ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

এই ঠান্ডায় বিভিন্ন রোগ ও প্রতিকার

এই ঠান্ডায় বিভিন্ন রোগ ও প্রতিকার
×

 নাফিসা আবেদীন 

প্রকাশ: ০৬ জানুয়ারি ২০২৬ | ০৭:৩১

| প্রিন্ট সংস্করণ

ঋতুচক্রের আবর্তনে হেমন্তের বিদায় আর শীতের আগমনে প্রকৃতিতে এক অনন্য রূপান্তর লক্ষ্য করা যায়। ভোরের কুয়াশাচ্ছন্ন চাদর আর শিশিরভেজা ঘাস যেমন আমাদের মনে নতুনের আহ্বান জানায়, তেমনি জনজীবনে এই শীতল আবহাওয়া কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত স্বাস্থ্য সমস্যাও বয়ে আনে। বিশেষ করে শহুরে যান্ত্রিক জীবনের ধুলাবালি এবং গ্রামবাংলার হিমেল বাতাসের ভিন্ন ভিন্ন প্রভাবে মানবদেহের অভ্যন্তরীণ জৈবিক প্রক্রিয়ায় এক ধরনের অসামঞ্জস্য তৈরি হয়। তাপমাত্রার এই হঠাৎ পতন আমাদের শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে, যার ফলে শরীর পরিবেশের সঙ্গে দ্রুত খাপ খাইয়ে নিতে হিমশিম খায়। এই সুযোগে বিভিন্ন ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়া সক্রিয় হয়ে ওঠে, যা সর্দি-কাশি থেকে শুরু করে শ্বাসকষ্ট বা ত্বকের নানা জটিলতা তৈরি করে। শিশু এবং বয়স্কদের শরীরের সহনশীলতা তুলনামূলক কম হওয়ায় এই সময়টি তাদের জন্য অত্যন্ত সংবেদনশীল। তাই ঋতু পরিবর্তনের এই সন্ধিক্ষণে সামান্য অসতর্কতা দীর্ঘমেয়াদি ভোগান্তির কারণ হতে পারে।

শীতকালীন সাধারণ রোগ
শীতকালে প্রধানত বায়ুবাহিত এবং ভাইরাসজনিত রোগের প্রাদুর্ভাব বাড়ে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো–

সাধারণ সর্দি-কাশি ও ইনফ্লুয়েঞ্জা
বাতাসে আর্দ্রতা কম থাকায় এবং ধূলিকণা বেশি থাকায় খুব সহজেই রাইনোভাইরাস বা ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাসের সংক্রমণ ঘটে। এর ফলে নাক বন্ধ হওয়া, হাঁচি, গলা ব্যথা এবং হালকা জ্বর হতে পারে।

শ্বাসকষ্ট ও অ্যাজমা
শুষ্ক বাতাস এবং কুয়াশার সঙ্গে মিশে থাকা ধূলিকণা ফুসফুসের শ্বাসনালিতে উদ্দীপনা সৃষ্টি করে। ফলে যাদের আগে থেকেই হাঁপানি বা অ্যালার্জির সমস্যা আছে, 
শীতকালে তাদের কষ্ট অনেকাংশেই বেড়ে যায়। এছাড়া ছোট শিশুদের ক্ষেত্রে নিউমোনিয়ার ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়।

টনসিলাইটিস ও সাইনোসাইটিস
ঠান্ডার প্রভাবে গলার টনসিলে প্রদাহ বা সাইনাসে কফ জমে তীব্র ব্যথা হতে পারে। বিশেষ করে সকালে ও রাতে এই সমস্যা 
প্রকট হয়।

ডায়রিয়া
অনেক সময় শীতে রোটা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব ঘটে, যা শিশুর পাতলা পায়খানা বা ‘উইন্টার ডায়রিয়া’র কারণ হয়ে দাঁড়ায়। দূষিত পানি বা ঠান্ডা খাবার থেকে এই সংক্রমণ হতে পারে।

ত্বকের রুক্ষতা ও চর্মরোগ
শীতে বাতাসে আর্দ্রতা কমে যাওয়ায় ত্বক 
দ্রুত পানিশূন্য হয়ে পড়ে। ফলে ত্বক ফেটে যাওয়া, চুলকানি এবং একজিমার মতো সমস্যা দেখা দেয়।
প্রতিরোধ ও প্রতিকারের উপায়
সচেতনতা এবং সঠিক জীবনযাত্রা অনুসরণের মাধ্যমে আমরা এই রোগগুলো থেকে দূরে থাকতে পারি।

পুষ্টিকর খাদ্যাভ্যাস
শীতকালীন রঙিন শাকসবজি এবং ফলমূল রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে কার্যকর। ভিটামিন-সি সমৃদ্ধ ফল যেমন লেবু, কমলা, আমলকী প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় রাখুন। এছাড়া প্রতিদিন সকালে খালি পেটে এক চামচ মধু ও কালোজিরা খাওয়ার অভ্যাস করলে শরীর ভেতর থেকে গরম থাকে। আদা চা বা তুলসি পাতার রস গলাব্যথা ও কাশি উপশমে জাদুর মতো কাজ করে।

পর্যাপ্ত পানি পান ও সূর্যালোক 
শীতে তৃষ্ণা কম লাগে বলে অনেকেই পানি পান কমিয়ে দেন, যা ডিহাইড্রেশন তৈরি করে। শরীরকে আর্দ্র রাখতে নিয়মিত কুসুমগরম পানি পান করুন। পাশাপাশি প্রতিদিন অন্তত ২০-৩০ মিনিট গায়ে রোদ লাগানোর চেষ্টা করুন। সূর্যালোক থেকে পাওয়া ভিটামিন-ডি হাড়ের সুস্থতা ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে।

পোশাক নির্বাচনে সতর্কতা
হঠাৎ ঠান্ডা লাগানো যাবে না। শরীরের তাপমাত্রা ধরে রাখতে স্তরে স্তরে গরম কাপড় পরুন। কান এবং গলা ঢেকে রাখার জন্য মাফলার বা টুপি ব্যবহার করা জরুরি, কারণ শরীরের তাপমাত্রা বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই মাথা ও কান দিয়ে বেরিয়ে যায়।

পরিচ্ছন্নতা ও মাস্ক ব্যবহার
যেহেতু শীতকালে বাতাসে ধূলিকণা বেশি থাকে, তাই বাইরে বের হওয়ার সময় অবশ্যই মাস্ক ব্যবহার করুন। এটি আপনাকে ধুলোবালি এবং ভাইরাস–উভয় থেকেই রক্ষা করবে। বাইরে থেকে ফিরে সাবান দিয়ে ভালোভাবে হাত ধোয়ার অভ্যাস বজায় রাখুন।

মানসিক স্বাস্থ্যের যত্ন 
শীতের দীর্ঘ রাত ও ছোট দিন অনেক সময় মনের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে, যাকে বিশেষজ্ঞরা ‘উইন্টার ব্লুজ’ বা সিজনাল এফেক্টিভ ডিসঅর্ডার বলেন। এ সময় প্রিয়জনদের সঙ্গে সময় কাটানো এবং নিজেকে সৃজনশীল কাজে ব্যস্ত রাখা মানসিক প্রশান্তি দেয়। শীতের এই সময়টিকে উপভোগ্য করতে হলে সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করা সবার আগে প্রয়োজন। সামান্য অবহেলা অনেক সময় বড় জটিলতা তৈরি করতে পারে। তাই উপসর্গ দেখা দিলে ঘরোয়া প্রতিকারের পাশাপাশি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে দ্বিধা করবেন না। পরামর্শ নিয়ে সঠিক চিকিৎসা শুরু করা উচিত। v
 [বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক]
 

আরও পড়ুন

×