ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

সমকালীন প্রসঙ্গ

কৃষিতে জ্বালানির ধাক্কা এবং খাদ্য নিরাপত্তার ঝুঁকি

কৃষিতে জ্বালানির ধাক্কা এবং খাদ্য নিরাপত্তার ঝুঁকি
×

গোলাম মর্তুজা সেলিম

প্রকাশ: ০৪ মে ২০২৬ | ১৬:২৭ | আপডেট: ০৪ মে ২০২৬ | ১৬:২৮

বাংলাদেশের অর্থনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে কৃষি। শিল্পায়ন, সেবা খাতের সম্প্রসারণ এবং প্রযুক্তিগত অগ্রগতির পরও দেশের একটি বৃহৎ জনগোষ্ঠীর জীবন-জীবিকা এখনো এই খাতের সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত। কৃষি শুধু খাদ্য সরবরাহ নিশ্চিত করে না; এটি কর্মসংস্থান সৃষ্টি, গ্রামীণ অর্থনীতির গতিশীলতা বজায় রাখা এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষার অন্যতম প্রধান ভিত্তি। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট, অভ্যন্তরীণ জ্বালানি ব্যবস্থাপনার সীমাবদ্ধতা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের সম্মিলিত প্রভাবে বাংলাদেশের কৃষি খাত এক বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে।

সেচ ব্যবস্থায় বিদ্যুৎ ও জ্বালানির ওপর নির্ভরশীলতা, সার উৎপাদনে গ্যাসের ঘাটতি, পরিবহন ব্যয়ের ঊর্ধ্বগতি সব মিলিয়ে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে এবং কৃষকের ঝুঁকি বাড়ছে। এই সংকটের প্রভাব কেবল উৎপাদন কমে যাওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি খাদ্য নিরাপত্তা, বাজারে মূল্যস্ফীতি এবং সামগ্রিক সামাজিক স্থিতিশীলতার ওপরও গভীর চাপ সৃষ্টি করছে। ফলে বিষয়টি আর শুধু কৃষি খাতের সমস্যা নয় বরং এটি একটি জাতীয় অর্থনৈতিক ও নীতিগত চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে।

বিপর্যস্ত সেচ ব্যবস্থা

জ্বালানি সংকটের প্রত্যক্ষ ও তাৎক্ষণিক প্রভাব সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান হয়েছে কৃষির সেচ ব্যবস্থায়। বাংলাদেশের অধিকাংশ কৃষিজমি এখনো ডিজেলচালিত সেচ পাম্পের ওপর নির্ভরশীল। ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধি এবং সরবরাহে অনিশ্চয়তা কৃষকদের উৎপাদন ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বাড়িয়ে দিয়েছে, যা অনেকের জন্য চাষাবাদ চালিয়ে যাওয়াকেই কঠিন করে তুলছে। ফলে অনেক কৃষক সময়মতো জমিতে সেচ দিতে পারছেন না—এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে ফসলের বৃদ্ধি, গুণগত মান এবং মোট ফলনের ওপর। অন্যদিকে, বিদ্যুৎনির্ভর সেচ ব্যবস্থাও নিরবচ্ছিন্ন নয়। লোডশেডিং এবং ভোল্টেজের ওঠানামা সেচ কার্যক্রমকে ব্যাহত করছে, বিশেষ করে বোরো মৌসুমের মতো পানিনির্ভর সময়গুলোতে। এতে কৃষকের পরিকল্পনা ও সময় ব্যবস্থাপনা ভেঙে পড়ছে, উৎপাদনে অনিশ্চয়তা তৈরি হচ্ছে।

এই দ্বিমুখী সংকট—ডিজেলের উচ্চমূল্য ও বিদ্যুতের অস্থিরতা, কৃষি উৎপাদনকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে। দীর্ঘমেয়াদে এটি খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থাকে দুর্বল করে দিতে পারে এবং বাজারে মূল্য অস্থিরতা বাড়াতে পারে। তাই সেচ ব্যবস্থাকে টেকসই ও নির্ভরযোগ্য করতে বিকল্প জ্বালানির ব্যবহার (যেমন সৌরশক্তিনির্ভর সেচ), সেচ অবকাঠামোর আধুনিকায়ন এবং জ্বালানি সরবরাহে পরিকল্পিত ও স্থিতিশীল নীতি গ্রহণ এখন অত্যন্ত জরুরি।


বিপর্যস্ত সার উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থা

জ্বালানি সংকটের প্রভাব সার উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থায় স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হচ্ছে। বাংলাদেশের অধিকাংশ সার কারখানা প্রাকৃতিক গ্যাসনির্ভর হওয়ায় গ্যাস সরবরাহে ঘাটতি দেখা দিলে উৎপাদন সরাসরি ব্যাহত হয়। ইতোমধ্যে কিছু কারখানায় উৎপাদন কমে যাওয়া বা সাময়িকভাবে বন্ধ থাকার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, যা দেশীয় সরবরাহকে দুর্বল করে দিচ্ছে। এর ফলে দেশের সার চাহিদা মেটাতে আমদানির ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। কিন্তু বৈশ্বিক বাজারে সারের দাম বৃদ্ধি, ডলার সংকট এবং আন্তর্জাতিক সরবরাহ চেইনের অস্থিরতা আমদানিকে ব্যয়বহুল ও অনিশ্চিত করে তুলেছে। ফলে সার সংগ্রহে বিলম্ব হচ্ছে এবং অনেক ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত মজুদ নিশ্চিত করা যাচ্ছে না।

এই পরিস্থিতির সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী হচ্ছেন কৃষকরা। সময়মতো ও পর্যাপ্ত পরিমাণে সার না পাওয়ায় তারা সঠিক মাত্রায় সার প্রয়োগ করতে পারছেন না, যার ফলে ফসলের উৎপাদনশীলতা কমে যাচ্ছে এবং উৎপাদন ব্যয় আরও বেড়ে যাচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদে এটি শুধু কৃষি উৎপাদন নয়, বরং খাদ্য নিরাপত্তা ও বাজার স্থিতিশীলতার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। এ অবস্থায় জরুরি ভিত্তিতে গ্যাস সরবরাহের অগ্রাধিকার পুনর্বিন্যাস, সার কারখানাগুলোর দক্ষতা বৃদ্ধি এবং বিকল্প কাঁচামাল বা জ্বালানি ব্যবহারের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। পাশাপাশি আমদানি ব্যবস্থাপনায় কৌশলগত পরিকল্পনা, আগাম মজুদ গড়ে তোলা এবং কৃষকদের জন্য সারের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে কার্যকর নীতিগত সমর্থন প্রদান এখন সময়ের দাবি।

ঝুঁকির মুখে খাদ্য নিরাপত্তা 

বর্তমান জ্বালানি সংকট কৃষি খাতের মাধ্যমে জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তাকে সরাসরি ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। কৃষি উৎপাদন কমে গেলে বাজারে খাদ্যের সরবরাহও সংকুচিত হয়, যার ফলে চাল, ডাল, তেলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়ে যায়। এর সবচেয়ে বেশি চাপ পড়ে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠীর ওপর, যাদের আয় তুলনামূলকভাবে স্থির কিন্তু ব্যয় দ্রুত বাড়ছে। ফলে খাদ্য ব্যয়ে সমন্বয় করতে গিয়ে পুষ্টিকর খাবারের গ্রহণ কমে যেতে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদে পুষ্টিহীনতা ও মানবসম্পদের গুণগত মানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

অন্যদিকে, উৎপাদন ঘাটতি পূরণে খাদ্য আমদানির প্রয়োজন হলে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়। এতে সামষ্টিক অর্থনীতির ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে, বিশেষ করে যখন বৈশ্বিক বাজারও অস্থির থাকে। ফলে জ্বালানি সংকটের প্রভাব কৃষি ছাড়িয়ে সামগ্রিক অর্থনীতি ও সামাজিক স্থিতিশীলতার ওপর বিস্তৃত হচ্ছে।
এ পরিস্থিতিতে দ্রুত, সমন্বিত এবং দূরদর্শী পদক্ষেপ গ্রহণ অপরিহার্য। টেকসই জ্বালানি ব্যবহারের প্রসার, কৃষিতে নবায়নযোগ্য শক্তির প্রয়োগ, দক্ষ সেচ ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও পরিকল্পনার উন্নয়ন—এসব পদক্ষেপ এখন সময়ের দাবি। পাশাপাশি কৃষকদের জন্য সহায়ক নীতি, ভর্তুকির কার্যকর ব্যবস্থাপনা এবং প্রযুক্তিনির্ভর সমাধান নিশ্চিত করা গেলে এই সংকট মোকাবিলা করে কৃষি খাতকে আরও স্থিতিশীল ও সহনশীল করে তোলা সম্ভব। 

সরকারের করণীয়

এই প্রেক্ষাপটে সরকারের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং তাৎক্ষণিক ও দীর্ঘমেয়াদি—দুই ধরনের পদক্ষেপই প্রয়োজন। প্রথমত, জ্বালানি খাতে টেকসই ও কাঠামোগত সংস্কার জরুরি। জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা ধীরে ধীরে কমিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে হবে। বিশেষ করে সৌরশক্তিনির্ভর সেচ ব্যবস্থার সম্প্রসারণ গ্রামীণ কৃষিতে একটি কার্যকর সমাধান হতে পারে। এতে কৃষকের জ্বালানি ব্যয় কমবে এবং সেচের নির্ভরযোগ্যতাও বাড়বে।

দ্বিতীয়ত, কৃষকদের জন্য লক্ষ্যভিত্তিক ভর্তুকি ও প্রণোদনা আরও কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। ডিজেল, বিদ্যুৎ ও সারের ওপর ভর্তুকি এমনভাবে নির্ধারণ করা প্রয়োজন, যাতে প্রকৃত কৃষক উপকৃত হন এবং উৎপাদন ব্যয় সহনীয় পর্যায়ে থাকে। ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের জন্য সহজ শর্তে ঋণ, সরাসরি আর্থিক সহায়তা এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে স্বচ্ছ বিতরণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা গেলে অপচয় ও দুর্নীতি কমানো সম্ভব হবে।

তৃতীয়ত, খাদ্য মজুদ ও বাজার ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা বাড়াতে হবে। সরকারি গুদামে পর্যাপ্ত মজুদ নিশ্চিত করার পাশাপাশি বাজারে কৃত্রিম সংকট ও মূল্য কারসাজি প্রতিরোধে কার্যকর নজরদারি প্রয়োজন। একই সঙ্গে কৃষক ও ভোক্তার মধ্যে সরাসরি সংযোগ স্থাপনের জন্য আধুনিক বিপণন ব্যবস্থা যেমন ডিজিটাল মার্কেটপ্লেস বা কৃষকভিত্তিক সরবরাহ চেইন গড়ে তুললে উভয় পক্ষই উপকৃত হবে।

চতুর্থত, গবেষণা ও প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ বাড়ানো এখন আর বিকল্প নয়, বরং অপরিহার্য। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় খরা, লবণাক্ততা ও বন্যা সহনশীল ফসলের জাত উদ্ভাবনের পাশাপাশি আধুনিক প্রযুক্তি—যেমন প্রিসিশন এগ্রিকালচার, ড্রিপ ইরিগেশন এবং দক্ষ সার ব্যবস্থাপনা ব্যাপকভাবে সম্প্রসারণ করতে হবে। এতে কম খরচে অধিক উৎপাদন নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
 সমন্বিত দৃষ্টিভঙ্গির প্রয়োজন

সবশেষে, জ্বালানি, কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তাকে একটি সমন্বিত কাঠামোর মধ্যে বিবেচনা করা জরুরি। এই তিনটি খাত পরস্পর নির্ভরশীল; একটির সংকট অন্যটিকে সরাসরি প্রভাবিত করে। তাই বিচ্ছিন্ন উদ্যোগের পরিবর্তে সমন্বিত পরিকল্পনা, প্রমাণভিত্তিক নীতি প্রণয়ন এবং দক্ষ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করাই হবে টেকসই সমাধানের পথ।
বাংলাদেশ অতীতে বহু চ্যালেঞ্জ সফলভাবে মোকাবিলা করেছে। বর্তমান জ্বালানি সংকটও নিঃসন্দেহে একটি বড় চ্যালেঞ্জ, তবে একই সঙ্গে এটি কৃষিকে আরও আধুনিক, দক্ষ ও টেকসই করে তোলার একটি সুযোগ। সঠিক নীতি, কার্যকর বাস্তবায়ন এবং দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গির মাধ্যমে এই সুযোগকে কাজে লাগানো গেলে ভবিষ্যতে একটি শক্তিশালী, সহনশীল ও নিরাপদ খাদ্য ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব হবে যা দেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রাকে আরও সুদৃঢ় করবে।

গোলাম মর্তুজা সেলিম: কৃষি বিষয়ক লেখক এবং  যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক ও কৃষি সম্পাদক, জাতীয় নাগরিক পার্টি- এনসিপি
[email protected] 

আরও পড়ুন

×