ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিলের সম্মেলনে অর্থমন্ত্রী

ভুয়া আর্থিক প্রতিবেদন দেখিয়ে ব্যাংক লুট করা হয়েছে

ভুয়া আর্থিক প্রতিবেদন দেখিয়ে ব্যাংক লুট করা হয়েছে
×

গতকাল বুধবার রাজধানীর সােনারগাঁও হােটেলে এফআরসি আয়ােজিত সম্মেলনে বক্তব্য দেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী - ফটাে রিলিজ

সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ২১ মে ২০২৬ | ০৭:৪১ | আপডেট: ২১ মে ২০২৬ | ০৭:৪১

| প্রিন্ট সংস্করণ

বিগত বছরগুলোতে ভুয়া আর্থিক প্রতিবেদন দেখিয়ে ঋণ নিয়ে ব্যাংক লুট করা হয়েছে। একইভাবে কোম্পানি তালিকাভুক্ত হয়েছে শেয়ারবাজারে। এর ফলে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো প্রায় অকার্যকর হয়ে পড়েছিল। বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধারে আর্থিক প্রতিবেদনে স্বচ্ছতা নিশ্চিতের বিকল্প নেই। বর্তমান সরকার স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়তে বদ্ধপরিকর।

অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিল (এফআরসি) আয়োজিত আর্থিক হিসাব এবং রিপোর্টিং বিষয়ক সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন। গতকাল বুধবার রাজধানীর সোনারগাঁও হোটেলে এ সম্মেলন আয়োজনে সহযোগিতা করে ইনস্টিটিউট অব চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস অব বাংলাদেশ (আইসিএবি) এবং ইনস্টিটিউট অব কস্ট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্ট্যান্টস অব বাংলাদেশ (আইসিএমএবি)। 

সম্মেলনে বিশেষ অতিথি ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়বিষয়ক উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। সভাপতিত্ব করেন অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক বিভাগের সচিব ড. মো. খায়েরুজ্জামান মজুমদার। স্বাগত বক্তব্য দেন এফআরসির চেয়ারম্যান ড. মো. সাজ্জাদ হোসেন ভূঁইয়া। 

অর্থমন্ত্রী বলেন, বিগত বছরগুলোতে আর্থিক শৃঙ্খলার অভাব এবং মিথ্যা তথ্য উপস্থাপনের মাধ্যমে ব্যাংকগুলো থেকে বিপুল পরিমাণ টাকা বের করে নেওয়া হয়েছে। যখন ভুয়া তথ্য দেওয়ার মাধ্যমে কোনো কোম্পানি শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হয়, তখন ভালো মৌলভিত্তিসম্পন্ন কোম্পানিগুলো বাজারে আসতে চায় না। ফলে একটি অসুস্থ প্রতিযোগিতার সৃষ্টি হয়।
তিনি বলেন, দেশের ভালো ভালো কোম্পানি এখন পুঁজির ঘাটতিতে রয়েছে। ন্যায্য প্রতিযোগিতা না থাকার কারণে এমন হয়েছে। ব্যাংকে টাকা রাখেন আমানতকারীরা। আর ব্যাংক মালিকরা পর্ষদে বসে নিজেদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট ঋণ অনুমোদন করেন। 

অর্থমন্ত্রী ঘোষণা দেন, সরকার একটি স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার দিকে যাচ্ছে, যেখানে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করতে হবে। তিনি আইসিএবি, আইসিএমএবিসহ পেশাজীবী সংগঠনগুলোকে স্বপ্রণোদিত নিয়ন্ত্রণের পরামর্শ দেন। এ ক্ষেত্রে ভালো উদাহরণ হিসেবে তিনি বাণিজ্যমন্ত্রী থাকাকালে রপ্তানির জন্য ইউটিলাইজেশন সনদ ইস্যুর (ইউডি) দায়িত্ব ইপিবির পরিবর্তে বিজিএমইএর হাতে দেওয়ার কথা উল্লেখ করেন। 
আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, বর্তমানে জেপি মরগানসহ বিশ্বের বড় বিনিয়োগ তহবিলের ব্যবস্থাপকরা বাংলাদেশে বিনিয়োগে আগ্রহ দেখাচ্ছে। তারা হংকংয়ে বাংলাদেশকেন্দ্রিক ফান্ড করতে চায়। কিন্তু এর জন্য অডিট রিপোর্ট এবং আর্থিক তথ্যের ওপর তাদের আস্থা থাকতে হবে। 

মিথ্যা তথ্যের ভিত্তিতে লুটপাটের দিন শেষ
ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, অতীতে দেশের আর্থিক প্রতিবেদনগুলো তৈরি হয়েছে চরম খামখেয়ালিপনায়। যেখানে অডিট মান মানা হয়নি এবং অডিট ফার্মগুলো নিজেরাই নিজেদের বিচারক হয়ে দাঁড়িয়েছিল। তিনি বলেন, ‘উত্তরাধিকার সূত্রে আমরা একটি বিশৃঙ্খল ব্যাংকিং খাত পেয়েছি, যেখানে ভুয়া আর্থিক প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে বড় বড় ঋণ দেওয়া হয়েছে।’ 
তিনি আরও বলেন, ভুয়া আর্থিক প্রতিবেদন দেখে হাজার হাজার সাধারণ বিনিয়োগকারী পুঁজিবাজারে তাদের কষ্টার্জিত অর্থ হারিয়েছেন। যারা বেশি মিথ্যা বলেছে, তারাই বেশি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে এবং লুটপাট করেছে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের আর্থিক প্রতিবেদনের বিশ্বাসযোগ্যতা তলানিতে ঠেকেছে, যার ফলে বিদেশি বিনিয়োগ ব্যাহত হচ্ছে। 

অন্য বক্তারা যা বলেছেন 
সম্মেলনের প্রথম সেশনে এনবিআরের চেয়ারম্যান আব্দুর রহমান ব্যাংকগুলোর খারাপ অবস্থার জন্য অডিট রিপোর্টের নিম্নমানকে দায়ী করেন এবং সঠিক চিত্র তুলে ধরার জন্য পেশাজীবী অ্যাকাউন্ট্যান্টদের প্রতি আহ্বান জানান। তিনি বলেন, কোম্পানিগুলো যখন ব্যাংক ঋণ নিতে যায় তখন খুব উজ্জ্বল চিত্র দেখায়, কিন্তু যখন এনবিআরে কর দিতে যায়, তখন লোকসান দেখায়। বহু কোম্পানি তাদের প্রকৃত আয়-ব্যয়ের তথ্য আর্থিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করে না। এ অবস্থাকে ‘ভয়াবহ’ বলে উল্লেখ করেন তিনি।

আইসিএবির সভাপতি মো. কাওসার আলম বলেন, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ সমৃদ্ধি এবং ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি হওয়ার লক্ষ্য অর্জনে প্রয়োজন ব্যাপক বিনিয়োগ। এই বিনিয়োগ তখনই সম্ভব যখন বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থা থাকবে। তথ্য ও স্বচ্ছতাই হচ্ছে সেই আস্থার ভিত্তি, যা পুঁজিবাজার এবং সামগ্রিক আর্থিক খাতে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করে। 
আইসিএমএবির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মো. রোকনুজ্জামান বলেন, কেবল আইন দিয়ে আর্থিক প্রতিবেদন স্বচ্ছ করা সম্ভব নয়, এর জন্য প্রয়োজন পেশাদার হিসাববিদের নৈতিকতা এবং সততা। তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, বাংলাদেশে পেশাদার হিসাববিদের তীব্র সংকট রয়েছে। বর্তমানে দেশে লক্ষাধিক নিবন্ধিত কোম্পানি থাকলেও মাত্র ৫ শতাংশ হিসাববিদ চর্চায় আছেন। 
বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাবু বলেন, বিজিএমইর সাত হাজার ২০০ সদস্যের মধ্যে বর্তমানে মাত্র দুই হাজার ২০০ কারখানা চালু আছে। অন্য অনেক কারণের পাশাপাশি ঠিকমতো আর্থিক হিসাব প্রস্তুত না করাও প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ার বড় কারণ।

বিটিএমএর সহসভাপতি আবুল কালাম বলেন, নির্ভরযোগ্য আর্থিক প্রতিবেদন কেবল আইনি বাধ্যবাধকতা নয়, এটি সুশাসনের মূল ভিত্তি। সম্পদের অতিরঞ্জিত মূল্যায়ন এবং খেলাপি ঋণ লুকিয়ে রাখার প্রবণতা ব্যাংকের আস্থা নষ্ট করে দিচ্ছে।
প্যানেল আলোচনায় আইসিএবির সহসভাপতি সুরাইয়া জান্নাত বলেন, আর্থিক প্রতিবেদনের প্রাথমিক দায়ভার ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের। শুধু স্বাক্ষর করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। ইউনিলিভার বাংলাদেশের প্রধান আর্থিক কর্মকর্তা জিনিয়া টি হক বলেন, বিদেশি বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশের বাজার নিয়ে আশাবাদী হলেও তারা এখানকার আর্থিক তথ্যের ওপর আস্থা রাখতে পারছেন না। 

আরও পড়ুন

×