পুলিশিংয়ের মাধ্যমে ২০১৬ সালে ১ লাখ, ২০১৭ সালে ১ লাখ ১২ হাজার এবং ২০১৮ সালে ১ লাখ ২৭ হাজার বিরোধের সমাধান করা সম্ভব হয়েছে। 

কমিউনিটি পুলিশিং ফোরামে পুলিশ সদস্যরা ইউনিয়ন বা ওয়ার্ড পর্যায়ে কমিটির সদস্যদেরকে নিয়ে লকডাউন বাস্তবায়নের বিষয়ে আলোচনা (নিজেরা নিরাপদ দূরত্ব অবলম্বন করেই) করতে পারেন। আলোচনার উদ্দেশ্য থাকবে ওই গ্রাম বা ওয়ার্ডের সকল মানুষকে লকডাউনসহ করোনা মোকাবেলার নিয়ম-কানুন মেনে চলতে উদ্বুদ্ধ করার কৌশল খুঁজে বের করা। এভাবে ফোরামের সদস্যরা যদি যথাযথভাবে কৌশল ঠিক করে গ্রামের সকল মানুষকে তা পালনে উদ্বুদ্ধ করতে সক্ষম হন তাহলে লকডাউন নিশ্চিত করা অপেক্ষাকৃত সহজে হতে পারে।

এক্ষেত্রে আরেকটি বিষয়ের দিকে আমাদেরকে দৃষ্টি দেওয়া প্রয়োজন। পুলিশ সদস্যদের কাছে করোনা বিষয়ক সর্বশেষ তথ্য ও প্রমাণ সরবরাহ করতে পারলে অনেক ভালো ফলাফল পাওয়া যেতে পারে। এ লক্ষ্যে তাদেরকে কেন্দ্রীয়ভাবে অনলাইনে বা অফলাইনে বিভিন্ন ডকুমেন্ট সরবরাহ করা যেতে পারে। এছাড়া ইতোমধ্যে বিভিন্ন দেশ লকডাউন ও অন্যান্য নিয়ম মেনে চলে কিভাবে সফলতা অর্জন করেছে সে সকল প্রমাণ উপস্থাপনও অনেক গুরুত্বপূর্ণ। এভাবে তথ্যসমৃদ্ধ ও প্রমাণসাপেক্ষ আলোচনার মাধ্যমে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করার চেষ্টা যোগাযোগের দৃষ্টিকোণ থেকে অনেক কার্যকর হিসেবে বিবেচিত হয়। এছাড়া বাংলাদেশ পুলিশের পক্ষ থেকে নিজস্ব ফেইসবুক পেইজ বা ইউটিউব চ্যানেলে করোনা মোকাবিলায় কমিউনিটি পুলিশিংয়ের কার্যক্রমগুলো তুলে ধরা সম্ভব হলে তা পুলিশ সদস্যদেরকে উৎসাহিত করতে ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা যায়।

তবে কমিউনিটি পুলিশিংয়ের এই সামগ্রিক কার্যক্রম খুবই দ্রুততার সাথে সম্পন্ন করার চেষ্টা করতে হবে। তবেই হয়তো এর দ্বারা পুলিশের বর্তমান সীমিত রিসোর্সের মাধ্যমে আরো বেশি সফলতা অর্জন সম্ভব হবে এবং করোনা মোকাবেলার পথ আমাদের জন্য অনেক সহজ হয়ে উঠবে।


লেখকদ্বয়: শিক্ষক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন

×