ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

শ্রদ্ধাঞ্জলি

নদী রক্ষায় অন্তঃপ্রাণ শাহজালাল ভাই

নদী রক্ষায় অন্তঃপ্রাণ শাহজালাল ভাই
×

নদীকর্মী মো. শাহজালাল

খাইরুল ইসলাম পলাশ 

প্রকাশ: ২২ মে ২০২৬ | ১৬:১৪

নদীকর্মী শাহজালাল ভাই। তার সাথে আমার প্রথম পরিচয় নদী-সুরক্ষার কাজ করতে গিয়ে। তিন পরলোকগত হলেন গত ১৩ এপ্রিল। বাংলা ১৪৩২ বঙ্গাব্দের শেষ দিনে। তার মৃত্যুর খবরে ভীষণ ব্যথিত হয়েছি। রংপুর জেলার মিঠাপুকুর উপজেলার ভিতর দিয়ে বয়ে যাওয়া একটি নদীর নাম ‘শালমারা’। এই শালমারা নদী সুরক্ষায় যেকজন ব্যক্তি নিঃস্বার্থভাবে কাজ করেছেন, তাদের অগ্রনায়ক শাহজালাল ভাই। এখানকার স্থানীয় বাজারটির নামও শালমারা, যা মূলত এই নদীর নাম থেকেই এসেছে। অতীতে নদীতে প্রবাহ থাকলেও, দখলদার ও স্থানীয় প্রশাসনের অবহেলায় নদীটি হয়ে পড়েছিলো মৃত। সরকারিভাবে নদীর তালিকা থেকেও বাদ দেওয়া হয়েছিলো নদীটিকে। ফলে নদীর উপর নির্ভরশীল জেলেরা মাছ ধরতে না পেরে হয়ে পড়েছিলো কর্মহীন। 

যে ‘শাল’ মাছের প্রাচুর্যতার কারণে নদীর নাম হয়েছিলো শালমারা, সেই শাল মাছটিও বিলুপ্ত হয়েছে অনেক আগে। দখলদারদের কাছ থেকে এই নদী উদ্ধার করতে গিয়ে গ্রামের কয়েকজন মানুষ ঐক্যবদ্ধ হন। আন্দোলন গড়ে তোলেন শাহজালাল ভাইয়ের নেতৃত্বে।

তিনি রিভারাইন পিপলের ‘শালমারা নদী সুরক্ষা কমিটি’র আহ্বায়ক ছিলেন। অক্লান্ত পরিশ্রমে নদীপাড়ের সাধারণ মানুষদের করেছেন ঐক্যবদ্ধ। দীর্ঘসময় যাবৎ করেছেন আন্দোলন। আন্দোলন করতে গিয়ে নানা বাঁধার সম্মুখীন হয়েছেন তারা। প্রভাবশালী দখলদাররা তাদের ওপর অত্যাচার-নির্যাতন করেছে। তাদের সংঘবদ্ধ আন্দোলনকে থামাতে চেষ্টা করেছে। স্থানীয় প্রশাসনও তাদের বিরুদ্ধে ছিলো। কারণ স্থানীয় প্রশাসনের অসাধু কর্মকর্তারা নদীর কিছু অংশকে বিল দেখিয়ে প্রভাবশালীদের কাছে লিজ দিয়েছিলো। 
ন্যায়ের এই আন্দোলন করতে গিয়ে আশির দশকে অন্যায়ভাবে জেলে যেতে হয়েছিলো শাহজালাল ভাইসহ আরোও কয়েকজন নদীকর্মীকে। কিন্তু জেল খেটেও দমে যাননি তারা। হুমকি বা অত্যাচারকে তোয়াক্কা করেননি। নদী উদ্ধারে সংঘবদ্ধ হয়ে আন্দোলন করেছেন। দীর্ঘ সংগ্রাম ও আন্দোলনের পর অবশেষে দখলমুক্ত হয় শালমারা নদী। বাতিল করা হয় অবৈধ ইজারা। নদী খনন করে পূর্বের চেহারায় ফিরিয়ে আনা হয়। যার পুরো কৃতিত্ব এই শাহজালাল ভাইসহ সাধারণ মানুষগুলোর।

যে লোকটি তার সারাজীবন ব্যয় করলেন নদী সুরক্ষার জন্য ও দখল হয়ে যাওয়া নদী উদ্ধারে; সে লোকটি আর আমাদের মাঝে নেই। তার কথা মনে পড়তেই চোখে ভাসে সুঠাম দেহ ও লম্বা-চওড়া এক মুখাবয়ব, যিনি সত্তরোর্ধ বয়সেও ছিলেন প্রবল আত্মবিশ্বাসী ও কর্মঠ একজন মানুষ। মত্যুর এক সপ্তাহ আগেও প্রায় দশ কিলোমিটার সাইকেল চালিয়ে এসেছিলেন বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে নদীর কাজে। ২০২৩ সালে জাতীয় নদীরক্ষা কমিশন বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশে প্রবাহিত খোকসা-ঘাঘট নদীকে ‘নদী’ হিসেবে তালিকাভূক্ত না করার প্রতিবাদে রিভারাইন পিপল ক্লাব যে কর্মসূচী হাতে নেয়, শাহজালাল ভাই সেই কর্মসূচীতেও অংশগ্রহণ করেছিলেন। রংপুর বিভাগীয় কার্যালয়ে নদীরক্ষাবিষয়ক প্রশিক্ষণ কর্মশালাতেও তিনি উপস্থিত ছিলেন। এর আগেও তিনি আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে আসতেন নদী রক্ষার কাজেই। নদীকর্মী ও আমাদের সহকর্মী, বাংলা বিভাগের অধ্যাপক তুহিন ওয়াদুদের সঙ্গে দেখা করতে আসতেন।

বয়স হয়ে যাওয়ায় হাঁটার সুবিধার্থে একটি বাঁশের লাঠি সঙ্গে রাখতেন। কখনও একা আসতেন, কখনও অন্যান্য নদীকর্মীদের  সঙ্গে আনতেন। গ্রামের খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষগুলোর সবার চোখেই আমি দেখেছি তীব্র প্রতিবাদ, প্রতিরোধের আগুন। মুখে থাকতো উজ্জ্বল দীপ্তি, স্বপ্ন জয়ের উচ্ছ্বাস ও আত্মবিশ্বাস। তাদের একটাই লক্ষ্য শালমারা নদী সুরক্ষা। তুহিন ওয়াদুদের সঙ্গে পরামর্শ করে নিজেরাই ঠিক করতেন নদী সুরক্ষার কর্মপরিকল্পনা। নদীর পাড়েই করতেন প্রতিবাদ সমাবেশ, মানববন্ধন। নদীই যেন শাহজালাল ভাইয়ের প্রাণ! জীবনের শেষদিন পর্যন্ত তিনি নদী রক্ষার জন্য কাজ করেছেন।

শাহজালাল ভাই শুধু শালমারা গ্রাম বা শালামারা নদী উদ্ধারের মানুষ হয়ে থাকেননি। তিনি হয়ে উঠেছিলেন সমগ্র বাংলাদেশের একজন প্রতিবাদী মানুষ। তার কথা মনে পড়লেই ভাবি, এরকম শাহজালাল ভাই যদি প্রত্যেক গ্রামে থাকতো, তাহলে বাংলাদেশের সব নদীই দখলমুক্ত হতো। অনুপ্রাণিত হতো হাজারো মানুষ। শাহজালাল ভাই আমাদের মাঝ থেকে চলে গেলেন তবে রেখে গেলেন অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার অনুপ্রেরণা।

খাইরুল ইসলাম পলাশ: নদীকর্মী; সহকারী অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর

আরও পড়ুন

×