ঢাকা শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

দায়ী কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থার নির্দেশ

কমার্স ব্যাংকে আমানতের আপ্যায়ন ব্যয় ৪ কোটি টাকা

দায়ী কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থার নির্দেশ
×

 বিশেষ প্রতিনিধি

প্রকাশ: ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৮:২৮

| প্রিন্ট সংস্করণ

গাজীপুর সিটি করপোরেশন থেকে ১০০ কোটি টাকার আমানত আনতে বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকের চার কোটি টাকার ‘আপ্যায়ন’ ব্যয় দেখানোর সত্যতা মিলেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিদর্শনে। এ ঘটনায় দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ এবং দুই কর্মকর্তাকে বরখাস্তের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সার্বিক বিষয়ে আলোচনার জন্য রোববার বিশেষ পর্ষদ সভা ডেকেছে কমার্স ব্যাংক।

কমার্স ব্যাংকের এই অনিয়ম নিয়ে গত ৬ জুলাই সমকালে ‘আমানতে আপ্যায়ন ব্যয় ৪ কোটি টাকা’ শিরোনামে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এতে বলা হয়, আমানতের আপ্যায়ন খরচ বের করতে ব্যাংকের ১৩ কর্মকর্তার অ্যাকাউন্টে প্রণোদনা হিসেবে চার কোটি টাকা জমা দেওয়া হয়। পরদিন আবার সেই টাকা তুলে নেওয়া হয়। বাংলাদেশ ব্যাংক পরিদর্শন করে সত্যতা পাওয়ার পর গত ২৫ আগস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালককে চিঠি দিয়ে বিভিন্ন নির্দেশনা দিয়েছে।

কমার্স ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ওবায়দুল হক সমকালকে জানান, বাংলাদেশ ব্যাংকের সব নির্দেশনা যথাযথভাবে পরিপালন করা হবে। এ জন্য রোববার বিশেষ পর্ষদ সভা ডাকা হয়েছে। তিনি জানান, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনার আলোকে দেলোয়ার হোসেনকে বরখাস্ত করা হবে।

সমকালের গত ৬ জুলাইয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়, গাজীপুর সিটি করপোরেশন থেকে আমানত আনতে ‘আপ্যায়ন’ খরচ হিসেবে চার কোটি টাকা ব্যয়ের বিষয়টি কমার্স ব্যাংকের এমডি ওবায়দুল হক নিজে অভ্যন্তরীণ এক প্রতিবেদনে তুলে ধরেন। কৌশলে এ অর্থ বের করা হয়। আর এ জন্য এমডির ঘনিষ্ঠ ১৩ কর্মকর্তা বিভিন্ন পরিমাণের আমানত এনেছেন দেখিয়ে তাদের অ্যাকাউন্টে গত ৪ জুন ‘প্রণোদনা’ হিসেবে অর্থ জমা করা হয়। টাকা দেওয়ার আগে ব্যাংকের এমডির পিএস হামিদুর রহমান সবার কাছ থেকে আগাম চেকে সই করিয়ে নেন। হামিদুর রহমানের অ্যাকাউন্টেও ‘ইনসেনটিভ’ হিসেবে সর্বোচ্চ ৮০ লাখ টাকা জমা ও উত্তোলন হয়। টাকা জমা হওয়া অন্য কর্মকর্তারা হলেন– মোহাম্মদ ইউসুফ সিদ্দিক উল্লাহ, তাসনুভা মজুমদার, আহসান হাবিব, আদনান আশ-শফিক, মনিরুল হক, সালেহ আহমেদ, সাইফুর রহমান, রিফাতুল মুরসালিন, সুজন দাশ, মো. শাহিনুর রহমান, মো. সরোয়ার ও মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসেন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শনে বলা হয়েছে, গত ৬ জুলাই সমকালে ‘আমানতের আপ্যায়ন ব্যয় ৪ কোটি টাকা’ শিরোনামে প্রকাশিত রিপোর্ট এবং বিভিন্ন মাধ্যমে পাওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে ব্যাংকের তহবিল তছরুপের বিষয়টি জানা গেছে। আমানত সংগ্রহ কর্মসূচি ‘উজ্জীবন’ এর নামে প্রণোদনা হিসেবে কর্মকর্তাদের হিসাবে টাকা দেওয়া হয়। ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ থেকে যা অনুমোদিত নয়। এর মধ্যে গত ৪ জুন ৯টি চেকের মাধ্যমে তিন কোটি চার লাখ এবং ৭ জুন পাঁচটি চেকের মাধ্যমে ৯৬ লাখ টাকা প্রিন্সিপাল শাখা থেকে তুলে নেওয়া হয়। ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের পিএস মো. হামিদুর রহমান এবং ব্যাংকের ট্রেজারি বিভাগের প্রধান মো. দেলোয়ার হোসেন টাকা উত্তোলন করে বস্তায় ভরে নিয়ে যান। কালো রঙের একটি গাড়িতে করে (যার নম্বর ঢাকা-মেট্রো-১১-২০১০) উত্তরা ক্লাব ও গুলশানে ক্লাবে অর্থ নেওয়া হয়।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে অর্থ উত্তোলন করে নিয়ে যাওয়া কর্মকর্তা ব্যাংকের ট্রেজারি বিভাগের প্রধান মো. দেলোয়ার হোসেন সমকালকে বলেন, এমডির নির্দেশে তিনি এই টাকা উত্তরা ক্লাব ও গুলশান ক্লাবে নিয়ে যান। সেখানে এমডির পিএস কাকে টাকা দিয়েছেন তাঁর জানা নেই। তিনি বলেন, এই চার কোটি টাকার বিপরীতে তিনি এক টাকার চাও খাননি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ছয় পাতার পরিদর্শন রিপোর্টের শেষাংশে কিছু সুপারিশ তুলে ধরা হয়েছে। বলা হয়, প্রণোদনার অর্থ জমা ও উত্তোলনে ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদন নেওয়া হয়নি। ফলে অনিয়মের দায়ভার ব্যাংক ব্যবস্থাপনা ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ওপর বর্তায়। এ ছাড়া অর্থ উত্তোলনকারী দুই কর্মকর্তার মধ্যে দেলোয়ার হোসেন এর আগে এনআরবিসি ব্যাংকে কর্মরত থাকার সময়ও গুরুতর আর্থিক অনিয়ম, দুর্নীতি, জাল-জালিয়াতিতে জড়িত ছিলেন। 
আমানত রাখার সময় গাজীপুর সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার দায়িত্বে থাকা মুহাম্মদ সোহেল হাসান (বর্তমানে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের যুগ্ম সচিব) ওই সময় কোনো ধরনের ঘুষ নেওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করেন। 

আরও পড়ুন

×