ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

সমাজ

রুচির বিকৃতি এবং মানবিক মূল্যবোধের অবক্ষয়

রুচির বিকৃতি এবং মানবিক মূল্যবোধের অবক্ষয়
×

আকাশ চৌধুরী 

প্রকাশ: ২২ মে ২০২৬ | ১৭:৫৬

সমাজে এক ধরনের অস্থিরতা ও নৈতিক অবক্ষয় স্পষ্টভাবে চোখে পড়ছে। প্রতিদিন সংবাদপত্র খুললেই কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রবেশ করলেই এমনসব হৃদয়বিদারক ঘটনা সামনে আসে, যা মানুষকে আতঙ্কিত ও হতবাক করে। বিশেষ করে শিশু নির্যাতন, ধর্ষণ, হত্যা, পারিবারিক সহিংসতা ও অমানবিক আচরণের ঘটনা দিন দিন বেড়েই চলেছে। এসব ঘটনা শুধু বিচ্ছিন্ন কোনো অপরাধ নয়, বরং সমাজের রুচি, মূল্যবোধ ও মানবিকতার গভীর সংকটের প্রতিফলন।

সম্প্রতি দেশে কয়েকটি ঘটনা ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। ঢাকার পল্লবীতে ছোট্ট শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যা এবং সিলেটে চার বছরের এক শিশুকে নির্মমভাবে হত্যা করার ঘটনা পুরো জাতিকে স্তব্ধ করে দিয়েছে। সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হলো, অনেক সময় অপরাধীরা পরিচিতজন কিংবা আত্মীয়স্বজন। যাদের কাছে শিশুরা নিরাপদ থাকার কথা, তাদের হাতেই যখন শিশু নির্যাতনের শিকার হয়, তখন সমাজের নৈতিক ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। একটি শিশুর নিষ্পাপ মুখ, তার হাসি কিংবা স্বপ্ন যখন নিষ্ঠুরতার শিকার হয়, তখন শুধু একটি পরিবার নয়, পুরো সমাজই আহত হয়।

মানুষের এই বিকৃত রুচি ও অমানবিকতার পেছনে বিভিন্ন কারণ রয়েছে। প্রথমত, পারিবারিক ও সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয়। আগে পরিবারে নৈতিক শিক্ষা, মানবিকতা ও ধর্মীয় চর্চার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হতো। বয়োজ্যেষ্ঠদের প্রতি সম্মান, ছোটদের প্রতি মমত্ববোধ এবং সামাজিক দায়বদ্ধতা মানুষের আচরণে প্রতিফলিত হতো। কিন্তু বর্তমানে অনেক পরিবারে সেই চর্চা কমে গেছে। প্রযুক্তিনির্ভর জীবনে মানুষ পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে। সন্তানরা বাবা-মায়ের সান্নিধ্যের পরিবর্তে মোবাইল ফোন ও ইন্টারনেটের জগতে বেশি সময় কাটাচ্ছে। ফলে তাদের মানসিক বিকাশ ও চিন্তাচেতনায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

দ্বিতীয়ত, প্রযুক্তির অপব্যবহার ও অশ্লীল কনটেন্টের সহজলভ্যতা তরুণ সমাজকে বিপথগামী করছে। বর্তমানে ইন্টারনেটের মাধ্যমে খুব সহজেই সহিংসতা ও অশ্লীল বিষয়বস্তু মানুষের হাতে পৌঁছে যাচ্ছে। অনেক কিশোর ও তরুণ এসব কনটেন্টে আসক্ত হয়ে বাস্তব জীবন থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। তাদের মধ্যে সহিংসতা, বিকৃত চিন্তা ও অপরাধপ্রবণতা তৈরি হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘদিন এমন কনটেন্ট দেখার ফলে মানুষের বিবেক ও সংবেদনশীলতা ধীরে ধীরে কমে যায়। ফলে তারা ভয়ংকর অপরাধ করতেও দ্বিধাবোধ করে না।

মাদকাসক্তিও সমাজে অপরাধ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। বর্তমানে তরুণদের একটি অংশ মাদকের দিকে ঝুঁকে পড়ছে। মাদক মানুষের বিবেক, বিচারবোধ ও আত্মনিয়ন্ত্রণ নষ্ট করে দেয়। অনেক অপরাধী গ্রেফতারের পর স্বীকার করেছে, তারা নেশাগ্রস্ত অবস্থায় অপরাধ করেছে। তাই মাদক নিয়ন্ত্রণে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ অত্যন্ত জরুরি।
এছাড়া বিচারহীনতার সংস্কৃতিও অপরাধ বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে। যখন অপরাধীরা দ্রুত শাস্তি পায় না কিংবা প্রভাবশালী হওয়ার কারণে আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে বেরিয়ে যায়, তখন অন্য অপরাধীরাও উৎসাহিত হয়। তাই শিশু নির্যাতন, ধর্ষণ ও হত্যার মতো জঘন্য অপরাধের দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে হবে। দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি অপরাধীদের মনে ভয় সৃষ্টি করবে এবং সমাজে ইতিবাচক বার্তা দেবে।

শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর দায় চাপিয়ে দিলেই হবে না। পরিবার, সমাজ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং রাষ্ট্র—সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। সন্তানদের শুধু ভালো ফলাফল অর্জনের শিক্ষা দিলেই চলবে না, তাদের মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার দিকেও গুরুত্ব দিতে হবে। নৈতিকতা, মানবিকতা, সহমর্মিতা ও ধর্মীয় মূল্যবোধের শিক্ষা ছোটবেলা থেকেই দিতে হবে। অভিভাবকদের উচিত সন্তানদের মানসিক পরিবর্তন, বন্ধুবান্ধব ও অনলাইন কার্যক্রমের প্রতি নজর রাখা।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতেও নৈতিক শিক্ষা ও সামাজিক সচেতনতা বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে হবে। শিক্ষকরা শুধু পাঠ্যবই পড়াবেন না, শিক্ষার্থীদের মানবিক মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার দায়িত্বও পালন করবেন। পাশাপাশি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে তরুণদের ইতিবাচক পথে সম্পৃক্ত করতে হবে।

গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। ইতিবাচক ও সচেতনতামূলক প্রচারণা বাড়াতে হবে। সহিংসতা ও অশ্লীলতার পরিবর্তে মানবিকতা, দেশপ্রেম ও সামাজিক দায়বদ্ধতাকে গুরুত্ব দিয়ে কনটেন্ট তৈরি করা উচিত।
আমাদের মনে রাখতে হবে, একটি সমাজ তখনই সুন্দর ও নিরাপদ হয়, যখন সেখানে মানুষ মানুষকে সম্মান করে এবং দুর্বলদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে। শিশুদের নিরাপত্তা শুধু একটি পরিবারের নয়, পুরো রাষ্ট্রের দায়িত্ব। আজ যদি আমরা মানবিক মূল্যবোধ পুনরুদ্ধারে ব্যর্থ হই, তাহলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি ভয়ংকর সমাজ রেখে যেতে হবে।

সময় এসেছে আত্মসমালোচনার। আমাদের প্রত্যেককে নিজের অবস্থান থেকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হবে। মানবিকতা, নৈতিকতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার চর্চা বাড়াতে হবে। তাহলেই সমাজ থেকে বিকৃত রুচি, সহিংসতা ও অমানবিকতা দূর করা সম্ভব হবে।

আকাশ চৌধুরী: সাংবাদিক 
[email protected]

আরও পড়ুন

×