দুই কিলোমিটারে তিন বাজার, দামের ফারাক ৩০ টাকা
ফাইল ছবি
জসিম উদ্দিন বাদল
প্রকাশ: ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৯:১৬ | আপডেট: ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১২:২৫
| প্রিন্ট সংস্করণ
রাজধানীর হাতিরপুল কাঁচাবাজারে প্রতি কেজি কাঁকরোল ৮০ থেকে ৯০ টাকা; উচ্ছে ও ঝিঙা ৯০ আর পটোল ৬০ থেকে ৭০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। কাঁঠালবাগান কাঁচাবাজারেও প্রায় একই দামে বিক্রি হয় সবজিগুলো।
এই দুই বাজার থেকে দেড় থেকে দুই কিলোমিটার দূরে কারওয়ান বাজার। সেখানে এসব সবজি কেজিতে ২০ থেকে ৩০ টাকা কমে বিক্রি হচ্ছে। গতকাল বৃহস্পতিবার বাজার তিনটি ঘুরে দামের এমন ফারাক দেখা গেল।
ব্যবসায়ীরা জানান, কারওয়ান বাজার থেকে পাইকারি দরে কিনে তার সঙ্গে পরিবহন, দোকান ভাড়াসহ অন্যান্য খরচ যোগ করে অন্য বাজারে দাম নির্ধারণ করেন বিক্রেতা। হাতিরপুল ও কাঁঠালবাগানের বিক্রেতারা জানান, তারা কারওয়ান বাজার থেকে বাছাই করা সবজি কিনে নিয়ে আসেন। সে জন্যও দাম বেশি দিতে হয়।
হাতিরপুল ও কাঁঠালবাগানে সবজির দর
গত বুধবার হাতিরপুল বাজারে প্রতি কেজি লম্বা বেগুন ৮০ থেকে ৯০, ঢ্যাঁড়শ ৬০ থেকে ৭০, চিচিঙ্গা ৬০ থেকে ৭০, ধুন্দল ৬০ থেকে ৮০, বরবটি ১০০ থেকে ১২০, পেঁপে ৩০ থেকে ৪০ টাকা, আলু ৩০ এবং কাঁচামরিচ ১৭০ থেকে ১৮০ টাকা দরে বিক্রি হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবারও দর মোটামুটি একই ছিল।
গত দুদিন কাঁঠালবাগানেও সবজির দাম প্রায় অভিন্ন ছিল। যদিও দু-একটির দামে পাঁচ-দশ টাকা তারতম্য ছিল। যেমন– কাঁঠালবাগানে ঢ্যাঁড়শ ৫০ থেকে ৬০ টাকায় বিক্রি হলেও ১০ টাকা বেশি হাতিরপুলে।
একই সবজি কারওয়ান বাজারে কত
গত বুধ ও বৃহস্পতিবার কারওয়ান বাজার ঘুরে দেখা গেছে, খুচরা পর্যায়ে প্রতি কেজি কাঁকরোল ৫৫ থেকে ৬০, উচ্ছে ও ঝিঙা ৬০ থেকে ৭০ এবং পটোল ৫০ থেকে ৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
এ ছাড়া প্রতি কেজি লম্বা বেগুন ৮০ থেকে ৯০, গোল বেগুন ১০০ থেকে ১২০, ঢ্যাঁড়শ ৪০ থেকে ৫০, চিচিঙ্গা ও ধুন্দল ৫০ থেকে ৬০, বরবটি ৮০ থেকে ৯০, পেঁপে ২০ থেকে ৩০ টাকা, আলু ২৫ এবং কাঁচামরিচ মানভেদে ১৫০ থেকে ১৬০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। অর্থাৎ কারওয়ান বাজারের চেয়ে হাতিরপুল ও কাঁঠালবাগানে প্রতি কেজি সবজির দর সর্বোচ্চ ৩০ টাকা বেশি।
দামের ফারাক এত বেশি কেন
কারওয়ান বাজার থেকে কাঁঠালবাগান বাজারের দূরত্ব প্রায় দেড় কিলোমিটার আর হাতিরপুল দুই কিলোমিটার। এই স্বল্প দূরত্বে দামে ফারাক এত বেশি কেন– এ প্রশ্নের জবাবে হাতিরপুল বাজারের সবজি ব্যবসায়ী মো. হেলাল উদ্দিন বলেন, কারওয়ান বাজার থেকে হাতিরপুলে সবজি আনতে পরিবহনসহ অন্যান্য খরচ মিলে তাঁর অতিরিক্ত খরচ এক থেকে দেড় হাজার টাকা। এক কেজির কচুরলতির আঁটি দেখিয়ে তিনি বলেন, এই লতি কিনতে হয়েছে কেজি ৮০ টাকা দরে। রং নষ্ট ও কিছুটা পচে যাওয়ার কারণে এখন কেউ ৪০ টাকায়ও নিতে চায় না। এভাবে প্রতিদিনই অবিক্রীত সবজি পচে যায়। সেগুলোর ফেলে দিতে হয়। তাঁর দাবি, ওই এলাকার প্রায় সব ক্রেতা তরতাজা ও ভালো মানের সবজি কিনতে চান।
দোকান ভাড়াও সবজির দামে প্রভাব রাখে উল্লেখ করে হেলাল উদ্দিন বলেন, তাঁর তিন বাই পাঁচ ফুটের দোকানের ভাড়া প্রতি মাসে ৩০ হাজার টাকা। ছেলেকে নিয়ে দোকান চালান। তাদের খরচ হিসাব করলে খুব বেশি লাভ থাকে না।
কাঁঠালবাগানের সবজি ব্যবসায়ী মো. সজীব জানান, কারওয়ান বাজার থেকে সবজি নিতে হলে ভ্যান ভাড়া, সবজি কেনার পর যেখানে রাখায় হয় সেই ফুটপাতের ভাড়া, কুলি খরচ ইত্যাদি মিলিয়ে তাঁর এক হাজার টাকার বেশি খরচ হয়। এই টাকা সবজি বিক্রি করে তুলতে হয়।
একই বাজারের মো. রকির দাবি, কারওয়ান বাজার থেকে বেশি দরে কিনে কমে বিক্রির সুযোগ নেই। তাঁর মতে, কারওয়ান বাজারের খুচরা ব্যবসায়ীরা সেখান থেকে পাইকারি দরে কিনে একই বাজারে খুচরায় বিক্রি করেন। তাদের পরিবহন খরচ নেই। তাই তারা কিছুটা কম দামে বেচতে পারেন।
তবে চাঁদাবাজির প্রতি ইঙ্গিত করে কারওয়ান বাজারের খুচরা সবজি ব্যবসায়ী রিপন মিয়া বলেন, তারা কারওয়ান বাজার থেকে পাইকারি দরে সবজি কিনলেও তাদের অঘোষিত কিছু খরচ আছে। তার পরও তারা কম দামে বিক্রি করার চেষ্টা করেন।
কুষ্টিয়া-ঝিনাইদহ থেকে ট্রাকে সবজি এনে ঢাকায় পাইকারি বিক্রি করেন ব্যাপারী নুর হোসেন। তিনি সমকালকে বলেন, সাধারণত দূরের বাজারের খুচরা ব্যবসায়ীরা রাতের প্রথম ভাগে সবজি কেনেন। তখন সবজিগুলো তাজা থাকে। দামও কিছুটা বেশি থাকে। কারওয়ান বাজারের খুচরা ব্যবসায়ীরা সকালের দিকে সবজি কেনেন। এ কারণে কিছুটা কম দামে কিনতে পারেন। তবে কারওয়ান বাজারের সঙ্গে হাতিরপুল ও কাঁঠালবাগানের সবজির দামে ২০-৩০ টাকা ব্যবধান অনেক বেশি বলে মনে করেন তিনি।
ডিম ও মুরগির দাম বাড়তি
এক-দেড় মাস সময় ধরে বাড়তি দামে বিক্রি হচ্ছে ডিম ও মুরগি। ফার্মের ডিমের ডজন বিক্রি হচ্ছে ১৫০ টাকায়। ব্রয়লার মুরগির কেজি ১৮০ থেকে ১৯০ এবং সোনালি জাতের মুরগি ৩০০ থেকে ৩৩০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
উল্লিখিত তিন বাজারেই প্রোটিনজাতীয় খাদ্যপণ্য দুটির দাম প্রায় কাছাকাছি রয়েছে। পাশাপাশি মাছের বাজারও কিছুটা ঊর্ধ্বমুখী দেখা গেছে। রুই-কাতলা, পাঙাশ ও চাষের কই কেজিতে এক মাসের ব্যবধানে ২০ টাকার মতো দর বেড়েছে।
রুটি-বিস্কুটের দাম বাড়ছে ২০ শতাংশ
মাসখানেক ধরে আটা-ময়দা ও তেল-চিনির দাম বাড়তি। সরকারি সংস্থা টিসিবির তথ্য বলছে, এক মাসে ময়দার ১১ ও চিনির ৫ শতাংশ দাম বেড়েছে। এক বছরের ব্যবধানে খোলা সয়াবিন ও পাম অয়েলের দর বেড়েছে গড়ে প্রায় ১০ শতাংশ। এসব পণ্যের দাম বাড়ার কারণে বেকারি পণ্যের দাম সমন্বয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছে হস্তচালিত বেকারি মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ ব্রেড, বিস্কুট ও কনফেকশনারি প্রস্তুতকারক সমিতি।
বেকারি মালিকরা জানান, আগামীকাল শনিবার থেকে বেকারি পণ্যের দাম ২০ শতাংশ বাড়বে। কিছু ক্ষেত্রে দাম না বাড়িয়ে পণ্যের ওজন কমিয়ে মূল্য সমন্বয় করা হবে। অর্থাৎ ১০ টাকার রুটি বা বিস্কুটের দাম ১০ টাকাই থাকবে। কিন্তু যেটা আগে ৩০০ গ্রাম ছিল, সেটা হয়তো ২৫০ গ্রাম বা ২২০ গ্রাম হতে পারে।
সমিতির সভাপতি জালাল উদ্দিন সমকালকে বলেন, গত ছয় মাসে আড়াই হাজার টাকার ময়দার বস্তা তিন হাজার ২০০ টাকা, ২৫-২৬ হাজার টাকার তেলের ড্রাম ৩৫-৩৬ হাজার হয়ে গেছে। চিনির বস্তা পাঁচ হাজার টাকা ছাড়িয়েছে। এই তিন কাঁচামাল দিয়েই বেকারির বিস্কুট, পাউরুটি ইত্যাদি তৈরি হয়। বেকারি মালিকদের দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে। দাম সমন্বয় না করে উপায় নেই।
তিনি বলেন, কাঁচামাল ও জ্বালানির দাম বাড়ার কারণে উৎপাদন খরচ ২০ থেকে ৩০ শতাংশ বেড়েছে। অন্যদিকে গ্যাস-বিদ্যুতের সংকটে ১০ শতাংশ উৎপাদন কমেছে। এভাবে চলতে থাকলে ছয় মাসের মধ্যে বেকারি খাত ঝুঁকিতে পড়বে বলে মনে করেন তিনি।