পরাশক্তিরও পতন হয়
মেহরাজ চৌধুরী
প্রকাশ: ১২ জুন ২০২০ | ০৯:৩২ | আপডেট: ১২ জুন ২০২০ | ১১:০৬
জর্জ ফ্লয়েড মিনিয়াপোলিসের ৪৬ বছরের টগবগে এক মানুষ। দোকানে ২০ ডলারের একটা নোট দিয়েছিলেন মে মাসের ২৫ তারিখে। নোটটি জাল ছিল বিধায় পুলিশে ফোন করেছিলেন দোকানি। পুলিশ এসে হাতকড়া পরিয়ে গাড়িতে তুলেছিল তাকে। কী বাগ্বিতণ্ডার কারণে তাকে গাড়ি থেকে নামিয়ে নিচে ফেলা হয়েছিল জানা যায়নি।
গায়ের রং কালো দেখলেই মনে হয় তাদের শক্তি বেশি, অস্ত্র আছে, খারাপ কিছু করে ফেলবে ইত্যাদি ইত্যাদি পুলিশের মনে হতেই থাকে। ডেরেক চওভিন নামের সাবেক পুলিশ অফিসার হাঁটু গলায় চেপে ধরে রাখলেন ৮ মিনিট ৪৬ সেকেন্ড। জর্জ ফ্লয়েড বারবার বলেছিলেন তিনি নিশ্বাস নিতে পারছেন না। শেষের ২ মিনিট ৪৬ সেকেন্ড তিনি সংজ্ঞাহীন ছিলেন। মারা গেছেন তখনই। জাল ২০ ডলার দেওয়ার জন্য আইনানুগ শাস্তির অধিকার হলো না জর্জের। এটা ২০২০ সাল। ডেরেক চওভিন থার্ড ডিগ্রি মার্ডার চার্জ পেয়েছেন; আর রেকর্ডিং এর কল্যাণে ঘটনাটি দেখলো পুরো পৃথিবী।
'বর্ণবাদ তত দিন থাকবে, যত দিন সাদা গাড়িগুলোর চাকা কালোই থাকবে। দুর্ভাগ্য বোঝাতে কালো, আর শান্তি বোঝাতে সাদার ব্যবহার যত দিন থাকবে, তত দিন থাকবে বর্ণবাদ। বিয়ের পোশাক সাদা, আর শবযাত্রায় কালো পোশাকের চল যত দিন থাকবে, তত দিন থাকবে বর্ণবাদ। করখেলাপি বা মন্দ লোকেদের যত দিন সাদা নয়, কালোতালিকাভুক্ত করা হবে, তত দিন বর্ণবাদ থাকবে। এমনকি স্নুকার খেলায়ও কালো বলটিকে গর্তে না ফেলা পর্যন্ত কেউ জিততে পারে না, আর সাদা বলটিকে বরাবর টেবিলের ওপরই থাকতে হয়।’
ওপরের উক্তিটি চমকে দেওয়ার মতো। উক্তিটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জিম্বাবুয়ের প্রয়াত নেতা রবার্ট মুগাবের হিসেবে প্রচার করা হলেও এর উৎসটি পাওয়া যায়নি। উৎস যা-ই হোক, যে-ই এই কথা বলে থাকুন না কেন, উক্তিটি নিঃসন্দেহে ভাবনার দাবি রাখে।
'ব্ল্যাক লাইফ মেটারস’ নামের আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল এমন অমানবিক দুর্ঘটনার পরে ২০১৩ সালে। তারপরও লঘু পাপে মানুষ নৃশংসভাবে চলে যাচ্ছে, বিচারের দাবি নিভৃতে কেঁদে চলেছে। খড়ের গাদায় আগুন লাগলে কী হয়, তার উত্তর সহজ—সব পুড়ে ছাই। কিন্তু কথা হলো, খড়ের গাদায় আগুন লাগে কখনো কখনো অনেকটা অজান্তেই। হুবহু যুক্তরাষ্ট্রে যেমনটা হয়েছে,আর কি। উত্তাল হয়েছে আমেরিকা; শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ রূপ নিয়েছে সহিংসতায়।
ইদানীংকালে আমেরিকা কি ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত হচ্ছে? কথাটি নিতান্তই অবান্তর, তবে এর চরিত্র ক্রমশ যে কর্তৃত্ববাদী হয়ে উঠছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। পুলিশের হাতে জর্জ ফ্লয়েডের হত্যার পর সারা দেশে যে প্রতিক্রিয়া হয়েছে, তার গুরুত্ব অনুধাবনের বদলে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ‘বিপুল ক্ষমতা প্রয়োগের’ কথা শুরু থেকেই বলছেন এবং তা করে ও দেখাচ্ছেন।
দেখাই গেলো, সামরিক শক্তির উপস্থিতি নাগরিক বিক্ষোভ দমনে সক্ষম হয়নি, বরং তা বৃদ্ধি পেয়েছে। ট্রাম্প ও রিপাবলিকান নেতৃত্ব এখনো এ কথা স্বীকার করতে পারেননি যে যুক্তরাষ্ট্রের পুলিশি ব্যবস্থা গভীরভাবে বর্ণবাদী। এ দেশের কালো ও বাদামি মানুষেরা এই ব্যবস্থার শিকার। আমেরিকান জার্নাল অব পাবলিক হেলথের এক গবেষণা অনুসারে আমেরিকায় শ্বেতকায়দের তুলনায় কৃষ্ণকায়দের পুলিশের হাতে নিহত হওয়ার আশঙ্কা তিনগুণ বেশি। প্রতিবছর এ দেশে পুলিশের হাতে কৃষ্ণকায়দের বিরুদ্ধে এক হাজারের বেশি অত্যধিক শক্তি প্রয়োগের ঘটনা ঘটে, যার জন্য অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কোনো পুলিশকে বিচারের সম্মুখীন হতে হয় না।
তাহলে কি অবস্থা কিছুতেই বদলাবে না, এই প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। মিডিয়াম নামক ওয়েবসাইটে এক নিবন্ধে তিনি বলেছেন, রাজনৈতিক পরিবর্তন ছাড়া প্রকৃত পরিবর্তন আসবে না। ‘পরিবর্তনের পক্ষে যে দাবি, তা বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন আইনি ব্যবস্থায় ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবহারে সুনির্দিষ্ট পরিবর্তন। কোনো গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সেই পরিবর্তন সম্ভব, যখন আমাদের এই সব দাবির প্রতি সহমত পোষণ করে, এমন সরকার নির্বাচিত করা।’
ডোনাল্ড ট্রাম্পের জমানায় যুক্তরাষ্ট্র তার আন্তর্জাতিক প্রভাববলয় অনেকটাই সংকুচিত করেছে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ফোরামে নিজের শক্তির ক্ষয় করে ফেলছে দেশটি। এই মহামারির সময়ে বিশ্বকে নেতৃত্বও দিতে পারেনি। আর গত ২৫ মে জর্জ ফ্লয়েডের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে এক ভয়াবহ অস্থির সময়ে প্রবেশ করল। এই সময়ে এসে এমনকি বিশ্বের বহু দেশে নানা ফ্রন্টে যুদ্ধ করা মার্কিন সেনাদের নিজ দেশে মোতায়েনের মতো প্রস্তাব পর্যন্ত দিয়ে দিলেন দেশটির প্রেসিডেন্ট। এই প্রস্তাব ভয়াবহভাবে নাড়িয়ে দিয়েছে সবাইকে।
এই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র কেন, বিশ্বের যেকোনো দেশই অস্থির হয়ে উঠতে পারে, যেকোনো ঘটনায়। প্রথম ও প্রধান কারণ, মহামারি। দেশটির স্বেচ্ছাবন্দিত্ব মেনে নেওয়া মানুষ তীব্র বেকারত্বের সাথে অর্থনৈতিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পুরাপুরি বিস্ফোরণোন্মুখ হয়ে আছে। ফলে এমন অস্থিরতা যখন–তখন যেকোনো স্থানেই জন্ম নিতে পারে। মোদ্দা কথা হচ্ছে, খড়ের গাদা প্রস্তুত হয়েই আছে। এই খড়ের গাদাটি শুকনোও হতে পারে, আবার হতে পারে ভেজাও। ভেজা হলে ধোঁয়াই সার, মাঝখান থেকে কিছু লোকের চোখ জ্বালা করা ছাড়া কিছুই হবে না। আর শুকনো হলে রক্ষা নেই, দাউ দাউ আগুনে সব পুড়ে ছাই হওয়াটা সময়ের ব্যাপার মাত্র। যুক্তরাষ্ট্রে যে তোলপাড় দেখা যাচ্ছে, তা কি ধোঁয়ার কারণে সৃষ্ট, নাকি প্রকৃতই আগুন, তা সময়ই বলে দেবে।
আজ সবাই এক বৈশ্বিক মহামারির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এমন বৈশ্বিক মহামারি দেখা গিয়েছিল ১৯১৮ সালেও। এই জুন যেমন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বিশেষ হয়ে উঠেছে একজন জর্জ ফ্লয়েডের হত্যা এবং সেই সূত্রে নাগরিক আন্দোলনের বড়সড় ঢেউয়ের কারণে, ১০২ বছর আগের সেই জুনও ছিল দেশটির জন্য বিশেষ। আজকেরটি যদি নেতিবাচক অর্থে হয়, তবে ১৯১৮ সালের জুন ছিল দেশটির জন্য ভীষণভাবে ইতিবাচক।
১৯১৮ সালের জুন শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই বিশ্বমঞ্চে নতুন মহাশক্তি হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের আবির্ভাব ঘটে। সেই জুনের ১ তারিখ যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি প্রথম বিশ্বযুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। ইউরোপীয়দের মধ্যে বছরের পর বছর ধরে চলা সংঘাতে নিজেকে জড়িয়ে বিশ্বকে নিজের আগমনবার্তাটি জানিয়ে দেয় দেশটি। যুদ্ধের ময়দানে যুক্তরাষ্ট্রের এই সক্রিয় হয়ে ওঠাটা মহাযুদ্ধের ফল নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখে।
শত বছর আগের মহামারির সময়ে যুক্তরাষ্ট্র আন্তর্জাতিক পরিসরে প্রবেশ করছে সৈনিক ও সেনাপতি হিসেবে। আর আজকের মহামারির সময়ে যুক্তরাষ্ট্র নিজেকে বিচ্ছিন্ন করছে আন্তর্জাতিক পরিসর থেকে। শত বছর আগের সেই স্প্যানিশ ফ্লুয়ের সময়েই মূলত বিশ্ব দুটি রাজনৈতিক মেরুর জন্ম দেখে। চেরোনোবিলের আনবিক কেন্দ্র বিস্ফোরণ ও আফগানিস্তানে মুসলিমদের কাছে পরাজয়ের মতো মুখ্য ঘটনার ফলশ্রুতিতে ১৯৯০ সালে তৎকালীন পরাশক্তি সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর এর এক মেরু বিলোপ পায়, এরপর থেকেই বিশ্ব মেনে নেয় অবশিষ্ট মেরু যুক্তরাষ্ট্রের একচেটিয়া শাসন।
কিন্তু ২০০৮ সালের ধকল সয়ে এই সময়ে এসে এই যুক্তরাষ্ট্রই যেন আবার নতুন কোনো গল্পের ইঙ্গিত দিচ্ছে। অজান্তেই ভাবনার কোণে তখন উঁকি দিতে শুরু করে একটা ঐতিহাসিক সত্য| পরাশক্তিরও পতন আছে, এবং তা যুগে যুগে দেখাও গেছে|
লেখক: আর্থিক বিশ্লেষক; কানাডা প্রবাসী
- বিষয় :
- জর্জ ফ্লয়েড
- যুক্তরাষ্ট্র