ঢাকা মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬

সমকালীন প্রসঙ্গ

রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তির সুরক্ষা কে নিশ্চিত করবে

রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তির সুরক্ষা কে নিশ্চিত করবে
×

জাহানারা নূরী

প্রকাশ: ২৪ এপ্রিল ২০২৬ | ১৬:০১

একটি রাষ্ট্র কেবল মানচিত্রে আঁকা সীমারেখা নয়। ম্যাক্স ওয়েবার রাষ্ট্রকে সংজ্ঞায়িত করেছেন বৈধ কর্তৃত্বের ধারক হিসেবে; বেনেডিক্ট অ্যান্ডারসনের মতে, জাতি  এক ইমাজিনড কমিউনিটি(ধারনাপ্রসূত সম্প্রদায়)—যেখানে মানুষ একে অপরকে না চিনলেও এক অভিন্ন চেতনায় আবদ্ধ থাকে। অর্থাৎ, রাষ্ট্রের অস্তিত্ব শুধু ভূখণ্ডে নয়, বরং নাগরিকদের সম্মিলিত স্বীকৃতি, স্মৃতি এবং মূল্যবোধে নিহিত।
এই বাস্তবতায় রাষ্ট্রের স্থায়িত্ব একটি সূক্ষ্ম কিন্তু অপরিহার্য ভারসাম্যের ওপর নির্ভর করে। নিক্তির একদিকে থাকে রাষ্ট্রের কর্মক্ষমতা নাগরিকদের প্রত্যাশা পূরণে গৃহীত নীতি, উন্নয়ন এবং বাস্তব পদক্ষেপসমূহ। আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের চোখে তা পারমেন্স লেজিটিমেসি বা সেবার মাধ্যমে অর্জিত বৈধতা। অন্যদিকে থাকে রাষ্ট্রের নৈতিক বৈধতা ইতিহাস, আদর্শ এবং প্রতিষ্ঠাকালীন অঙ্গীকার থেকে উদ্ভূত নরমাটিভ লেজিটেমিসি বা নৈতিক বৈধতা। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের এই নৈতিক ভিত্তি অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ, গণহত্যার স্মৃতি এবং জনগণের ম্যান্ডেটে প্রতিষ্ঠিত স্বাধীনতার যাবতীয় দিকনির্দেশনামূলক দলিলের মূল্যবোধের সঙ্গে।
রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তি মূল্যবোধ, ইতিহাস ও সার্বভৌমত্বের আদর্শের সুরক্ষা কে নিশ্চিত করবে? এ প্রশ্নটি তোলা বর্তমান বাংলাদেশে অনিবার্য।
লক ও রুশোর সামাজিক চুক্তির ধ্রুপদী তত্ত্ব অনুযায়ী রাষ্ট্রের বৈধতা জনগণের সম্মতি থেকে উদ্ভূত বলে গ্রহণ করলে দেখা যায়, স্বায়ত্তশাসনের সম্মতি মুক্তিযুদ্ধের আগেই বাংলাদেশের জনগণ তাদের নির্বাচিত নেতৃত্বকে দিয়েছিলেন। তারই ভিত্তিতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশিত পথ ধরে মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব প্রোক্লেমেশান অব ইনডিপেনডেন্স (স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র) প্রণয়ন এবং প্রথম বাংলাদেশ সরকার গঠন করেন। বিজয় অর্জনের পরপরই মুক্তিযুদ্ধের সরকার সংবিধান প্রণয়ন করে রাষ্ট্রের চলার পথরেখা ঠিক করেন।
রাষ্ট্র ও জনগণ উভয়ের ভূমিকাই এখানে সুনির্দিষ্ট: এক. রাষ্ট্র, জনগণের নির্বাচিত নেতৃত্বের অধীনে নীতি-প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করবে এবং রাষ্ট্র ও নাগরিকের যাবতীয় সুরক্ষার দায়িত্ব পালন করবে। নাগরিকগণ, রাষ্ট্রের মূল নৈতিক ভিত্তি, নির্মাণকালের যাবতীয় মহতি মূল্যবোধকে ধারণ ও রক্ষা তো করবেই, সে মৌল চেতনার ধারাবাহিক উন্নয়ন ঘটিয়ে প্রজন্মের জন্য রাষ্ট্র টিকিয়ে রাখবে।

রাষ্ট্র ও জনগণের পারস্পরিক এই দায়বদ্ধতার মধ্য দিয়েই গড়ে ওঠে উভয়ের মধ্যে লিখিত (সংবিধান, আইন) এবং অলিখিত (রাজনৈতিক সংস্কৃতি, রাষ্ট্রের মূল চেতনার মর্যাদা রক্ষা,ঐতিহাসিক স্মৃতি সংরক্ষণ ও ধারাবাহিকতা রক্ষা) সামাজিক চুক্তি।
রাষ্ট্র সুরক্ষায় রাজনৈতিক কার্যক্রমে অংশগ্রহণ নাগরিকের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। নাগরিক রাষ্ট্র-নির্মাণ ও তার ধারাবাহিকতা রক্ষায় নিজ দায়িত্ব পালনে বিমুখ হলে, বা রাষ্ট্রের মূল চেতনা ও জন্মের ইতিহাসের বিরুদ্ধে দাঁড়ালে রাষ্ট্রের ভারসাম্য নষ্ট হয়। ফলে নাগরিক অধিকার বিভিন্নভাবে খর্ব হয়। এই প্রেক্ষাপটে  বিভিন্ন শক্তির দ্বারা রাষ্ট্রীয় কাঠামোর অপব্যবহারের ঝুঁকি তৈরি হয়।
স্পষ্টত রাষ্ট্র কেবল উন্নয়ন বা ক্ষমতার মাধ্যমে টিকে থাকে না; টিকে থাকে এর নৈতিক ভিত্তির ওপর। নৈতিক ও মহৎ মূল্যবোধ ধারণ না করলে কোনো জাতি দীর্ঘমেয়াদে মর্যাদাশীল রাষ্ট্রে পরিণত হতে পারে না, এও রাষ্ট্রবিজ্ঞানেরই ভাষ্য।

শোষণ ও গণহত্যার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে, আত্মত্যাগের মাধ্যমে, ন্যায়বিচারের দাবিতে জন্ম নেওয়া বাংলাদেশ রাষ্ট্র বর্তমানে এমনই এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। দেশটি কেবল রাজনৈতিক সংকটে নয়, তার ইতিহাস–ঐতিহ্য, এমনকি যে–নৈতিকতা ও মূল্যবোধের ভিত্তিতে তার জন্ম, সেগুলোও ধ্বংসের আয়োজন চলছে। রাস্ট্রের স্থপতি, তার মুক্তিযুদ্ধকালীন সহযোগীরা, এমনকি মুক্তিযোদ্ধারাও নানা লাঞ্ছনার শিকার। ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুর পাশাপাশি বাউল ও সুফি তরিকার মানুষদের ওপর ধারবাহিক আক্রমণ বাংলাদেমের সামাজিক–সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যকে হুমকির মুখে ফেলেছে।
বিশ্বের ইতিহাসে দেখা গেছে এমন ক্রান্তিকালে জাতিগুলো হয় বিভাজনের দিকে ঝুঁকেছে, নয়তো সম্মিলিত আত্মসমালোচনার মাধ্যমে পুনর্গঠনের জন্য ঘুরে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশ সনদ জাতির এ ঘুরে দাঁড়ানোর পথেই একটি পদক্ষেপ। আঠারো মাসেরও বেশি সময় ধরে একদল অ্যাক্টিভিস্ট, একাডেমিক, আইনজীবী, সাংবাদিক, লেখক ও গবেষকের আলাপ-আলোচনা, তর্ক-বিতর্ক শেষে গৃহীত সিদ্ধান্তের ফসল এ অঙ্গীকারনামা। এমন কালে তা প্রণীত হয়েছে, যখন মতভেদ আকাশচুম্বী, তবে ন্যূনতম ঐকমত্যের পথ অন্বেষণে মানুষ মরিয়া।

বাংলাদেশ সনদ  একটি কাঠামো যেখানে আটটি অঙ্গীকার তুলে ধরেছে বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাকালীন দলিল, ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা এবং নাগরিক আকাঙ্ক্ষাভিত্তিক মৌলিক নীতিগুলোর নির্যাস। কিছু উদাহরণ দেয়া যাক:
প্রথমত, ইতিহাসের সুরক্ষা। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ এবং গণহত্যা বাংলাদেশ রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তি। রাষ্ট্র ও জাতির এ ভিত্তি দুর্বল করার চলমান দুষ্কালে বাংলাদেশ সনদে স্বাক্ষরকারীরা জাতির নাগরিকদের মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, রাষ্ট্রের ইতিহাস রক্ষা শুধুপ্রতিষ্ঠানের কাজ নয়; এটি জনগণের সম্মিলিত দায়িত্ব।
দ্বিতীয়ত, ভিন্নমতের মধ্যেও ঐক্য থাকা সম্ভব গণতন্ত্রে মতবৈচিত্র্য স্বাভাবিক। কিন্তু ভিন্নতার ব্যবহারে রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বকে দুর্বল করার বিপজ্জনক পদক্ষেপের বিরুদ্ধে একমাত্র সচেতন জনতার ঐক্যই দাঁড়াতে পারে। বাংলাদেশ সনদ জাতীয়তাবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা এবং সার্বভৌমত্বের মতো বিষয় নিয়ে জনগণকে আটটি মূল্যবোধের প্রসারিত ব্যাখ্যায় একটি ন্যূনতম ঐকমত্যের অবস্থান নিতে আহ্বান জানায়।
তৃতীয়ত, মানবাধিকারকে সর্বজনীন ও আপসহীন হিসেবে পুনঃপ্রতিষ্ঠা
২০২৪ থেকে আজ পর্যন্ত শ্রম অধিকার, নারী নিরাপত্তা এবং শিশু সুরক্ষার ক্ষেত্রে যে সব গুরুতর হুমকী উপস্থিত তাতে এ ছবিটি সুস্পষ্ট যে, সাম্প্রতিক সময়ে নাগরিক সুরক্ষা ও অধিকার কাঠামো নিয়ে গুরুতর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, যা রাষ্ট্রের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।
চতুর্থত, সুশাসন ও জবাবদিহিতা
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বারবার দেখিয়েছে যে জবাবদিহিতা ছাড়া উন্নয়ন টেকসই হয় না। সনদ জনগণের অংশগ্রহণের মাধ্যমে এই জবাবদিহিতার কাঠামোকে শক্তিশালী করার আহ্বান জানায়।
পঞ্চমত, পরিবেশ ও সামাজিক নিরাপত্তা
গার্ডিয়ান এবং আল জাজিরার প্রতিবেদনে স্পষ্ট জলবায়ুপরিবর্তন বাংলাদেশের মানুষের জীবনকে সরাসরি প্রভাবিত করছে। সনদ এই বাস্তবতায় নাগরিক অংশগ্রহণ শক্তিশালী করে তুলতে চায়।

তবে এই মূল্যবোধগুলো বাস্তবায়নের উদ্যোগের পেছনের প্রশ্নটি গভীর: আমরা কি একে অপরকে একটি জাতীয় যৌথ অভিযাত্রার অংশীদার হিসেবে দেখতে পারি? বাংলাদেশ সনদ রাষ্ট্রকে কেবল একটি প্রশাসনিক কাঠামো নয় বরং নৈতিক ও বাস্তব এক সম্মিলিত কর্মযজ্ঞ হিসেবে উপস্থাপন করে। প্রশ্ন হলো, আমরা কি আমাদের প্রতিষ্ঠার আদর্শ ধরে রাখব, নাকি বিভাজনের  চাপে তা ভেঙে পড়তে দেব?

জনগণের অগ্রসর অংশ তথা সচেতন মহলকে এর উত্তর খুঁজতে হবে। মতভেদ থাকলেও দেশের মৌলিক মূল্যবোধসমূহে বিশ্বাস স্থিত করতে হবে। যখন আস্থার সংকট গভীর, ইতিহাস বিতর্কিত, এবং রাষ্ট্রের অস্তিত্ব বিষয়ক নানা সংকট মুখব্যাদান করে আছে সেই মুহূর্তে দেশ, জাতি, রাষ্ট্র ও জনগণের সুরক্ষায় দায়িত্বশীল ও ঐক্যবদ্ধ নাগরিক অবস্থানই হতে পারে সবচেয়ে কার্যকর পথ।

জাহানারা নুরী: সুইডেন প্রবাসী সাংবাদিক ও কথাসাহিত্যিক
 

আরও পড়ুন

×