ঢাকা সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২৬

কবি রাজ্জাক কিংবা ব্রহ্মপুত্রের বাউকুড়া বাতাস

কবি রাজ্জাক কিংবা ব্রহ্মপুত্রের বাউকুড়া বাতাস
×

মু. আ. রাজ্জাক (বাঁ থেকে দ্বিতীয়)। ছবি ফেসবুক থেকে সংগৃহীত

শেখ রোকন

প্রকাশ: ১৭ জুন ২০২০ | ০৫:০৪ | আপডেট: ১৭ জুন ২০২০ | ০৫:৩৪

গতকাল সকাল থেকে মনটা দ্রবীভূত। প্রমিত বাংলায় এভাবে বলা যায় বটে, তাতে সবটা বলা হয় না। ব্রহ্মপুত্র অববাহিকায় আমরা বলি 'বাউকুড়া মন'। ভাওয়াইয়া গানে আছে 'বাউকুড়া বাতাস'। নদীর চরে চরে ঘূর্ণি দিয়ে উদ্দেশ্যহীন ঘুরে বেড়ায়। সকালে ফোনটি পাওয়ার পর থেকে মনটা বাউকুড়া বাতাসের মতো রৌমারী-ঢাকায় উদ্দেশ্যহীন ঘুরে বেড়াচ্ছে। ব্রহ্মপুত্রের বাউকুড়া বাতাসের মতো; নদীর ছোঁয়ায় ভেজা ভেজা, চরের শুষ্ক বালু মাখা।

সকালে ঘুম ভেঙে দেখি সেলফোনে দুটো মিসডকল, একই নম্বর থেকে। কলব্যাক করে দেখি, স্নেহভাজন পলাশ। বুকটা তখনই ধক করে উঠেছিল এবং যা আশঙ্কা করেছিলাম, তাই। তার পিতা মু. আ. রাজ্জাক সকাল সাড়ে আটটার দিকে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন। কয়েকদিন আগে বন্ধু রফিকুল ইসলাম সাজু ফোনে বিষণ্ণ কণ্ঠে বলেছিলেন 'গুরুর অবস্থা ভালা নোয়ায় গো।' তার আগের কয়েকদিন ধরে শয্যাশায়ী, কথা বলতে পারছেন না।

রৌমারী বা কুড়িগ্রাম জেলায় যারা সাহিত্য, সাংবাদিকতা, ক্রীড়া, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে যারা জড়িত, তাদের অনেকের কাছে 'গুরু' মানে মু. আ. রাজ্জাক। আমি তাকে ডাকতাম 'চাচা'। গুরুজন, কিন্তু বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক। রক্তের সম্পর্ক না থাকলেও হয়ে উঠেছিলেন আত্মার আত্মীয়। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে আসার আগ পর্যন্ত সন্ধ্যায় বাজারে যে দুটি দোকানে আমরা আড্ডা দিতাম, তার একটি রাজ্জাক চাচার হোমিও ডিসপেন্সারি। অপরটি ইসলামীয়া লাইব্রেরি, প্রিয় মোল্লা ভাইয়ের বইয়ের দোকান। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীনও স্বল্প সময়ের জন্য বাড়িতে গেলে এই দুইটি জায়গায় হাজিরা না দিয়ে ফেরা হতো না।

কলেজে পড়ার সময় বন্ধুরা মিলে একটি বুদ্ধিবৃত্তিক সংগঠন গড়ে তুলেছিলাম, নাম 'রেনেসাঁ'। যতদূর মনে পড়ে, সেই সংগঠন গড়তে গিয়ে তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা শুরু। তাকে রেনেসাঁর উপদেষ্টা হিসেবে চেয়েছিলাম আমরা। তিনি সানন্দে রাজী হয়েছিলেন। পিতার বয়সী হওয়া সত্ত্বেও তার ভেতরের তারুণ্য মুগ্ধ করেছিল আমাদের সবাইকে। তখনই দেখতাম, মধ্যবয়সেও তিনি তরুণদের সঙ্গে টেক্কা দিতে পারেন উদ্যোম ও উদ্যোগে। আমাদের সঙ্গে সময় দিচ্ছেন আমাদের অনেকের চেয়ে বেশি উৎসাহ নিয়ে। বিজয় দিবস উপলক্ষে প্রথম প্রকাশনা বের করেছিলাম আমরা- 'বিজয় আজি জাগ্রত দ্বারে'।


প্রকাশনা মানে মূলত মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক ছোট লেখা, কবিতা, গল্প। আর কিছু শুভেচ্ছা বাণী। 'মূলকপি' কম্পোজ করার পর হাজার ফটোকপি। মনে আছে, সারা রাত ধরে তিনি নিজেই প্রচ্ছদ বানিয়েছিলেন। আমি কম্পোজের দোকানে। উপজেলা মোড়ে রাজু ভাইয়ের ফটোকপির দোকানে রাত জেগে আছে আরেকজন। প্রচ্ছদ পিনআপ করে ১২ বা ১৬ পৃষ্ঠার 'প্রকাশনা'। আমার সম্পাদনায় প্রথম প্রকাশনা। এ নিয়ে আমার সঙ্কোচের বিহ্বলতা কম ছিল না। কিন্তু রাজ্জাক চাচা সামনে ঠেলে দিয়েছিলেন। বস্তুত সবসময় তাই করেছেন। কী সাহিত্যে, কী সাংবাদিকতায়, কী সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে; স্নেহভাজনদের সামনে ঠেলে দিয়ে নিজে পেছনে থাকতে চাইতেন। তখন ততটা মনে হয়নি; কিন্তু যত বয়স বেড়েছ, দেশ-বিদেশের অভিজ্ঞতা হয়েছে, ততই বুঝতে পেরেছি, এই গুণ কতটা বিরল। হৃদয় কতটা প্রসারিত হলে মানুষ এমন হয়।

রাজ্জাক চাচা একজীবন কাটিয়েছেন ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়িয়ে। ষাটের দশকে যখন রংপুরের কারমাইকেল কলেজে পড়তেন, তখন আইউব বিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন। তখনই রংপুর থেকে তার কবিতার বই প্রকাশ হয়েছিল 'শান্তি নাই'। কারমাইকেল কলেজে এক সভায় আইউব-বিরোধী কবিতা পড়ার সময় আইউব খানের তখতে লাথি মারার কথা বলতে গিয়ে কীভাবে লাথি মেরে সামনের টেবিল ফেলে দিয়েছিলেন, তা প্রায়শই বলতেন এবং প্রত্যেকবারই সমান আনন্দ তার চোখমুখে ঝলমল করতো। সম্ভবত তখন থেকই সাধারণ মানুষের কাছে তিনি 'কবি রাজ্জাক' বলে পরিচিত হন।

রৌমারীর এখনকার বড় শহীদমিনারের বয়স খুব বেশি নয়। নব্বইয়ের দশকের দ্বিতীয়ার্ধে স্থাপিত। তার আগে 'পুরাতন' শহীদ মিনার স্থাপিত হয়েছিল পাকিস্তান আমলে। শহীদ স্মৃতি ক্লাবের সামনে। ঊনসত্তরের উত্তাল দিনগুলোতে পুলিশ-গোয়েন্দাদের চোখ এড়িয়ে তারা কীভাবে শহীদ মিনারটি রাতের আঁধারে স্থাপন করেছিলেন, সেই গল্পও তার প্রিয় ছিল। একাধিকবার লিখেছেন বিস্তারিত।

রাজ্জাক চাচা সারাজীবন মানুষের সঙ্গে থাকতে চেয়েছেন এবং পেরেছেন। অবশ্য সেটা বহুলাংশে সম্ভব হয়েছিল তার স্ত্রী, আমাদের মিনারা খালার ঔদার্যের কারণে। রাজ্জাক চাচার বাড়ি ছিল সরাইখানার মতো। প্রতিদিন নানা ধরনের অতিথি আসতো। তার স্ত্রী সবাইকে হাসিমুখে আপ্যায়ন করতেন। গতকাল সকাল থেকে মিনারা খালা ও তার দুই সন্তান পলাশ ও শিমুলের কথা মনে পড়ছে। মাথার ওপর ছাদ ঠিকই থাকবে, কিন্তু ছাদেরও ওপরের আকাশটা যে সরে গেল!

রাজ্জাক চাচা, সুনির্দিষ্ট কোনও পেশায় জড়িত ছিলেন না। হোমিওপ্যাথি ডাক্তারিও মাঝে মাঝে ধরতেন ও ছাড়তেন। দোকান ও বাড়ি ভাড়া থেকে কিছু অর্থ আসতো। রৌমারী বাজারে পৈত্রিক বাড়িতে থাকতেন। কাঠের তৈরী এমন দোতলা বাড়ি আজকাল দেখা যায় না। পরে ভেঙে টিনের বাড়ি করেছিলেন। পৈত্রিক জমিজমা ছিল গ্রামের বাড়িতে, বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত এলাকায়। জিঞ্জিরাম নদীর তীরে। কিন্তু ধারাবাহিকভাবে যা করতেন, তা হচ্ছে যে কোনও সামাজিক উদ্যোগে ঝাঁপিয়ে পড়া। কেউ শুধু একটু তাল দিলেই হলো।

একবার কী খেয়াল চাপলো, ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান নির্বাচন করবেন। আমি বয়সে অনেক ছোট, তবু নিষেধ করলাম। বললাম, যারা আপনাকে উস্কাচ্ছে, সময়মতো তারা সঙ্গে থাকবে না। তিনি তবুও ভোটে দাঁড়ালেন। আনারস মার্কা। নির্বাচনী মিছিল হবে। তার গ্রামের বাড়ি থেকে রৌমারী বাজার পর্যন্ত। শত শত মানুষ খাওয়া-দাওয়া করে মিছিল শুরু হলো। বাজারের কাছে আসতে আসতে দেখা গেল ৫০-৬০ জনও নেই। বললাম, দেখলেন তো! উনি হাসতে হাসতে বললেন- এক বেলা খাইয়ে মানুষ তো চেনা হলো!

একবার ঢালাওভাবে কিছু একটা লিখেছিলেন কোথাও। তার বিরুদ্ধে মিছিল বের হলো, কুশপুত্তলিকা দাহ হলো। তার বন্ধুস্থানীয় আরেকজন সাংবাদিক এ নিয়ে তার প্রতিক্রিয়া জানতে গিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন- কুশপুত্তলিকা বানাক ক্ষতি কী? মিছিল করার সময় কাঁধে নিয়ে তো বেড়িয়েছে! তিনি এমনই মজার ছিলেন। স্বল্পতে রেগে যেতেন, আবার মূহুর্তেই রাগ পড়ে গিয়ে প্রাণখোলা হাসতে পারতেন। তার ভেতরে একজন চিরশিশু বাস করতো।

রাজ্জাক চাচা বিভিন্ন পত্রিকার স্থানীয় প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করলেও থিতু হতে পারেননি স্বাধীনচেতা স্বভাবের কারণে। পত্রিকা সম্পাদনা বরং পছন্দ করতেন বেশি। করেছেনও কয়েকটি স্থানীয় পত্রিকায়। কিন্তু 'নিজস্ব' যেসব আইডিয়া লালন করতেন, তা ধারনাগত দিক থেকে মজার হলেও বাস্তবায়ন সহজ ছিল না। যেমন সম্প্রতি তার মাথায় চেপেছিল  'ছন্দে ছন্দে লেখা পকেট সাময়িক পত্রিকা' প্রকাশের ভূত। নামও ঠিক করেছিলেন 'নদীর নাম জিঞ্জিরাম'। আমাকে ফোন করে বলেছিলেন, এটা 'বিশ্বের প্রথম'  ছন্দ-পকেট পত্রিকা। তার ধারনা ছিল, এই পত্রিকা লোকজন পকেটে রাখবে ও সারাদিন কাজের ফাঁকে ফাঁকে পড়বে। বলছিলেন, আমাকেও নদী নিয়ে একটা লেখা দিতে হবে যার পুরোটাই হতে হবে ছন্দে ছন্দে।

ফেসবুকে পত্রিকাটিতে লেখা পাঠানোর ঘোষণাও দিয়েছিলেন ছন্দে ছন্দে। যতদূর মনে পড়ে- 'এক পৃষ্ঠায় কম্পোজ করে/ সম্পাদক বরাবরে/ পাঠাবেন রৌমারী বাজারে'। বস্তুত ফেসবুকে সম্প্রতি সবকিছু ছন্দে ছন্দে লিখতেন। গত ফেব্রুয়ারিতে রংপুরে গিয়েছিলেন চিকিৎসার জন্য। তারপর ঢাকায় এসেছিলেন। অপেক্ষাকৃত সুস্থ্য হয়ে রৌমারীতে ফিরে গত ১০ মে ফেসবুকে লিখেছিলেন- 'লিখতে বসলে/ হাতে লাগে যে কাপন/ অজান্তেই- থেমে যায় লিখন।/ জানিনা- থেমেই যাবে কি'না স্পন্দন/ হাঁটি-হাঁটি পায়ে-পায়ে/ মৃত্যুর মিছিলে যাচ্ছি এগিয়ে/ হয়তো শীঘ্র আসছে ধেয়ে/ যমদূত- ঘটাতে চির ছন্দ পতন।' আমাদের দুর্ভাগ্য সেই আশঙ্কাই সত্য হলো।

রাজ্জাক চাচা ছিলেন একটি প্রজন্মের সাংবাদিকতা, সাহিত্য, সংস্কৃতি চর্চার শেষ প্রতিনিধি। যারা প্রত্যন্ত এলাকায় থেকেও, আর্থিক, সামাজিক, রাজনৈতিক সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও সমাজ পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখতেন ও সচেষ্ট থাকতেন। তিনি সারাজীবন যে অস্থির ছিলেন, ব্রহ্মপুত্রের বাউকুড়া বাতাসের মতো, সেটা ছিল তার সৃষ্টি সুখের উল্লাস। যে পরিসরেই হোক না কেন, তাকে ঘিরে আমরা অনেকে যে খড়কুটার মতো ঘুরতাম, সেই সৌভাগ্য কতজনের হয়?

রাজ্জাক চাচাকে আমার পক্ষে বিদায় বলা কঠিন। তাকে ঘিরে যে স্মৃতি ও সখ্যতা, তা অমোচনীয়। আক্ষেপ এতটুকুই শেষ দিকে তার প্রতি হয়তো আরও বেশি সময় ও মনোযোগ দিতে পারতাম। রুজী অধম আমি পারিনি। কয়েক বছর আগে চিকিৎসার জন্য ঢাকায় এলেন। কয়েকবার দেখা করা ছাড়া আর কিছু করতে পারিনি। এবার যখন এলেন, আমি ভিসা-দূতাবাস দৌড়াদৌড়িতে ব্যস্ত। তারজন্য রক্তদাতা যোগাড় করে দিতে পারলেও, সশরীরে গিয়ে দেখা করতে পারিনি। এই আক্ষেপ আমার সহজে যাবে না।

জীবন নদীর ওপারে ভালো থাকবেন, ব্রহ্মপুত্র নদীর বাউকুড়া বাতাস!

লেখক ও গবেষক; মহাসচিব, রিভারাইন পিপল


আরও পড়ুন

×