পদ্মার ভাঙন এবং নবীরনের ঘুমহীন রাত
রাজীব দে সরকার
প্রকাশ: ০৪ মে ২০২৬ | ১৭:১৫
আমার বাড়ি রাজবাড়ী জেলার গোয়ালন্দ উপজেলার ছোটভাকলা ইউনিয়নের এক অখ্যাত গ্রামে। রাজবাড়ী জেলাকে বাংলাদেশের মানুষ কতোখানি চেনেন জানি না, তবে ব্রিটিশ-ভারতের সাবডিভিশন হিসেবে এবং একটি নৌ-বন্দর হিসেবে ‘গোয়ালন্দ ঘাট’ নামটার সাথে অনেকের পরিচয় থাকতে পারে।
দেশভাগ বা বাংলা ভাগের কারণে কলকাতা বা আসামের মানুষের কাছে গোয়ালন্দ শব্দটি বিশেষ পরিচিত। অবশ্য এসবের কৃতিত্ব আমাদের সুসমৃদ্ধ বাংলা সাহিত্যের সাহিত্যিকদেরও দিতে হবে। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বেশ কিছু লেখনীতে গোয়ালন্দ ঘাটের উল্লেখ পাওয়া যায়। ১৯২৬ এ তিনি যখন ঢাকা আসেন, প্রথমে কোলকাতা থেকে এসেছিলেন গোয়ালন্দে, এরপরে নারায়ণগঞ্জ হয়ে ঢাকায়।
অবিভক্ত বাংলার কৃষ্টি ও বাণিজ্য প্রচারের জন্য যে নদী মাধ্যমের প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল, গোয়ালন্দ ঘাট ছিলো সে নদীমাতৃকতার একটি ফোকাল পয়েন্ট। এক সময় পদ্মার বুকে পাল তুলে চলতো বিশাল বড় বড় নৌকা। নৌকার বদলে এক সময় চলে এলো স্টিমার। এই সব নৌকা স্টিমার সবারই গন্তব্য বা গন্তব্য-বিরতির আকর্ষণীয় স্থান ছিলো এই গোয়ালন্দ ঘাট।
এমনকি সৈয়দ মুজতবা আলীর ‘নোনাজল’ গল্পে গোয়ালন্দ ঘাটের স্টিমারে যে সুস্বাদু চিকেন কারি (স্টিমার কারি) পাওয়া যেতো তার উল্লেখ আছে। তিনি লিখেছেন, ‘সেই গোয়ালন্দ চাঁদপুরী জাহাজ। ত্রিশ বৎসর ধরে এর সঙ্গে আমার চেনাশোনা। চোখ বন্ধ করে দিলেও হাতড়ে হাতড়ে ঠিক বের করতে পারব, কোথায় জলের কল, কোথায় চা-খিলির দোকান, মুর্গীর খাঁচাগুলো রাখা হয় কোন জায়গায় । অথচ আমি জাহাজের খালাসী নই, অবরের-সবরের যাত্রী মাত্র’
আমি অবশ্য সরকারি খালাসী, মানে সরকারের চাকর। বদলির চাকরি করতে করতে এক সময় পদায়ন হয় রাজবাড়ী জেলার সদর হাসপাতাল আঙিনায়।
গত বছর মার্চ মাসের দিকে আমার হাসপাতালের কক্ষে একজন বৃদ্ধা এলেন। তাকে দেখে আমি চিনে ফেললাম। কারণ ইতিপূর্বেও তিনি কয়েকবার আমার কাছে এসেছেন। এটা-ওটা নানা রোগে জর্জরিত শরীর। তাই তাকে ওষুধ নিতে হাসপাতালে আসতেই হয়। এই বৃদ্ধার বাড়ি গোয়ালন্দ উপজেলায়।
তার নামটা আমার আজও মনে আছে। তার নাম ছিল নবীরন।
শেষ যেদিন তিনি এলেন, সেদিনের কথা বলি। এরপরে তার সাথে আমার আর দেখা হয় নি। সেদিন আমার রোগী দেখা প্রায় শেষ। দুপুর হয়ে গেছে। আমিও আমার সরকার বাহাদুরের দেওয়া দাপ্তরিক কাজে ইতি টেনে দুপুরের খাবার খেতে যাবো। এ সময় তিনি এলেন।
যেহেতু আমার ডেস্কে এখন কোন রোগী নেই। আমি শেষ এই রোগীকে একটু দেখে দেবার জন্য আবার বসলাম। ওনার সাথে অল্প কিছু কথা বলারও সময় হলো।
জীবন সায়াহ্নে উপস্থিত হওয়া এই মানুষটার বাড়ি গোয়ালন্দ উপজেলার দেবগ্রাম ইউনিয়নের পদ্মা পাড় ঘেঁষা কোন লোকালয়ে। পরনে ময়লা শাড়ি। চোখে মুখে বয়সের চেয়ে ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট। কথা বলে জানলাম, ওনার স্বামী সন্তান কেউ নেই। বছর দশেক বয়সী একজন নাতি আছে। তার হাত ধরেই এখন হাসপাতালে আসতে হয়।
জিজ্ঞাসা করলাম, কেমন আছেন চাচী? কী সমস্যা?
উনি কিছুক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন। আমাকে তিনি স্পষ্ট করে দেখতে পাচ্ছেন কী না সেটাও বুঝতে পারছি না। কয়েক সেকেন্ড পরে মৌনতা ভাঙ্গলেন।
‘রাতে বেলা গায়ে জ্বর আসে, ব্যাটা। সারা গায়ে কেয়ামতের আগুনের মতো তাপ উঠে। আর কানে ধাপ্পা লাগে। বান ডাকে কানে... বড় বান ডাকে’
‘জ্বর কি অনেক বেশি থাকে? কাঁপুনি দিয়ে আসে? জ্বরের সাথে ঠান্ডা কাশি আছে, চাচী?’
‘জ্বর থাকে রে, ব্যাটা। জ্বরের থেকে বেশী ডর থাকে। ডর... বানের ডর’
কিসের ডর, চাচী?
‘ঘুমাইতে পারি না, ব্যাটা। দুই চোখে ঘুম নাই। আইজ... ২৫ বছর চোখ বুজবার পারি না’
‘চাচী ঘুম হয় না কেন রাতে? ঘুমাতে চেষ্টা করেন না?’ আমি জানতে চাইলাম।
চাচী আবার স্তব্ধ হয়ে গেলেন। এবার তিনি তাকিয়ে আছেন আমার পেছনের দেয়ালটার দিকে। এই দেয়ালে কোন ছবি নেই। তিনি তাকিয়ে তাকিয়ে কি দেখছেন, বা আদৌ কিছু দেখছেন কী না, আমি বুঝতে পারছি না।
- (কিছুক্ষণ চুপ থেকে উনি কথা বললেন) ‘ব্যাটা রে, ঘুমের তো আর দোষ না। দোষ আমার কপালের। চোখ দুইডা বুজলেই মনে অয় গর-বাড়ি-দেয়াল শুদ্দা পদ্মায় তলাইয়া যামু। ভাঙতে ভাঙতে গাং আগাইয়া আইছে ম্যালা।’
- বাড়ি কোথায় চাচী?
- ‘কি আর কমু, ব্যাটা। এই জীবনে কম ভাঙন দেহি নাই। খুব ভয় লাগে গাঙ্গের জল। অনেক আগে একবার সব ভাইগ্যা সব খুয়াইছি। আবার সেই মরাল আইছে। কুন সুম বাসাইয়া নিবো কইতে আরি না।’
আমি খেয়াল করলাম চাচীর চোখ জলে ভিজে উঠেছে।
বার্ধক্যের ভাঁজ পড়া মুখে হারানোর আতঙ্ক ফুটে উঠেছে। ঐ দু'চোখে তিনি ভাঙ্গন দেখেছেন অনেক।
হয়তো এখনো জলের ‘ছল্যাৎ ছল্যাৎ’ শুনলে শিউরে ওঠেন তিনি। ঘুম তার আসে না এ কারণেই।
রবীন্দ্রনাথ তার সেদিনের গোয়ালন্দ যাত্রায় লিখেছিলেন ‘ভারী কাজের বোঝাই তরী কালের পারাবারে / পাড়ি দিতে গিয়ে কখন ডোবে আপন ভারে / তার চেয়ে মোর এই ক-খানা হালকা কথার গান / হয়তো ভেসে বইবে স্রোতে তাই করে যাই দান’
রবীঠাকুরের অমর গীতিকথা ভেসে থাকলেও পদ্মার জলে ভাসেনি নবীরনের ভাগ্য। প্রমত্তা পদ্মার নদী ভাঙন বারবার ভেঙেছে তার কপাল। ছিনিয়ে নিয়েছে তার সব কিছু। এমনকি তার চোখের ঘুম।
আমার মনে হয় দক্ষিণবঙ্গের সবচাইতে অবহেলিত জনপদের নাম গোয়ালন্দ। অবারিত ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে থাকা এ জনপদে 'আপদ' ও 'আশীর্বাদ' এই দুই-এরই নাম 'প্রমত্তা পদ্মা'।
রাজবাড়ী জেলার ৪ উপজেলার ৫৭ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে রয়েছে পদ্মা নদীর ডান তীর। এত বিস্তৃত ভাবে আগ্রাসী পদ্মাকে সযত্নে জড়িয়ে রেখেছে বলেই হয়তো এই জেলাকে বলা হয় ‘পদ্মাকন্যা রাজবাড়ী’।
পদ্মা নদী একদিকে যেমন দিয়েছে পলি উর্বর কৃষিভূমি, আর অন্য হাতে কেড়ে নিয়েছে নবীরনের মতো অনেকের সব কিছু। নদী তীরবর্তী মানুষেরা সবাই হারিয়েছে অনেক। নবীরনের মতো দু’চোখে ইতিহাস নিয়ে বেঁচে থাকা মানুষেরা হারিয়েছে ‘সব’।
নবীরনের তাই হয়তো এখনো উশৃঙ্খল ভাঙনের আতঙ্কে ঘুমাতে পারেন না। আর তার চোখে এই ঘুম এনে সেবার চিকিৎসা শাস্ত্র আমার জানা নেই।
নদীভাঙন কবলিত এলাকার মানুষের এই আহাজারি চিরন্তন। সময় পালটায়। প্রজন্ম পালটায়। রাজনীতি পালটায়। কিন্তু নবীরনদের আহাজারির গল্প পালটায় না।
নবীরনের আসলে ঘুমের জন্য চিকিৎসার প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন একটু নির্ভরতার। ঘুমিয়ে গেলেই তলিয়ে যাবে না। নদীর শব্দে আর কান্না মেশানো থাকবে না। প্রমত্তা পদ্মা কেড়ে নেবে না আর একটি জীবন- এতোটুকু সহানুভূতি দিয়ে, এতোটুকু আশ্বাস দিয়ে আমরা কি নবীরনকে এক রাতের এক মুঠো ঘুম এনে দিতে পারি না?
একটু নিরাপদ ঘুমের জন্য আর কতো রাত অতন্দ্র থাকবে পদ্মাপাড়ের ওরা?
আমাদের সবটুকু প্রার্থনা হোক নবীরনদের জন্য।
ডা. রাজীব দে সরকার: চিকিৎসক
- বিষয় :
- নদী সুরক্ষা
