পাঠ্যাভ্যাস
বই থেকে বিচ্ছিন্ন তরুণ প্রজন্ম এবং আমাদের দায়
অধ্যাপক ড. মো. আবু তালেব
মো. আবু তালেব
প্রকাশ: ১৩ মে ২০২৬ | ২০:২৫
একটি জাতির বৌদ্ধিক বিকাশের সবচেয়ে শক্তিশালী ভিত্তি হলো বই; পাঠাভ্যাস, চিন্তাশক্তি ও মূল্যবোধের নির্মাণে যার বিকল্প নেই। অথচ আজকের বাংলাদেশে একটি উদ্বেগজনক বাস্তবতা ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে: তরুণ প্রজন্ম বই থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। পাঠ্যবইয়ের গণ্ডি ছাড়িয়ে সাহিত্য, ইতিহাস, দর্শন বা সৃজনশীল পাঠে আগ্রহ দিন দিন কমছে। এই বিচ্ছিন্নতা কেবল ব্যক্তিগত রুচির পরিবর্তন নয়; এটি জাতীয় মনন, সৃজনশীলতা ও মানবিকতার ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।
পরিসংখ্যান বলছে, সংকটটি কল্পনার নয়, বাস্তব। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, দেশের অধিকাংশ শিক্ষার্থী পাঠ্যবই ছাড়া অন্য কোনো বই নিয়মিত পড়ে না। একাধিক জরিপে উঠে এসেছে, প্রায় ৭০-৮০ শতাংশ শিক্ষার্থী বছরে একটি পূর্ণাঙ্গ গল্প বা উপন্যাসও শেষ করে না। অন্যদিকে, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের প্রায় ৯০ শতাংশ শিক্ষার্থী গাইডবই ও নোটনির্ভর পড়াশোনায় অভ্যস্ত। অর্থাৎ, পড়া এখন আর জ্ঞান আহরণের আনন্দময় প্রক্রিয়া নয়; এটি পরীক্ষায় পাসের একটি কৌশলে পরিণত হয়েছে।
এই পরিস্থিতির পেছনে যে কারণগুলো সামনে আসে তা হলো- প্রথমত, পরীক্ষাকেন্দ্রিক শিক্ষাব্যবস্থা। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় সৃজনশীলতা বা বিশ্লেষণী ক্ষমতার চেয়ে নম্বর পাওয়াই যেন প্রধান লক্ষ্য। শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবক—সবার মনোযোগ এখন ফলাফলের দিকে। ফলে পাঠ্যবইয়ের বাইরের বই পড়াকে “অপ্রয়োজনীয় বিলাসিতা” হিসেবে দেখা হয়। পরীক্ষায় ভালো ফল না করলে যে প্রতিযোগিতামূলক সমাজে টিকে থাকা কঠিন, এই বাস্তবতা তরুণদের বই থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে।
দ্বিতীয়ত, প্রযুক্তির প্রভাব অস্বীকার করার সুযোগ নেই। স্মার্টফোন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অনলাইন গেম ও ভিডিও কনটেন্ট তরুণদের সময় ও মনোযোগের বড় অংশ দখল করে নিয়েছে। সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে, শহুরে তরুণরা দৈনিক গড়ে ৫ থেকে ৭ ঘণ্টা মোবাইল স্ক্রিনে কাটায়, যেখানে বই পড়ার জন্য সময় থাকে মাত্র ১৫-২০ মিনিট। এই অসম প্রতিযোগিতায় বই স্বাভাবিকভাবেই পিছিয়ে পড়ছে। তৃতীয়ত, পারিবারিক ও সামাজিক পরিবেশও এই বিচ্ছিন্নতার জন্য দায়ী। অনেক পরিবারেই বই পড়ার সংস্কৃতি নেই। শিশুর হাতে ছোটবেলা থেকে গল্পের বই তুলে দেওয়ার পরিবর্তে মোবাইল ফোন তুলে দেওয়া হচ্ছে। বাবা-মা নিজেরা বই পড়েন না, ফলে সন্তানদের মধ্যেও সেই অভ্যাস তৈরি হয় না। একসময় যেখানে বাড়িতে ছোটখাটো লাইব্রেরি থাকা ছিল গর্বের বিষয়, আজ তা অনেকটাই বিরল।
চতুর্থত, পাঠাগার ও বইপ্রাপ্তির সীমাবদ্ধতা একটি বড় কারণ। শহরের কিছু এলাকায় আধুনিক লাইব্রেরি থাকলেও গ্রামাঞ্চলে পাঠাগারের অভাব প্রকট। জাতীয় পর্যায়ে গণগ্রন্থাগারের সংখ্যা সীমিত, এবং অনেক ক্ষেত্রেই সেগুলোর বই সংগ্রহ পুরোনো ও অপ্রাসঙ্গিক। ফলে তরুণদের কাছে আকর্ষণীয় বই সহজলভ্য হয় না।
এই সংকটের প্রভাব সুদূরপ্রসারী। বই থেকে দূরে থাকা মানে চিন্তার গভীরতা হারানো, ভাষার দক্ষতা কমে যাওয়া এবং সৃজনশীলতার সংকোচন। একটি জাতি তখনই এগিয়ে যায়, যখন তার তরুণরা প্রশ্ন করতে শেখে, ভাবতে শেখে, নতুন ধারণা তৈরি করতে পারে। কিন্তু বইবিমুখ একটি প্রজন্ম সেই সক্ষমতা অর্জনে পিছিয়ে পড়ে। এর ফলে দীর্ঘমেয়াদে গবেষণা, উদ্ভাবন ও নেতৃত্বের ক্ষেত্রেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
এখন প্রশ্ন হলো—দায় কার? সরকার, শিক্ষা ব্যবস্থা, পরিবার, নাকি প্রযুক্তি? প্রকৃতপক্ষে দায় সবারই। শিক্ষাব্যবস্থা যদি পড়াকে আনন্দময় না করে, পরিবার যদি পাঠাভ্যাস গড়ে না তোলে, সমাজ যদি বইকে গুরুত্ব না দেয়, আর প্রযুক্তি যদি নিয়ন্ত্রণহীনভাবে ব্যবহৃত হয়—তবে এই বিচ্ছিন্নতা অনিবার্য। তবে হতাশার মাঝেও আশার জায়গা আছে। সঠিক উদ্যোগ নিলে এই প্রবণতা বদলানো সম্ভব।
প্রথমত, শিক্ষাব্যবস্থায় মৌলিক পরিবর্তন আনতে হবে। পরীক্ষাকেন্দ্রিকতা কমিয়ে সৃজনশীল ও পাঠভিত্তিক মূল্যায়ন পদ্ধতি চালু করতে হবে। পাঠ্যক্রমে সহপাঠ্য বই পড়াকে বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে। স্কুলে “রিডিং আওয়ার” চালু করে শিক্ষার্থীদের নিয়মিত বই পড়ার সুযোগ দিতে হবে। দ্বিতীয়ত, পরিবারকে সক্রিয় ভূমিকা নিতে হবে। শিশুর হাতে ছোটবেলা থেকেই বই তুলে দিতে হবে, গল্প শোনানোর অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। বাবা-মা নিজেরা বই পড়লে সন্তানরা অনুপ্রাণিত হবে—এটি একটি প্রমাণিত সত্য।
তৃতীয়ত, প্রযুক্তিকে প্রতিপক্ষ নয়, সহযোগী হিসেবে ব্যবহার করতে হবে। ই-বুক, অডিওবুক, অনলাইন লাইব্রেরি—এসবের মাধ্যমে তরুণদের বইয়ের জগতে ফিরিয়ে আনা সম্ভব। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও বইভিত্তিক কনটেন্ট বাড়ানো যেতে পারে। চতুর্থত, পাঠাগার ব্যবস্থাকে আধুনিক ও সম্প্রসারিত করতে হবে। প্রতিটি উপজেলায় আধুনিক লাইব্রেরি গড়ে তোলা, স্কুলভিত্তিক লাইব্রেরি শক্তিশালী করা এবং নতুন বই সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি। বইমেলা ও সাহিত্য উৎসবের মতো উদ্যোগগুলোকে আরও বিস্তৃত করতে হবে, যাতে তরুণদের মধ্যে বইয়ের প্রতি আগ্রহ তৈরি হয়।
সবশেষে, বইকে শুধু জ্ঞান অর্জনের মাধ্যম হিসেবে নয়, জীবন গঠনের অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। একটি জাতি তখনই আলোকিত হয়, যখন তার তরুণরা বইয়ের আলোয় পথ খুঁজে পায়। ‘বই থেকে বিচ্ছিন্ন তরুণ প্রজন্ম’- এটি কেবল একটি শিরোনাম নয়, এটি আমাদের সময়ের একটি কঠিন বাস্তবতা। এই বাস্তবতা বদলাতে হলে দায় এড়িয়ে নয়, দায় স্বীকার করেই এগোতে হবে। কারণ আজ যদি আমরা তরুণদের বই থেকে দূরে যেতে দিই, তবে আগামীকাল আমরা একটি চিন্তাশূন্য, মূল্যবোধহীন ও দিশাহীন সমাজের মুখোমুখি হব। এখনই সময় বইয়ের সঙ্গে তরুণদের সম্পর্ক পুনর্গঠনের। নইলে এই বিচ্ছিন্নতা একদিন জাতির ভবিষ্যৎকেই বিচ্ছিন্ন করে দেবে।
ড. মো. আবু তালেব: অধ্যাপক, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়
- বিষয় :
- তরুণ প্রজন্ম
