সংকোচনমূলক ধারাতেই মুদ্রানীতি
ডিসেম্বর নাগাদ বেসরকারি খাতে ৬ দশমিক ৮০ শতাংশ ঋণ প্রবৃদ্ধির প্রাক্কলন
বিশেষ প্রতিনিধি
প্রকাশ: ০১ জুলাই ২০২৬ | ০৭:৫২
| প্রিন্ট সংস্করণ
চলমান উচ্চ মূল্যস্ফীতি কমাতে সংকোচনমূলক ধারাতেই থাকল মুদ্রানীতি। নীতি সুদহার ১০ শতাংশে অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। বর্তমান বিনিয়োগ পরিস্থিতি বিবেচনায় বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির প্রাক্কলন কমিয়ে ৬ দশমিক ৮০ শতাংশ ধরা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক মনে করে, বর্তমানের মূল্যস্ফীতি মূলত সরবরাহ চেইনের অদক্ষতা এবং বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার কারণে।
গতকাল মঙ্গলবার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সম্মেলন কক্ষে সংবাদ সম্মেলন করে গভর্নর মোস্তাকুর রহমান নতুন মুদ্রানীতি ঘোষণা করেন। ডেপুটি গভর্নর ড. মো. হাবিবুর রহমান মুদ্রানীতির ভঙ্গির ওপর একটি উপস্থাপনা তুলে ধরেন। এ সময় অন্য তিন ডেপুটি গভর্নর, প্রধান অর্থনীতিবিদসহ বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। এটি বর্তমান বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমানের প্রথম মুদ্রানীতি।
বর্তমান সরকার বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়ানোর ওপর অগ্রাধিকার দিয়েছে। উচ্চ সুদহার রেখে তা সম্ভব কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর বলেন, ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ থেকে কম সুদের ঋণ দেওয়া হবে। দক্ষতার সঙ্গে এই ঋণ বিতরণ করতে পারলে সেটি সম্ভব। এ জন্য করোনার সময়ের প্রণোদনা প্যাকেজের অভিজ্ঞতা নিয়ে এবার নীতি প্রণয়ন করা হয়েছে। একই সঙ্গে ঋণ-আমানতের মধ্যেকার সুদহারের গড় ব্যবধান (স্প্রেড) সর্বোচ্চ ৪ শতাংশ নির্ধারণ করে দেওয়ায় আমানতকারী ও ঋণগ্রহীতা উভয়ে লাভবান হবে।
জাতীয় বাজেটে আজ থেকে চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। পাশাপাশি মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫০ শতাংশের মধ্যে রাখার লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংক মনে করে, মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে রাখা সম্ভব হলেও জিডিপি প্রবৃদ্ধি হতে পারে ৬ দশমিক ১০ শতাংশ। আগামী ডিসেম্বর নাগাদ বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির প্রাক্কলন করা হয়েছে ৬ দশমিক ৮ শতাংশ। অর্থবছর শেষে ৮ শতাংশ। আগের মুদ্রানীতিতে গত জুন পর্যন্ত এটি সাড়ে ৮ শতাংশ প্রাক্কলন করা হয়েছিল। মে পর্যন্ত অর্জিত হয়েছে ৪ দশমিক ৯৮ শতাংশ।
মুদ্রা সরাবরাহের লক্ষ্যমাত্রা আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত সাড়ে ১১ শতাংশ। রিজার্ভ মানির প্রবৃদ্ধি সাড়ে ৭ শতাংশে নামানো হবে। নীতি সুদহারের ক্ষেত্রে রেপোতে ১০ শতাংশে অপরিবর্তিত রাখা ছাড়াও কেন্দ্রীয় ব্যাংকে ব্যাংকগুলো টাকা রাখতে এসডিএফ সাড়ে ৭ এবং বিশেষ ধারে ব্যবহৃত এসএলএফ রেট সর্বোচ্চ সাড়ে ১১ শতাংশে অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে।
ডেপুটি গভর্নর ড. হাবিবুর রহমান বলেন, মূল্যস্ফীতি কমানোকে প্রধান অগ্রাধিকার দিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক চায় ঋণের খরচ একটু বেশি থাকুক। একই সঙ্গে সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিভিন্ন প্রণোদনামূলক ব্যবস্থার কারণে আগামীতে অর্থনৈতিক কার্যক্রম জোরদার হবে। এতে অর্থবছর শেষে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি বেড়ে ৮ শতাংশে উন্নীত হবে। আগামী অর্থবছর শেষে সরকারের লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী জিডিপি প্রবৃদ্ধি এবং মূল্যস্ফীতি থাকবে বলে আশা করা যায়।
খেলাপি ঋণ কমাতে আর বিশেষ পুনঃতপশিল নয়
সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর বলেন, ‘বারবার পুনঃতপশিলের মাধ্যমে সামান্য কিছু অর্থ দিয়ে দীর্ঘ মেয়াদে ঋণ পরিশোধ না করার সুযোগ পেয়ে যাচ্ছে। আমরা আর বারবার ঋণ পুনঃতপশিলের সুযোগ দিতে চাই না। এ জন্য ব্যাংক খাতের জন্য ১৮ মাসের একটি নীতি নেওয়া হয়েছে।’
তিনি বলেন, সর্বশেষ এক্সিট নীতির মাধ্যমে খেলাপি ঋণ পরিশোধে আগামী ৬ মাসের জন্য একটি বিশেষ সুবিধা দেওয়া হয়েছে। পুনঃতপশিল না করে একবারে কেউ পুরো ঋণ পরিশোধ করলে বিশেষ এক্সিট সুবিধা নিতে পারবেন। ইউক্রেন ও তুরস্কেও অলিগার্কসহ বিভিন্ন সংকটের পর এই মডেল নেওয়া হয়েছিল। এছাড়া আগামী বছরের মধ্যে দুটি আইন করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। অর্থঋণ আদালত আইন সংশোধন করে ৬ মাসের মধ্যে মামলা নিষ্পত্তি এবং দুর্দশাগ্রস্ত ঋণ কিনতে আলাদা কোম্পানি গঠনে করতে পারলে খেলাপি ঋণ কমবে। এতে ব্যাংক খাতের সুশাসন পরিস্থিতির উন্নতি হবে।
বিদেশি ঋণ উৎসাহিত করা হবে
মেঘনা গ্রুপকে সম্প্রতি আইএফসি থেকে ৮ কোটি ডলার ঋণ নেওয়ার বিশেষ সুযোগ দেওয়া সম্পর্কিত প্রশ্নের জবাবে গভর্নর বলেন, বিদেশ থেকে ঋণ নেওয়া আরও সহজ করা হবে। কেননা, বর্তমানের ১২-১৩ শতাংশ সুদে ঋণ নিয়ে ব্যবসা করতে সমস্যা হচ্ছে। এ সময়ে কেউ যদি ৫-৬ শতাংশ সুদে বিদেশি ঋণ আনতে পারে সেটি উৎসাহিত করা হবে। বেসরকারি খাতের জন্য বিদেশি ঋণ আরও সহজ করা হবে। কেউ মূল কোম্পানি থেকে ঋণ আনতে চাইলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পূর্বানুমতির বাধ্যবাধকতা তুলে দিয়ে শিগগিরই একটি সার্কুলার দেওয়া হবে। এটি করতে না পারলে ঋণের সুদহার কমবে না।
তিনি বলেন, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ
বেড়ে ৩৭ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। এটি আরও বাড়বে। ফলে স্বল্প মেয়াদে বিনিময়হারে কোনো ঝুঁকি নেই। এছাড়া পাচার করা অর্থ ফেরত আনতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জোর চেষ্টা অব্যাহত আছে।
- বিষয় :
- মুদ্রানীতি
