ঢাকা সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২৬

টিকা হোক করোনা নির্মূলে হাতিয়ার

টিকা হোক করোনা নির্মূলে হাতিয়ার
×

ড. কাজী ছাইদুল হালিম

প্রকাশ: ২২ মে ২০২১ | ০২:০৩

চীনের উহান থেকে ২০২০-এর শুরুতে করোনাভাইরাসের যে আতঙ্ক এবং সংক্রমণ ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ে, তা খুব অল্প সময়ের মধ্যে বিশ্বব্যাপী বিস্তার লাভ করে। এভাবে করোনাভাইরাস বিপর্যস্ত করে দেয় ইতালি, আমেরিকা, ব্রাজিল, দক্ষিণ আফ্রিকা ও ভারতকে। করোনাভাইরাসের সংক্রমণ এবং তার ফলে সৃষ্ট মৃত্যু থেকে অন্যান্য দেশ কিছুটা কাটিয়ে উঠতে পারলেও ভারত বর্তমানে করোনাভাইরাসের সবচেয়ে আক্রমণাত্মক আঘাত ভোগ করছে। দৈনিক সংক্রমণ এবং তা থেকে সৃষ্ট মৃত্যু উভয়েই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। আশা করব, ভারতের পরিস্থিতি আগামীতে ভালোর দিকে যাবে।

করোনাভাইরাস সংক্রমণের একটা বিশেষ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে 'নিকটতা সূত্র', অর্থাৎ একজন সংক্রমিত ব্যক্তি তার নিকটতম সুস্থ ব্যক্তিকে সহজেই সংক্রমিত করতে পারে। আর এ কারণেই সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা করোনাভাইরাসের সংক্রমণ থেকে রক্ষা পাওয়ার একটা অন্যতম উপায়। করোনাভাইরাস সংক্রমণের ক্ষেত্রে এই নিকটতা সূত্র কিন্তু শুধু ব্যক্তি পর্যায়েই নয়, বরং এটা দেশ পর্যায়েও যেতে পারে, যা আমরা ইতালির ক্ষেত্রে দেখতে পাই। ইতালিতে যখন করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ধরা পড়ে, তখন মানুষের চলাচলের মাধ্যমে তা খুব দ্রুত ইউরোপের অন্যান্য দেশে ছড়িয়ে পড়ে। বাংলাদেশে এখনও অনেকে মনে করেন, ইতালিপ্রবাসী বাংলাদেশিদের মাধ্যমে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ শুরু হয় বাংলাদেশে।

করোনাভাইরাসের সংক্রমণ এবং তা থেকে সৃষ্ট মৃত্যুর তাণ্ডব এখন চলছে প্রতিবেশী দেশ ভারতে, যা আমাদের তটস্থ না করে পারে না। মানুষের চলাচলের মাধ্যমে একই অবস্থার সৃষ্টি হতে পারে বাংলাদেশেও। তাই আমাদের বিশেষ সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। বিশেষ সতর্কতামূলক ব্যবস্থার মধ্যে পড়তে পারে- ১. মাস্ক ব্যবহারে আরও বেশি কড়াকড়ি আরোপ করা; ২. সামাজিক দূরত্ব মানার ব্যাপারে মানুষকে আরও সচেতন করা; ৩. জনগণকে দ্রুত করোনার টিকা দেওয়া। ২০২০ সাল ছিল করোনাভাইরাস সংক্রমণের ধাক্কাকে সামাল দেওয়া এবং করোনাভাইরাসকে পরাজিত করার কার্যকর টিকার আবিষ্কার। এ দুটোতেই আমরা অনেকটাই সফল হয়েছি। শুধু একটা নয়, প্রায় ১০টার মতো কার্যকরী করোনাভাইরাস প্রতিরোধী টিকা এখন বিশ্ববাসীর হাতে। আরও বিভিন্ন ধরনের করোনাভাইরাস প্রতিরোধী টিকা আবিষ্কারের পথে বিভিন্ন দেশ। যদিও ২০২০ সাল ছিল করোনাভাইরাস সংক্রমণের ধাক্কাকে সামাল দেওয়া এবং করোনাভাইরাসকে পরাজিত করার কার্যকর টিকার আবিষ্কার করা একটা বছর, ২০২১ সাল কিন্তু টিকার মাধ্যমে করোনাভাইরাসকে পরাজিত করার বছর।

আমার বর্তমান কর্মস্থল ফিনল্যান্ড ফাইজার অ্যান্ড বায়োএনটেক থেকে প্রথম ব্যাচে সাত হাজার ৯৫০ ডোজ করোনার টিকা পায় ২৬ ডিসেম্বর ২০২০। পরদিন ২৭ ডিসেম্বর প্রথম দলে কয়েকজন সামনের সারির আইসিইউ স্বাস্থ্যকর্মী দিয়ে করোনার টিকাদান কর্মসূচি শুরু করে। পরে পান করোনা রোগীদের দেখাশোনায় কমর্রত স্বাস্থ্যকর্মী এবং প্রবীণ যত্ন নিবাসের কর্মী ও বাসিন্দারা। এর পরেই অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সাধারণ জনগণের মধ্যে করোনার টিকাদান শুরু হয়। আলোচ্য বিষয় হলো কীভাবে ফিনল্যান্ড করোনার টিকা দেওয়ার ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার নির্ণয় করছে এবং বাংলাদেশ কীভাবে এই মডেল থেকে উপকৃত হতে পারে জনগণকে করোনার টিকাদানের ক্ষেত্রে। করোনার টিকা ফিনল্যান্ডে বসবাসকারীদের দেওয়া হচ্ছে বিনামূল্যে এবং টিকা নেওয়া বা না নেওয়ার ক্ষেত্রে ফিনিশরা স্বাধীন। আমরা সবাই জানি, উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে আমাদের সম্পদ সীমিত, তবুও করোনার টিকা বাংলাদেশে সবাইকে দেওয়া হচ্ছে বিনামূল্যে এবং এটা যত দ্রুত করা যায়, ততই মঙ্গল। টিকা আমদানির পাশাপাশি আমাদের কৌশল হওয়া উচিত দেশেই করোনার টিকা তৈরি। আর এ ক্ষেত্রে বিশেষ প্রয়োজন দেশীয় ওষুধ প্রস্তুতকারক কোম্পানিগুলোর সঙ্গে বিদেশি টিকা প্রস্তুতকারকদের কৌশলগত চুক্তি এবং দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা। সরকার এখানে দিকনির্দেশনা দানকারীর ভূমিকা পালন করতে পারে, করতে হবেও।

যদিও টিকা নেওয়া বা না নেওয়ার ক্ষেত্রে ফিনিশরা স্বাধীন, তবে অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে যার যখন টিকা নেওয়ার পালা আসছে, সে কিন্তু টিকা নেওয়া বাদ দিচ্ছে না এবং আমিও নেওয়ার দলে। আমি বলব যে, আপনার যখন করোনার টিকা নেওয়ার পালা আসবে, আপনিও নেবেন। অন্যকেও করোনার টিকা নেওয়ার ব্যাপারে উদ্বুদ্ধ করবেন। সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এভাবেই আমরা একদিন করোনাভাইরাসকে সমূলে পরাজিত করব। ফিনল্যান্ডের জনগণকে করোনাভাইরাসের টিকা দেওয়ার ক্ষেত্রে দুটো বিষয় গুরুত্ব দিচ্ছে আর তা হলো বয়স এবং ঝুঁকি। আমাদের এ কথা ভুলে গেলে চলবে না, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত এবং তা থেকে ক্ষতির আশঙ্কা বেড়ে যায়। আবার যাদের ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, স্থূলতা এবং হৃদযন্ত্রের সমস্যা আছে, তারাও কিন্তু করোনাভাইরাসে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। বাংলাদেশেও টিকা গ্রহণকারী একইভাবে নির্বাচন করা হচ্ছে, তবে টিকার সরবরাহ এবং চাহিদার মধ্যে অনেক ফারাক।

ফিনল্যান্ড তার প্রাপ্তবয়স্ক সব নাগরিকের করোনাভাইরাসের টিকাদান কর্মসূচি আগস্ট-২০২১-এর মধ্যে শেষ করার পরিকল্পনা নিয়েছে। আয়তনের তুলনায় ফিনল্যান্ড বাংলাদেশের চেয়ে আড়াই গুণ বড় হলেও এর জনসংখ্যা মাত্র ৫ দশমিক ৫ মিলিয়ন আর আমাদের কোথায় ১৬০ মিলিয়নেরও বেশি। তাই স্বাভাবিকভাবেই আমাদের টিকাদানের সময়, গতি এবং অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত ব্যক্তি সবই বেশ ভিন্ন হতে পারে, এটাই স্বাভাবিক। অবশ্যই স্বাস্থ্য খাতে নিয়োজিত সব কর্মকর্তা-কর্মচারীকে প্রথমে টিকার আওতায় আনতে হবে, এরই মধ্যে হয়েছেও হয়তো। তার পরেই আমাদের যেটা মনে রাখতে হবে, শিক্ষাই একটা জাতির মেরুদণ্ড, যার ওপর ভর করে একটা দেশ, জাতি এবং সমাজ চলে। বাংলাদেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো কিন্তু ২০২০ সালের ২৭ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত বন্ধ আছে। কখন যে এগুলো খুলবে, তা এখনও নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। আর এ বন্ধের একমাত্র কারণ হচ্ছে করোনা অতিমারি। আর কালক্ষেপণ না করে আগামীতে টিকার চালান পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই শিক্ষা খাতের সঙ্গে যুক্ত সবাইকে করোনার টিকার আওতায় এনে প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দিতে হবে।

এ মুহূর্তের করোনার টিকা পাওয়ার আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে যা দেখা যাচ্ছে তা হলো, উন্নত বিশ্ব টিকা পাওয়ার ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার পাচ্ছে। হয়তো বা এটাই স্বাভাবিক বিশ্ব রাজনীতিতে। তাই দেশে উৎপাদনের চেষ্টার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের টিকা পাওয়ার চেষ্টা বহুমুখী করতে হবে, অর্থাৎ একসঙ্গেই চীন, ভারত, রাশিয়া, ইউরোপ ও আমেরিকামুখী হওয়া। প্রয়োজনে টিকা পাওয়ার জন্য লবিস্ট নিয়োগ করা যেতে পারে। আমাদের মনে রাখতে হবে, ১৬ কোটি মানুষের টিকাদান কর্মসূচি একটা বিশাল কাজ। এ কাজে আমাদের জিততেই হবে, হারার কোনো অবকাশ নেই, থাকতে পারেও না। এ বিশাল জনসংখ্যার টিকাদানে অনেক অর্থের প্রয়োজন। সরকার বৈদেশিক ঋণ ছাড়াও স্থানীয়ভাবে টিকা ক্রয়ে অর্থ সংস্থান করছে। প্রয়োজনে সরকার করোনার টিকা ক্রয় নামে একটা ফান্ড গঠন করতে পারে, যাতে সমাজের বিত্তবান ছাড়াও প্রবাসী বাংলাদেশিরা সাহায্যের হাত বাড়াতে পারে। এভাবেই নিশ্চিত হতে পারে দ্রুততম সময়ের মধ্যে বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষকে বিনামূল্যে করোনার টিকা দেওয়ার প্রচেষ্টা। আমাদের লক্ষ্য হতে পারে ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশে সবাই করোনার টিকা পাবে। পথের পাশে শুয়ে থাকা মানুষটিও যেন টিকা পায়। এভাবে আমরা স্বল্প সময়ে করোনাভাইরাসকে বাংলাদেশের মাটি থেকে সমূলে উৎপাটিত করব। আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো আবারও মুখর হবে শিক্ষার্থীদের কোলাহলে। আমরা এগিয়ে যাব, বাংলাদেশ এগিয়ে যাবে।

আরও পড়ুন

×