স্ট্রোক -ঝুঁকি কমাতে দ্রুত চিকিৎসা নিন
ডা. হুমায়ুন কবীর হিমু
প্রকাশ: ২৭ অক্টোবর ২০২৬ | ০৭:৫৭
| প্রিন্ট সংস্করণ
স্ট্রোক বিশ্বব্যাপী মৃত্যু ও দীর্ঘমেয়াদি প্রতিবন্ধিতার অন্যতম প্রধান কারণ। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালে স্ট্রোক ছিল বিশ্বের মৃত্যুর দ্বিতীয় প্রধান কারণ। স্ট্রোকে আক্রান্ত ব্যক্তির জীবন বাঁচাতে এবং পঙ্গুত্বের ঝুঁকি কমাতে দ্রুত চিকিৎসা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ কারণে প্রতিবছর ২৯ অক্টোবর বিশ্ব স্ট্রোক দিবস পালিত হয়।
এ দিবসের মূল লক্ষ্য স্ট্রোক প্রতিরোধ, লক্ষণ শনাক্তকরণ ও আধুনিক চিকিৎসা সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো।
স্ট্রোকের ক্ষেত্রে সময় নষ্ট করার সুযোগ নেই। অনেক সময় রোগীর পরিবারের সদস্যরা প্রথমে বুঝতে পারেন না যে তিনি স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়েছেন। আবার কেউ কেউ বাড়িতে অপেক্ষা করেন বা প্রচলিত চিকিৎসার ওপর নির্ভর করেন। এতে কার্যকর চিকিৎসা পাওয়ার সুযোগ কমে যেতে পারে। তাই স্ট্রোকের লক্ষণ দেখা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে রোগীকে হাসপাতালে নেওয়া জরুরি
স্ট্রোকের আধুনিক চিকিৎসা
স্ট্রোকের একটি প্রধান ধরন হলো ইস্কেমিক স্ট্রোক। মস্তিষ্কের কোনো রক্তনালিতে রক্ত জমাট বেঁধে রক্ত চলাচল বন্ধ হলে এ ধরনের স্ট্রোক হয়। ফলে মস্তিষ্কের আক্রান্ত অংশ অক্সিজেনের অভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে শুরু করে। এর চিকিৎসায় গুরুত্বপূর্ণ পদ্ধতি হলো শিরাপথে রক্ত জমাট গলানোর ওষুধ প্রয়োগ, যাকে আইভি থ্রোম্বোলাইসিস বলা হয়। উপযুক্ত রোগীর ক্ষেত্রে সাধারণত উপসর্গ শুরুর সাড়ে চার ঘণ্টার মধ্যে এ চিকিৎসা দেওয়া যায়। অ্যাল্টেপ্লেজ বা টেনেক্টেপ্লেজের মতো ওষুধ জমাট রক্ত গলাতে সাহায্য করে। তবে সবার জন্য এ চিকিৎসা উপযুক্ত নয়; পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর চিকিৎসক সিদ্ধান্ত নেন।
মেকানিক্যাল থ্রোমবেকটমি কী?
বড় রক্তনালিতে রক্ত জমাট বেঁধে গেলে নির্বাচিত রোগীর ক্ষেত্রে মেকানিক্যাল থ্রোমবেকটমি করা যায়। এটি ক্যাথেটারভিত্তিক আধুনিক চিকিৎসা। কুঁচকির রক্তনালি দিয়ে সরু নল প্রবেশ করিয়ে বিশেষ যন্ত্রের সাহায্যে মস্তিষ্কের বন্ধ রক্তনালি পর্যন্ত পৌঁছানো হয়। এরপর জমাট রক্ত টেনে বের করা হয় অথবা স্টেন্ট রিট্রিভার নামের যন্ত্র দিয়ে আটকে সরিয়ে নেওয়া হয়। এতে রক্তনালি খুলে গিয়ে মস্তিষ্কে রক্ত চলাচল পুনরায় শুরু হতে পারে।
কেন প্রতিটি মিনিট গুরুত্বপূর্ণ?
রক্তনালি বন্ধ হলে মস্তিষ্কের কিছু কোষ দ্রুত স্থায়ীভাবে নষ্ট হয়ে যায়। এর চারপাশে এমন কিছু কোষ থাকে, যেখানে রক্ত চলাচল কমলেও সেগুলো কিছু সময় বেঁচে থাকতে পারে। দ্রুত রক্ত সরবরাহ পুনরুদ্ধার করা গেলে এসব কোষকে রক্ষা করার সম্ভাবনা থাকে। কিন্তু চিকিৎসায় দেরি হলে সেগুলোও নষ্ট হয়ে যেতে পারে। তাই স্ট্রোকের লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া জরুরি।
কতক্ষণ পর্যন্ত চিকিৎসা সম্ভব?
আগে মেকানিক্যাল থ্রোমবেকটমি মূলত উপসর্গ শুরুর প্রথম ছয় ঘণ্টার মধ্যে করা হতো। পরবর্তী গবেষণায় দেখা গেছে, উপযুক্ত রোগীকে মস্তিষ্কের স্ক্যান ও অন্যান্য মানদণ্ডের ভিত্তিতে নির্বাচন করা গেলে কিছু ক্ষেত্রে ৬ থেকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যেও এ চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব। তবে সব রোগীর ক্ষেত্রে এটি প্রযোজ্য নয়। ২৪ ঘণ্টা পর্যন্ত অপেক্ষা করাও নিরাপদ নয়; যত দ্রুত সম্ভব হাসপাতালে পৌঁছাতে হবে।
বাংলাদেশে চিকিৎসার সুযোগ
বাংলাদেশে মেকানিক্যাল থ্রোমবেকটমি এখনও সর্বত্র সহজলভ্য নয়। প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি, প্রশিক্ষিত চিকিৎসক ও বিশেষায়িত কেন্দ্রের অভাব এ চিকিৎসা সম্প্রসারণের বড় বাধা। এ চিকিৎসা সম্পর্কে জনসচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে সেবার সুযোগ সম্প্রসারণ জরুরি। চিকিৎসার ব্যয় কমানো এবং বিভাগীয় শহরগুলোতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্যোগও গুরুত্বপূর্ণ।
সাফল্যের সম্ভাবনা
বড় রক্তনালি বন্ধ হয়ে স্ট্রোক হলে মৃত্যুঝুঁকি ও গুরুতর পঙ্গুত্বের আশঙ্কা বেশি থাকে। উপযুক্ত রোগীর ক্ষেত্রে মেকানিক্যাল থ্রোমবেকটমি মৃত্যুঝুঁকি ও দীর্ঘমেয়াদি অক্ষমতা কমাতে পারে। তবে সাফল্য নির্ভর করে রোগীর অবস্থা, মস্তিষ্কের ক্ষতির মাত্রা এবং চিকিৎসা শুরু করার সময়ের ওপর। সব রোগী পুরোপুরি সুস্থ হবেন–এমন নিশ্চয়তা দেওয়া যায় না।
স্ট্রোকের লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে মুখ বেঁকে যাওয়া, এক হাত বা পা দুর্বল হয়ে পড়া এবং কথা জড়িয়ে যাওয়া। এসব লক্ষণ দেখা দিলে দেরি না করে জরুরি বিভাগে যেতে হবে। নিজে থেকে ওষুধ না নিয়ে চিকিৎসকের সহায়তা নিতে হবে। সময়মতো সঠিক চিকিৎসা জীবন বাঁচাতে এবং পঙ্গুত্বের ঝুঁকি কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
[সহকারী অধ্যাপক, ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস]
- বিষয় :
- চিকিৎসা