ঢাকা মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬

হাম: জানতে হবে যে সব বিষয়

হাম: জানতে হবে যে সব বিষয়
×
×

  অধ্যাপক ডা. আবদুল্লাহ শাহরিয়ার 

প্রকাশ: ২৭ অক্টোবর ২০২৬ | ০৭:৫৬

| প্রিন্ট সংস্করণ

একটি শিশুর হাসি যেমন একটি পরিবারের সবচেয়ে বড় আনন্দ, তেমনি প্রতিরোধযোগ্য রোগের কারণে সেই হাসি ম্লান হয়ে যাওয়া সবার জন্যই বেদনাদায়ক। বাংলাদেশে শিশুদের মধ্যে হামের সংক্রমণ নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। এ পরিস্থিতি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, সামান্য অসচেতনতা ও টিকাদানে ঘাটতি বড় বিপদের কারণ হতে পারে।
কতটা ভয়ংকর হাম?

হাম পৃথিবীর অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগগুলোর একটি। একজন আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে এলে টিকা না নেওয়া বা রোগ প্রতিরোধক্ষমতা তৈরি না হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে সংক্রমণের ঝুঁকি অনেক বেশি। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, একজন আক্রান্ত ব্যক্তির মাধ্যমে গড়ে ১২ থেকে ১৮ জন পর্যন্ত সংক্রমিত হতে পারে। আক্রান্ত ব্যক্তির কাশি, হাঁচি ও শ্বাসতন্ত্র থেকে নির্গত কণার মাধ্যমে ভাইরাস বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে। আক্রান্ত ব্যক্তি কোনো স্থান ছেড়ে যাওয়ার পরও সেখানে ভাইরাস প্রায় দুই ঘণ্টা সক্রিয় থাকতে পারে।

হামের প্রাথমিক লক্ষণগুলো হলো—
lউচ্চ জ্বর lকাশি ও নাক দিয়ে পানি পড়া lচোখ লাল হয়ে যাওয়া ও পানি পড়া lমুখের ভেতরে ছোট সাদা দাগ, যা কপলিক স্পট নামে পরিচিত lকয়েক দিন পর মুখ ও মাথা থেকে শুরু হয়ে শরীরের অন্যান্য অংশে ছড়িয়ে পড়া লালচে ফুসকুড়ি

জটিলতা: অবহেলার সুযোগ নেই
হামকে হালকা রোগ ভেবে অবহেলা করা উচিত নয়। বিশেষ করে পাঁচ বছরের কম বয়সী, অপুষ্টিতে ভোগা এবং রোগ প্রতিরোধক্ষমতা দুর্বল শিশুদের ক্ষেত্রে এটি গুরুতর হতে পারে। সম্ভাব্য জটিলতার মধ্যে রয়েছে–
lনিউমোনিয়া lডায়রিয়া ও পানিশূন্যতা
lকানের সংক্রমণ lমস্তিষ্কে প্রদাহ বা এনসেফালাইটিস lচোখের গুরুতর সমস্যা
lদীর্ঘ সময় ধরে রোগ প্রতিরোধক্ষমতা দুর্বল হয়ে থাকা। এসব জটিলতা কখনও কখনও শিশুর জীবনও বিপন্ন করতে পারে।
জন্মগত হৃদরোগে আক্রান্ত শিশু: তারা কি বেশি ঝুঁকিতে?
একজন শিশু হৃদ্‌রোগ বিশেষজ্ঞ হিসেবে জন্মগত হৃদরোগে আক্রান্ত শিশুদের ক্ষেত্রে সংক্রমণজনিত জটিলতার বিষয়ে বাড়তি সতর্কতার গুরুত্ব তুলে ধরতে চাই। তবে সব শিশুর ঝুঁকি এক রকম নয়। হৃদ্‌রোগের ধরন ও তীব্রতা, হৃদ্‌যন্ত্রের কার্যক্ষমতা, ফুসফুসের অবস্থা এবং শিশুর পুষ্টির ওপর ঝুঁকি নির্ভর করে।
বিশেষ সতর্কতা প্রয়োজন–

lযেসব শিশুর জন্মগত হৃদ্‌রোগের সমস্যা এখনও সম্পূর্ণ সংশোধন করা হয়নি lযাদের হৃদ্‌যন্ত্রের কার্যক্ষমতা কম বা হৃদ্‌যন্ত্রের অকার্যকারিতা রয়েছে lযাদের ফুসফুসে রক্তপ্রবাহ অস্বাভাবিকভাবে বেশি
lযেসব শিশু অপুষ্টিতে ভুগছে বা বারবার গুরুতর সংক্রমণে আক্রান্ত হচ্ছে হামের কারণে নিউমোনিয়া হলে আগে থেকেই হৃদ্‌যন্ত্র বা ফুসফুসের সমস্যায় ভোগা শিশুর শ্বাসকষ্ট ও অক্সিজেনের ঘাটতি বাড়তে পারে। জ্বর ও সংক্রমণের সময় শরীরের অক্সিজেনের চাহিদাও বেড়ে যায়। পানিশূন্যতা এবং শরীরের লবণের ভারসাম্য নষ্ট হলে শিশুর শারীরিক অবস্থা আরও জটিল হতে পারে। তাই এসব শিশুর ক্ষেত্রে লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া জরুরি।
এসব শিশুর জন্য বিশেষ সতর্কতা

টিকাদানে বিলম্ব নয়
জাতীয় টিকাদান কর্মসূচির নির্ধারিত সময় অনুযায়ী শিশুকে হাম-রুবেলার (এমআর) টিকা দিতে হবে। টিকার কোনো ডোজ বাদ পড়লে বা শিশুর টিকাদানের অবস্থা নিয়ে সন্দেহ থাকলে চিকিৎসক বা টিকাদানকেন্দ্রের পরামর্শ নিন। হামের সংস্পর্শে আসার পর কিছু ক্ষেত্রে দ্রুত বিশেষ প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া যায়। তবে তা শিশুর বয়স, টিকাদানের ইতিহাস ও শারীরিক অবস্থার ওপর নির্ভর করে; তাই দ্রুত চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করা প্রয়োজন।

সংক্রমণের ঝুঁকি কমানো
হামে আক্রান্ত বা জ্বর-কাশি-ফুসকুড়িতে অসুস্থ ব্যক্তির সংস্পর্শ এড়িয়ে চলুন। পরিবারের কোনো সদস্যের হাম সন্দেহ হলে হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত শিশুকে তাঁর কাছ থেকে আলাদা রাখুন। হাম সন্দেহ হলে হাসপাতালে যাওয়ার আগে ফোন করে জানালে অন্য রোগীদের মধ্যে সংক্রমণ ছড়ানোর ঝুঁকি কমানো সম্ভব।

দ্রুত চিকিৎসা গ্রহণ
শিশুর জ্বর, কাশি, চোখ লাল হওয়া বা ফুসকুড়ি দেখা দিলে দেরি না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। শ্বাসকষ্ট, খিঁচুনি, অস্বাভাবিক নিস্তেজতা, পানি পান করতে না পারা বা প্রস্রাব কমে যাওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দিলে জরুরি চিকিৎসা প্রয়োজন। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া নিজে থেকে ওষুধ বা উচ্চমাত্রার ভিটামিন এ দেওয়া উচিত নয়।

পুষ্টি ও নিয়মিত পর্যবেক্ষণ
শিশুর বয়স অনুযায়ী সুষম খাবার নিশ্চিত করতে হবে। জন্মগত হৃদরোগে আক্রান্ত শিশুর নিয়মিত হৃদ্‌রোগসংক্রান্ত পরীক্ষা ও চিকিৎসকের ফলোআপ বজায় রাখাও গুরুত্বপূর্ণ।
প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায় টিকা
হাম প্রতিরোধে টিকাদানই সবচেয়ে কার্যকর উপায়। প্রতিটি শিশুর নির্ধারিত সময় অনুযায়ী টিকা নেওয়া নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে অপুষ্টি প্রতিরোধ, সংক্রমণের লক্ষণ সম্পর্কে সচেতনতা এবং দ্রুত চিকিৎসা গ্রহণের মাধ্যমে গুরুতর জটিলতার ঝুঁকি কমানো সম্ভব। বিশেষ করে জন্মগত হৃদরোগে আক্রান্ত শিশুর ক্ষেত্রে পরিবারের সচেতনতা ও চিকিৎসকের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ শিশুর নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। 
[পেডিয়াট্রিক কার্ডিওলজি বিভাগ, জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল] 

আরও পড়ুন

×