ঢাকা বুধবার, ০৮ জুলাই ২০২৬

রাজনীতি

করোনাভাইরাস বনাম বিভ্রান্তির ভাইরাস

করোনাভাইরাস বনাম বিভ্রান্তির ভাইরাস
×

দেবব্রত চক্রবর্তী বিষুষ্ণ

প্রকাশ: ০৪ মে ২০২০ | ১২:০০

বাংলাদেশ তো বটেই, বলতে গেলে প্রায় গোটা বিশ্ব করোনা সংক্রমণের ভয়ে তটস্থ। জীবনের ছন্দে জীবন আবার কবে এবং কীভাবে ফিরবে এ প্রশ্নের উত্তর ভবিষ্যতের হাতে নিহিত। বলা হয়ে থাকে বাঙালি বীরের জাতি। অসত্য নয়; এর প্রমাণ ইতোমধ্যে বহুবার নানাভাবে মিলেছেও। পাশাপাশি এও সত্য, আমরা তর্কপ্রিয়ও। অপ্রাসঙ্গিক বিষয়ে তর্কে জড়াতে আমরা বেশ পটু। লক্ষণীয় এই মানবিক বিপর্যয়ের সময়েও থেমে নেই রাজনৈতিক কাদা ছোড়াছুড়ি।

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওয়ায়দুল কাদের এমপি ২৪ এপ্রিল তার বাসভবন থেকে এক ভিডিও বার্তায় বলেছেন, 'বিএনপি জাতীয় টাস্কফোর্স গঠনের নামে জনমনে বিভ্রান্তির ভাইরাস ছড়াচ্ছে করোনাভাইরাস মোকাবিলায় বিএনপির জাতীয় টাস্কর্ফোস গঠনের প্রস্তাব নাকচ করে দিয়ে তিনি বলেন, 'বিশ্বের কোনো দেশে এ ধরনের টাস্কফোর্স গঠনের নজির নেই।' কিন্তু এটা তো অসত্য নয় যে, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ক্রান্তিকালে জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলার নজির আছে। একই সঙ্গে এমন দুর্যোগের সময় যার যার দায়িত্ব সর্তকতার সঙ্গে পালন করার কিংবা ভূমিকা রাখার। দায়িত্বশীলতা পরিচয়ের দৃষ্টান্ত আছে। আমরা যতই দাবি করি না কেন গণতান্ত্রিক উৎকর্ষতা আমাদের দেশে ক্রমেই পুষ্ট হচ্ছে কিন্তু বিদ্যমান বাস্তবতার নিরিখে তা আলোচনায় এলে এ দাবির অসারতা অনেক ক্ষেত্রেই ইতোমধ্যে প্রতীয়মানও হয়েছে। নিঃসন্দেহে এসবই অনভিপ্রেত, অনাকাক্ষিত একই সঙ্গে বিভ্রান্তির দানা পুষ্ট করে। বিরোধী পক্ষের রাজনীতির নীতিনির্ধারকরা এই দুর্যোগকালে কতটা দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিচ্ছেন, এ নিয়েও প্রশ্ন আছে। কাজেই ওবায়দুল কাদেরের বক্তব্য আপাতত শ্রুতিকটু মনে হলেও বাস্তবতার নিরিখ বিবেচনায় বিচ্ছিন্ন কিছু নয়। অন্যদিকে বিরোধী পক্ষের তরফে সরকারের দিক থেকে তাদের সহযোগিতা দানের ক্ষেত্রে অনীহা প্রকাশের দাবিও উড়িয়ে দেওয়া যাবে না।

গণতান্ত্রিক রাজনীতির ব্যাকরণ অনুযায়ী স্বাধীন দেশের রাজনীতি কতটা পরিচালিত হয়েছে, তা নিয়ে বির্তক চলতেই পারে। সমাজের নানা ক্ষেত্রে আমাদের এখানে মিথ্যাচার ও প্রতারণা নতুন কোনো বিষয় নয়। রাজনীতির ক্ষেত্রেও এমনকি কম পরিলক্ষিত হয়নি। নিকট অতীত থেকেও এমন অনেক দৃষ্টান্ত দেওয়া যাবে। বর্তমান বাস্তবতায় স্যাটেলাইট টিভি ও ইন্টারনেটের মতো কিংবা আরও আধুনিক প্রযুক্তির চরম উৎকর্ষের যুগেও আমাদের দেশের সরলপ্রাণ মানুষকে ধোঁকা দেওয়া যেমন হতাশাব্যঞ্জক তেমনই নগ্ন সমাজ বাস্তবতা। বাস্তবতার আরও কিছু অন্য দিকও আছে। গণতন্ত্রে যাদের বিশ্বাস উচ্চারণসর্বস্ব অঙ্গীকারের মধ্যে সীমাবদ্ধ, তাদের প্রসঙ্গ টেনে যদি কথায় কিংবা আলোচনার পরিসর বিস্তৃত হয় তাহলে এ তর্কও সঙ্গতই প্রধান্য পাবে কে কতটা গণতান্ত্রিক। সুস্থ রাজনীতি চর্চার বিষয়টি আমাদের কাছে চর্বিত চর্বণের মতো। সুস্থ রাজনীতি চর্চা সচেতন মানুষ মাত্রই কাম্য হলেও এক্ষেত্রে দুঃখজনক কিংবা অপ্রীতিকর অনেক কিছুই আমাদের প্রত্যক্ষ করতে হয়েছে। এমনকি চলমান করোনা দুর্যোগকালেও তা যে থেমে নেই বিদ্যমান বাস্তবতাই এর সাক্ষ্যবহ। এই বৃত্তভাঙার তাগিদ যে কেবল জনসমাজ থেকেই ইতোমধ্যে বহুবার উচ্চারিত হয়েছে তাই নয়, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নীতিনির্ধারকরাও স্ববিরোধিতার বৃত্তভাঙার তাগিদ দিয়েছেন।

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের একটি গল্প আছে : 'সবার আগে মানুষ চাই'। গল্পটা লেখা হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে। যদ্দুর মনে পড়ে, একজন ছাপোষা মধ্যবিত্ত মানুষের গল্প সেটা; যিনি কিনা সাতেও নেই, পাঁচেও নেই। রাজনীতির, এমনকি ভোটেরও ধারে কাছে ঘেঁষেন না। তা নিয়ে মাথাও ঘামান না। কিন্তু দিনকাল অন্যরকম। যুদ্ধের আকালের আঁচ তার গায়েও লাগছে। অভাব-অনটন তার সংসারে নিত্যসঙ্গী। পরিবারের সদস্যদের নানা রকম অশান্তির কারকতা, বিভ্রান্তি ছড়ানোর কসরত তাকে ত্যক্তবিরক্ত করে তুলছিল। তিনি বসে থাকেন বারান্দায়। ভাবেন, কী করা যায়। একদিন এমন ভাবনার সময় চোখে পড়ল তার একজন প্রতিবেশী যাচ্ছেন বাড়ির সামনে দিয়ে। প্রতিবেশী বারান্দায় বসা লোকটিকে দেখে বললেন, তিনিও ঝামেলায় আছেন। তার ছেলেটা গেছে 'শান্তির মিটিং'-এ। বারান্দায় বসা লোকটিকে জিঙ্গেস করলেন, তিনি যাবেন কিনা। বারান্দায় বসা লোকটি কী ভেবে বললেন, 'হ্যাঁ যাব। দাঁড়ান জুতাটা পায়ে দিয়ে আসি। শান্তির মিটিংয়ে যেতেই হবে। আগে শান্তি চাই। যুদ্ধটা ঠেকাতে না পারলে জীবনের সব দফা নিকেশ'। জীবনশিল্পী মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় তারপর দেখিয়েছেন, কী করে সেই রাজনীতি থেকে গা-বাঁচিয়ে চলা মানুষটারই রূপান্তর ও বিবর্তন ঘটে গেলে। একপর্যায়ে বারান্দা থেকে নেমে তিনিও মিশে গেছেন শান্তির অভিযাত্রায়। এই হলো একজন সজীব মানুষের জীবনের বাস্তবতার গল্প। তার বাঁচার কথা। মনোবেদনার, তার ভালোভাবে, সুস্থভাবে বাঁচার আকাক্ষার পথ করে নেওয়া রক্তাক্ত কাহিনী। যুদ্ধ কীভাবে জীবনের সবকিছু তছনছ করে দিচ্ছে তারই তীব্র ও তীক্ষষ্ট প্রকাশ ঘটানো হয়েছে একজন ছাপোষা মধ্যবিত্ত মানুষের মনোজগতের বৈপল্গবিক রূপান্তরের ছবি এঁকে। এরকম কথাশিল্প বাংলা সাহিত্য থেকে বিশ্বসাহিত্যের সর্বত্র আরও অনেক ছড়িয়ে আছে।

করোনাভাইরাস সংক্রমণের মোকাবিলার বিষয়টি বিশ্বের দেশে দেশে যুদ্ধ মোকাবিলার সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। আমাদের ক্ষেত্রেও তাই এমন মুহূর্তে পরস্পর বিদ্বেষাক্রান্ত বাক্যবাণ না ছুড়ে সম্মিলিত প্রয়াসে কীভাবে বিপন্ন-বিপর্যস্ত-শঙ্কিত-কর্মহীন অসংখ্য মানুষের ক্ষুধা নিবৃত্তের লক্ষ্যে যূথবদ্ধভাবে কাজ করা যায়, সেই পথ অনুসন্ধানে এখনও কেন অনীহা? করোনাভাইরাস যুদ্ধ মোকাবিলা এবং এই যুদ্ধোত্তর কঠিন পরিস্থিতি মোকাবিলায় রাজনীতিকরা আত্মনিয়োগ করুন সঙ্গত প্রত্যাশা এটিই। যারা এই কর্মযজ্ঞে শামিল হবেন না, ইতিহাসের রথচক্রে তারাই বিলীন হয়ে যাবেন। দেশের মানুষ জানতে চায়- সুস্থ ও গণতান্ত্রিক রাজনীতিই ইতিহাস নির্ধারিত পথ। এর কোনো বিকল্প নেই।

সরকার এই দুর্যোগকালে হাজার হাজার কোটি টাকার অর্থঋণ, ত্রাণসামগ্রী বরাদ্দ করেছে। এগিয়ে এসেছে বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, সামাজিক-ব্যবসায়িক সংগঠনও। এর বিপরীতে 'চাটার দল'ও বসে নেই। চুরি, লুণ্ঠন, আত্মসাতে তারা ব্যস্ত। রাজনীতির নামে অপরাজনীতির এসব অনুষঙ্গের অবসান ঘটুক।

লেখক ও সাংবাদিক

আরও পড়ুন

×