ঢাকা বুধবার, ২২ জুলাই ২০২৬

হিরোশিমা ১৯৪৫: নিঃশব্দ আলোর ঝলকানি

হিরোশিমা ১৯৪৫: নিঃশব্দ আলোর ঝলকানি
×

কাজী আখতারউদ্দিন

কাজী আখতারউদ্দিন

প্রকাশ: ০৬ আগস্ট ২০২০ | ০৬:৫৩ | আপডেট: ০৬ আগস্ট ২০২০ | ০৭:৪৪

৬ আগস্ট ১৯৪৫। রেভারেন্ড মিস্টার তানিমোতো সেদিন ভোর ৫ টায় ঘুম থেকে উঠেছিলেন। প্রাতরাশ সেরে৬টার আগেই মিস্টার মাতসুয়োর বাড়ির দিকে রওয়ানা দিলেন। পরিষ্কার উষ্ণ সকাল দেখে মনে হচ্ছিল দিনটা গরমেই কাটবে। কয়েক মিনিট পর দুজনেই গির্জার দিকে হেঁটে চললেন। এমন সময় এয়ার রেইড সাইরেন একবার বেজে উঠেই একমিনিট পর থেমে গেল। ওরা কোন প্লেন আসার শব্দ পেলেন না। সকাল তখনও নিরব, সুন্দর এবং চমৎকার।

তারপর হঠাৎ আকাশে এক বিশাল আলোর ঝলকানি দেখা দিল। মিস্টার তানিমোতোর পরিষ্কার মনে আছে যে, আলোর ঝলকটা শহরের পূব থেকে পশ্চিমে পাহাড়ের দিকে চলে গেছে। মনে হচ্ছিল যেন সূর্যের একটি চাদর। দুজনেই ভিষণ আতঙ্কে কেঁপে উঠলেন।মিস্টার তানিমোতো দ্রুত কয়েক পা এগিয়ে বাগানের বড় বড় দুটো পাথরের মাঝে শুয়ে পড়লেন। প্রথমে যা মনে হচ্ছিল ধুলার মেঘ, তা আরো কালো হয়ে চললো। 

মিস্টার তানিমোতোর মতো আর যেসব প্রত্যক্ষদর্শী ‘হিবাকুশা’ মাটিতে ছিল, তারাও দেখলো যে, পুরো আকাশজুড়ে একটা পিকা তার পরক্ষণই একটা ডন, অর্থাৎ উজ্জ্বল একটি আলোর ঝলক আর তারপরই বিকট গুম গুম শব্দ ভেসে এল। সকাল আটটা পনেরো মিনিটে হিরোশিমার আকাশে পারমাণবিক বোমাটা ঝলসে উঠেছিল।

ম্যানহাটান প্রজেক্ট ও বোমা তৈরির পেছনের কথা বলি। ১৯৩৮ সালে জার্মান রসায়নবিদ অটো হান এবং ফ্রিজ স্ট্রাসম্যান পারমাণবিক বিদারণ প্রক্রিয়া আবিষ্কার করার পর পারমাণবিক বোমা তৈরির একটি তাত্ত্বিক ধারণা পাওয়া গেল। জার্মানরা পারমাণবিক বোমা আগেই তৈরি করে ফেলতে পারে, এই আশঙ্কা থেকে উদ্বাস্তু জার্মান বিজ্ঞানীদের অনুরোধে বিজ্ঞানী আইনস্টাইন এবং স্লির্জাড যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টকে তাদের আশঙ্কার কথা জানিয়ে একটি পদক্ষেপ নেওয়ার অনুরোধ জানালেন। ফলে ১৯৩৯ সালের শেষদিকে যুক্তরাষ্ট্রে বিষয়টি নিয়ে গবেষণা শুরু হল। এরপর ১৯৪১ সালের শেষে ব্রিটিশ মড কমিটির রিপোর্ট থেকে জানা গেল যে, বোমা তৈরির জন্য কয়েক টন প্রাকৃতিক ইউরেনিয়াম এবং হেভি ওয়াটারের মতো নিউট্রন মডারেটার দরকার নেই, কেবল ৫ থেকে ১০ কিলোগ্রাম আইসাটোপ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম-২৩৫ হলেই চলবে। ফলে বোমা তৈরির কাজে গতি এল। একটি চেইন রিয়েকশন ব্যবহার করে পারমাণবিক বোমা তৈরির সম্ভাব্যতা যাচাই করার জন্য প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট একটি ইউরেনিয়াম এডভাইজারি কমিটি গঠন করলেন।  

যুক্তরাজ্য এবং কানাডার সমর্থনে ম্যানহাটান প্রজেক্টের কাজ শুরু হল। পরমাণু পদার্থবিদ রবার্ট অপেনহেইমার লস আলামসে মূল বোমা তৈরির কাজ শুরু করলেন। এখানে দুইধরণের বোমা তৈরি হল। একটিতে বিরল আইসোটপ ইউরেনিয়াম-২৩৫ এবং অপরটিতে প্লুটোনিয়াম ব্যবহার করে আরো শক্তিশালী তবে বেশ জটিল অন্তস্ফোটন ধরণের পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করা হল। ৬ আগষ্ট পারমাণবিক বোমা মিশনের প্রাথমিক টার্গেট ছিল হিরোশিমা। তিনিয়ান দ্বীপ থেকে এনোলা গে নামে একটি বি-২৯ বিমানে বোমাটি নিয়ে পাইলট তিবেত রওয়ানা দিলেন।  

সকাল ০৭:০৯ হিরোশিমায় অলক্লিয়ার সাইরেন বেজে উঠতেই লোকজন ঘরের বাইরে বের হল। সময়সূচী মোতাবেক তিবেত হিরোশিমার উপর পৌঁছে সকাল ০৮:১৫ মিনিটে ৬৪ কিলোগ্রাম ওজনের লিটল বয় বোমাটি ছেড়ে দিলেন। বোমার প্রচন্ড বিস্ফোরণ আর অগ্নিঝড়ে প্রায় ৭০,০০০ থেকে ৮০,০০০ হিরোশিমাবাসীর মৃত্যু হল। আর আহত হল ৭০,০০০ মানুষ। ১২ বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে বিধ্বস্ত হয়ে চারদিক কালো ধোঁয়ায় ঢেকে অন্ধকার হয়ে গেল।

তিনদিন পর ৯ আগষ্ট বক্সকার নামের আরেকটি বি-২৯ বিমানে প্লুটোনিয়াম ফ্যাট ম্যান বোমাটি নিয়ে নাগাসাকির উপর সকাল ১১:০১ ছেড়ে দেওয়া হল। প্লুটোনিয়াম বোমাটি ছিল মাত্র ৫ কিলোগ্রাম ওজনের। এখানেও ৩৫,০০০-৪০,০০০ মানুষের মৃত্যু হল এবং ৬০, ০০০ আহত হল। পরিণতিতে জাপান ১০ আগষ্ট ১৯৪৫ সালে আত্মসমর্পণ করলো। এর সাথে শুরু হয়ে গেল পারমানবিক যুগ, যা বিশ্বব্যাপী ঠান্ডাযুদ্ধের রুপ নিল।

হিরোশিমায় বোমা ফেলার পর প্রেসিডেন্ট ট্রুম্যান নতুন অস্ত্র ব্যবহার সম্পর্কে একটি ঘোষণা দিলেন: ‘ আমরা ঈশ্বরকে ধন্যবাদ জানাই যে, জার্মান পারমাণবিক বোমা প্রজেক্টটি ব্যর্থ হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র এবং এর মিত্ররা ইতিহাসের সর্ববৃহৎ বৈজ্ঞানিক জুয়ায় দুই বিলিয়ন ডলার বাজি রেখে জিতেছে।’ তারপর তিনি জাপানকে সতর্ক করে বললেন যে, ‘ আপনারা যদি আমাদের শর্ত মেনে না নেন, তাহলে আকাশ থেকে আরো ধ্বংসের বৃষ্টি আশা করবেন। এরকম ব্যাপার আর কখনও পৃথিবীতে ঘটেনি।’ 

যখন হিরোশিমার উপর বোমাটি ফেলা হল, তখন আইনস্টাইনের আশঙ্কার চুড়ান্ত বাস্তবায়ণ হল। স্বৈরশাসক বা গণতান্ত্রিক, যার হাতেই থাকুক, বোমার বিষয়ে আতঙ্কটি তাঁর বিবেককে অত্যন্ত পীড়িত করলো। আশু কর্তব্য মনে করে তিনি ১৯৩৯ সালে প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টকে চিঠি লিখেছিলেন, কেননা তাঁর আশঙ্কা ছিল নাৎসীরা আগেই পারমাণবিক বোমা তৈরি করে পুরো পৃথিবী নিয়ন্ত্রণ করবে। 

২০১৭ সালে এটমিক হেরিটেজ ফাউন্ডেশনের প্রেসিডেন্ট, সিনথিয়া কেলি একটি সা্ক্ষাতকারে ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক পত্রিকাকে বলেছিলেন, আইনস্টাইনের বিখ্যাত আবিষ্কারটি যে, শক্তি এবং ভর একই জিনিসের বিভিন্ন রুপ, এই তত্ত্বটি এধরণের জিনিস সৃষ্টির মঞ্চ তৈরি করলেও ‘ তিনি অবশ্যই তাঁর থিওরীকে একটি অস্ত্র হিসেবে দেখেননি।’ 

আইনস্টাইন জনতেন, একবার এই ভয়ঙ্কর শক্তিটি সৃষ্টি করলে এটাকে আর নিয়ন্ত্রণে রাখা যাবে না। কোন কোন বিজ্ঞানী এমন কথাও বলেছেন, একবার পারমাণবিক বিক্রিয়া শুরু হলে, এটা পুরো বায়ুমন্ডলে আগুন ধরিয়ে দিতে পারে এবং আমাদের গ্রহটি অগ্নিশিখার মেঘে ঢাকা পড়ে যাবে। আইনস্টাইন নিশ্চিত ছিলেন যে, পৃথিবী একটি বিশাল ভিন্ন স্থানে পরিণত হবে-এমন একটি স্থান যার উপরে ডেমোক্লিসের তরবারিটি চিরকালের জন্য অত্যন্ত  চিকন একটি সুতা থেকে ঝুলে থাকবে। তিনি হয়তো ভেবেছিলেন, এত এত কাঁচি যেখানে রয়েছে, সেরকম একটি পৃথিবীতে এমন একটি সুতা আর কতকাল এই ভার সইতে পারবে?

পরবর্তীতে আলফ্রেড ওয়ার্নারের সাথে একটি সাক্ষাতকারে আইনস্টাইন বলেন- ‘জানি না তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ কিভাবে হবে, তবে চতুর্থ বিশ্বযুদ্ধে কি ব্যবহার করবে তা আমি আপনাকে বলতে পারি-আর সেটা হচ্ছে পাথর।’ (লিবারেল জুডাইজম (১৯৪৯) সাময়িকী)।

রাসেল-আইনস্টাইন মেনিফেস্টো নামে একটি ঘোষণাপত্র ৯ জুলাই ১৯৫৫ লন্ডনে প্রকাশিত হয়। এই ঘোষণায় সম্ভাব্য পারমাণবিক যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট ভয়াবহ পরিণতির কথা এবং একই সাথে সতর্কবাণী উচ্চারণ করা হয়। আর পৃথিবীর সকল দেশের জনগণ যদি একসাথে মিলেমিশে শান্তিতে বসবাস করার জন্য কোন উপায় খুঁজে বের না করেন, তাহলে যে ভয়ঙ্কর অবস্থা হতে পারে, সে সম্পর্কেও ভবিষ্যৎবাণী করা হয়। আইনস্টাইন মানবতার উচ্চতর প্রবৃত্তির প্রতি আবেদন জানান, পৃথিবীর সকলকে ছোটখাট ভেদাভেদ আর ঝগড়াবিবাদ ভূলে করে জ্ঞান ও সুখের অন্বেষণ করার আহ্বান জানান। তিনি ভবিষৎবাণী করে বলেন, ‘ যদি আপনারা তা করতে পারেন, তবে একটি নতুন স্বর্গের পথ আপনাদের সামনে খুলে যাবে আর যদি তা না করতে পারেন, তাহলে আপনাদের সামনে রয়েছে বিশ্বজনীন মৃত্যুর ঝুঁকি।’  

উল্লেখ্য যে, আলামোগোর্ডোতে প্রথম পারমাণবিক বোমাটির পরীক্ষামূলক বিস্ফোরণ ঘটানোর পর, বিস্ফোরণের ভয়াবহ রুপ দেখে বোমার রুপকার রবার্ট অপেনহেইমার ভারতীয় প্রাচীন মহাকাব্য মহাভারতের একটি অংশ থেকে সংষ্কৃতে উচ্চারণ করেছিলেন- 'যদি এক হাজার সূর্য/ একসাথে আকাশে জ্বলে উঠে,/ তাহলে সেটা হবে সেই মহাশক্তিশালীর/ উজ্বল দীপ্তির মতো . . ./ আমি মৃত্যু হয়েছি/ জগত বিনাশক।' তাঁর প্রতিক্রিয়ার সাথে হিরোশিমার বোমা বিস্ফোরণের স্মৃতিচারণে জাপানি ‘হিবাকুশারা’ যা বলেছিলেন, তা বেশ মিলে যায়।  

প্রসঙ্গত, সুপ্রাচীনকালে রচিত মহাকাব্য মহাভারতে, হাজার হাজার বছর পূর্বে সংঘটিত প্রাগৈতিহাসিক যুদ্ধবিগ্রহ এবং এর পরিণতির চমকপ্রদ বিবরণ রয়েছে। ১৮৩০ সালে প্রথম যখন ইউরোপীয় ভাষায় মহাভারতের অনুবাদ হয়, তখন এতে বর্ণিত ঘটনাগুলো দেবতাদের মধ্যেকার অলীক কল্পনাসম্পন্ন যুদ্ধের বিবরণ হিসেবে বিবেচিত হয়। তখন এগুলো পাঠকের মনে তেমন রেখাপাত করেনি। তবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর, এগুলোর অদ্ভূত তথ্যোল্লেখগুলো এখন সহজেই বোধগম্য হচ্ছে।

মহাভারতের কোন কোন পর্বে একটি ‘লৌহ মারণ-বজ্রশেল’ বা বোমার বর্ণনা দেওয়া হয়েছে যা ‘দশহাজার সূর্যের উজ্জলতা’  নিয়ে বিষ্ফোরিত হয়েছিল এবং একটি বোমার বিস্ফোরণের ফলে হাজার হাজার শত্রুসেনা নিহত হয়। বোমাটি বিস্ফোরণের সাথে সাথে প্রচন্ড শব্দে উপরের দিকে মৃত্যুর মেঘ ছড়িয়ে পড়ে এবং এক ‘বিশাল রোদনিবারক ছাতার’ মতো খুলে যায়। নিচ থেকে সৈন্য, রথ,ঘোড়া এবং হাতি উপরে এর কেন্দ্রের দিকে টেনে নেয়। মাটিতে পড়ে থাকে পোড়া, বিকৃত শবদেহ। আহত হয়ে যারা বেঁচেছিল তাদের শরীর ভয়ঙ্করভাবে পুড়ে গিয়েছিল। তাদের চামড়া, চুল,নখ উপড়ে যায়, তারপর তারাও মারা যায়। সবশেষে একটি মাপের কথা বলা যায়। যেমন ‘লৌহ  বজ্রশেলের’ পরিমাপ-তিন কিউবিট যোগ ছয় ফুট। এটা ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নাগাসাকিতে যে দ্বিতীয় পারমাণবিক বোমাটি ফেলা হয়েছিল তার সমান। ১৯৪৫ সাল থেকে আমরা জানি যে, আমাদের বোমাগুলো বাস্তব। তাহলে প্রাচীন ভারতের যে বিধ্বংসী বোমাগুলোর পরিপূর্ণ বিবরণ দেওয়া হয়েছিল, সেগুলো কি শুধু লেখকের কল্পনা?

এই প্রশ্নের উত্তরে কেউ কেউ হয়তো লক্ষ করে থাকতে পারেন যে, পাকিস্তানের মোহেনজোদাড়োর ধ্বংস স্তূপ খনন করার সময় যে অসংখ্য কঙ্কাল আবিষ্কৃত হয়েছিল, তাতে যে পরিমাণ তেজস্ক্রিয়তার মাত্রা পাওয়া গিয়েছিল তা এযাবত যত মানুষ কিংবা প্রাণীর দেহাবশেষ পাওয়া গেছে তার মাঝে সবচেয়ে বেশি ছিল।

হতে পারে যে, এখন আমরা যাকে ইতিহাস বলি তার আগেও হয়তো কোন একটি সভ্যতা ছিল, যারা পারমাণবিক শক্তি আবিষ্কার করে তা ব্যবহারও করেছিল। আমাদের সংষ্কৃতি ছয় হাজার বছরের মধ্যে পারমাণবিক ক্ষমতা অর্জন করেছে এবং নতুন নতুন প্রত্নতাত্ত্বিক আবিষ্কারের ফলে সভ্য মানুষের অস্তিত্বের এধারণাটি ক্রমাগত পেছনের দিকে ঠেলে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। সেক্ষেত্রে বিবেচণা করতে হবে যে, একটি সম্পূর্ণ সভ্যতাক্রম প্রকাশ করতে মানবতার হয়তো আরো দশ কিংবা পনেরোগুণ কালের ব্যাপ্তি প্রয়োজন। এই সময়ের ব্যাপ্তিতে এই সভ্যতাগুলো ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল কিংবা পারমাণবিক যুদ্ধ অথবা মানুষের নিজের তৈরি বিপর্যয়ের কারণে নিজেরাই নিজেদের ধ্বংস করেছিল।

সবসময়ের একটি আতঙ্ক যে, মাত্র কয়েকমিনিটের আগাম সতর্কসঙ্কেতের (আদৌ যদি তা দেওয়া হয়) পর হঠাৎ নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়ার অনুভূতি থেকে সারা পৃথিবীর মানুষ এই চরম পরিস্থিতির জন্য নিজেদের মানিয়ে নিয়েছে। পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্রের দ্রুত বংশবিস্তার হচ্ছে এবং দিন দিন ঝগড়াটে দেশের সংখ্যা বেড়েই চলেছে। এখন ওরা নিজেরা পারমাণবিক বোমা বানাচ্ছে, সুতরাং এই আশঙ্কা উপশম হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম।

ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যাবে যে, এপর্যন্ত যত অস্ত্র আবিষ্কৃত হয়েছে তার সবগুলোই একাধিকবার ব্যবহৃত হয়েছে। পৃথিবী কিংবা মহাশূন্যে, অথবা মহাশূন্য থেকে পৃথিবীর উপর, যেখানেই প্রয়োগ করা হোক না কেন থার্মোনিউক্লিয়ার যুদ্ধের (হাইড্রোজেন বোমা) পরিণতি থেকে পৃথিবী মানবজাতির বিলোপের সম্ভাবনা থেকেই যায়। এই সমাপ্তি হয়তো হঠাৎ হয়ে যেতে পারে, যদি পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্রগুলো অধিক পরিমাণ শক্তি নিয়ে বিস্ফোরিত হয়, তাহলে পৃথিবীর আবর্তনের কোন একটি পরিবর্তন হয়ে যেতে পারে, হিমমুকুট-বরফের স্থায়ী আবরণ গলে যেতে পারে, বায়ুমন্ডলে বিষাক্ত গ্যাস সৃষ্টি হতে পারে কিংবা এগ্রহের চারপাশ ঘিরে থাকা নিরাপদ ওজন স্তরে ছিদ্র হতে পারে। হয়তো আরো বেদনাদায়ক পরিনতি হতে পারে- একটি ‘পারমাণবিক শীতকাল’, গবাদিপশুর মৃত্যু এবং খাদ্যশস্য নিঃশেষ হয়ে যাওয়া। এটা হতে পারে বায়ুমন্ডল কিংবা তাপমাত্রায় কোন ধরনের পরিবর্তন কিংবা তেজস্ক্রিয়তার পরিণতিতে। তারপর ডাইনোসরের মতো মানুষও এই গ্রহ থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে যেতে পারে।

আমরা কিসের মুখোমুখি হয়েছি, এই বোধ মানুষকে প্ররোচিত করছে তাদের কল্যাণে ভবিষ্যদ্বাণী করতে বর্তমানের জন্য এবং অতীত থেকে আমাদের ভবিষ্যতের জন্য। এই আগ্রহ এমনকি তাদের মধ্যেও লক্ষণীয়, যারা বিজ্ঞানের অগ্রগতি সম্পর্কে যথেষ্ট ওয়াকেফহাল। কালের বিচারে এটি এমন বেমানান, যে কেউ হয়তো মনে করবে বিষয়টিকে মধ্যযুগিয় কুসংষ্কারের নিম্ন পর্যায়ে নামিয়ে নেওয়াটাই সঠিক হবে। তবে ভবিষ্যৎবাণীর সাথে আমরা সময়ের সাথেও কাজ করছি, যা মহাশূণ্যের মতোই রহস্যময়। আর তা বর্ণনা করা কঠিন, কেননা মহাশূণ্যের মতো সময়ও অসীম। 

লেখক : অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস

আরও পড়ুন

×