ঢাকা শনিবার, ১১ জুলাই ২০২৬

লকডাউন ও ভাড়াটিয়া

লকডাউন ও ভাড়াটিয়া
×

আতাতুর্ক পাশা

প্রকাশ: ২৯ মে ২০২০ | ১২:০০ | আপডেট: ৩০ নভেম্বর -০০০১ | ০০:০০

সামনের মাসের প্রথম দিন থেকে দেশের অধিকাংশ কর্মক্ষেত্র ও চলাচল উন্মুক্ত করে দেওয়া হচ্ছে। একদিক দিয়ে এটি অপরিহার্য হয়ে বসেছে নিঃসন্দেহে, আমাদের দেশের পরিপ্রেক্ষিতে। মানুষ কর্মহীন, খাদ্যহীন হয়ে পড়েছে। বাড়ি ভাড়াসহ আরও অনেক কিছু দিতে পারছে না। এসব কারণে লকডাউনের অবসান হওয়া বা করা ছাড়া উপায় থাকে না। কিন্তু লকডাউনের অবসান হলেই কী সব কিছুর অবসান ঘটবে? তাতে যে সম্ভাব্য বিপত্তি ঘটতে পারে তা প্রশাসনও ভালো জানে।

সরকার ইতিমধ্যে যত টাকা ও খাদ্য ত্রাণ হিসেবে বরাদ্দ দিয়েছে, তার কতভাগ খেটে খাওয়া মানুষের দ্বারে পৌঁছেছে, আমরা জানি না। গেলেও শুধু ত্রাণে কত দিন রক্ষা হয়? এজন্য খেটে খাওয়া মানুষের কাজ করা জরুরি হয়ে পড়েছে। রমজান মাসে একবেলা, আধাবেলা না খেয়ে হয়তো রোজা ছিলেন বিত্তহীনরা। কিন্তু জ্যৈষ্ঠের কাঠফাটা রোদে তাদের এ ক্ষুধা সহ্য হবে না। এজন্য আরও বেশি লকডাউনে তাদের কষ্ট বেড়ে যাবে।

দেশের মানুষ যে প্রচণ্ডভাবে খাদ্যাভাবে আছে এটি অস্বীকার করা মানেই মিথ্যার সঙ্গে মিতালি করা। এজন্য সাধারণ মানুষের দু'বেলা অন্ন সংস্থানের প্রয়োজনে লকডাউন খুলে দেওয়াটা জরুরি বলে বিবেচিত হতে পারে। কিন্তু অবারিত চলাচল ও ঘেঁষাঘেঁষি পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ করে তুলতে পারে।

সরকারি ঘোষণায় মৃতের হার যা-ই দেখানো হোক না কেন, বাস্তবে এখন দেশে মৃত্যুর হার অনেক বেশি। এখনও করোনার ঠিকমতো পরীক্ষা হচ্ছে না এবং এখনও যথেষ্ট দক্ষ পরীক্ষাগার স্থাপিত হয়নি। করোনা পরীক্ষা নিয়ে খোদ রাজধানীতেই মানুষের অনেক ঝক্কি-ঝামেলা পোহাতে হচ্ছে, এটি অস্বীকারের উপায় নেই। এজন্য লকডাউন এত তাড়াতাড়ি তুলে নেওয়ার সময় এখনও আসেনি। চিকিৎসাব্যবস্থার আরও উন্নয়ন জরুরি; তার পর হয়তো লকডাউন তুলে নেওয়া যেতে পারে। তবুও লকডাউন উঠিয়ে না নিলে মানুষ খাবে কী? হাতে সম্বল যতটুকু ছিল, তা দিয়ে তো দুই মাস কাটাল, এখন কাজ না করলে সাধারণ মানুষ কী খাবে? শুধু খাওয়া, থাকার ভাড়া?

সেদিন আমাদের পাড়ায় এক বন্ধু বলল, যান, দেখে আসেন। ওই যে জনপ্রতিনিধি, কমিশনার, এ পাড়ার প্রত্যেক বাড়িওয়ালার জন্য ৩০ কেজির চাল প্লাস্টিকের বস্তায় বাঁধছে। সঙ্গে থাকছে দুই কেজি তেল, চিনি, লবণ, সেমাই ইত্যাদি। এ কথাটি যে মিথ্যা ছিল না, তা পরে দেখেছি। কিন্তু প্রশ্ন হলো, ভাড়াটিয়ারা কী পাচ্ছে? নগরের মানুষের ১০০ জনের মধ্যে ৮০ জন ভাড়া বাড়িতে থাকে। এদের বাড়ি ভাড়া ইতোমধ্যে বাকি পড়ে গেছে দুই মাস, এই মে মাস পার হলে তিন মাস হবে।

দেশের বাড়িওয়ালাদের আনুমানিক ৬০ ভাগই বিত্তবান। যেমন ধরা যাক, আমাদের প্রিয় ক্রিকেটাররা কোনো একটি খেলায় বাংলাদেশকে জেতাতে পেরেছেন। প্রধানমন্ত্রী খুশি হয়ে সেবার বাংলাদেশ ক্রিকেট টিমের প্রত্যেক খেলোয়াড়কে দুটি করে অ্যাপার্টমেন্ট উপহার দিয়েছেন। এমনও শোনা যায়, কোনো বাড়িওয়ালা লোন নিয়ে বহুতল বাড়ি নির্মাণ করলেই তাকে নগরের কোনো ছাত্র সংগঠনের নেতাকে একটি অ্যাপার্টমেন্ট দিতেই হতো। এভাবেও অনেকে বাড়ির মালিক হয়েছেন।

নগরের অনেক বস্তিই বড় বড় নেতার হাতে জিম্মি। সুতরাং এই বিশাল শক্তিশালী এলিট মানুষদের বাড়ি ভাড়া পাওয়া জরুরি, না হলে তাদের তো সংসার চলবে না! সুতরাং বাড়ি ভাড়া দেওয়া থেকে কারও রেহাই নেই। এখানে সরকারকে এগিয়ে আসতেই হবে, তা সে যত বড় প্রভাবশালী বাড়িওয়ালাই হোক।

সরকারকে তাই সাধারণ মানুষের বাড়ি ভাড়া সমস্যার সমাধান জরুরিভাবে করতে হবে এবং খাদ্য-সমস্যার সমাধান করতে হবে। নিরাপদ দূরত্বের আইন তখনই মানা হয়, যখন এর পেছনে দৃঢ় যৌক্তিকতা থাকে। মানুষ তখনই নিরাপদ দূরত্বের বিধি মানবে, যখন তাদের হাঁড়িতে দু'মুঠো চাল বা চিড়ে থাকবে। আর তারা যদি একটু নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারে। এ কারণে বাড়ি ভাড়া সমস্যার সমাধানেও সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে।

সাংবাদিক

আরও পড়ুন

×