কৃষি বাজারজাতকরণে করোনাকালীন শিক্ষা
ড. মো. জাহাঙ্গীর আলম ও ড. ইসমত আরা বেগম
প্রকাশ: ২৯ মে ২০২০ | ১২:০০ | আপডেট: ৩০ নভেম্বর -০০০১ | ০০:০০
করোনাভাইরাস সংক্রমণ এড়াতে সারাদেশে লকডাউন শিথিল করা হলেও কৃষিপণ্য পরিবহন ও বাজারজাতকরণে সমস্যা রয়েই গেছে। সরকার স্বল্প সময়ে কৃষিপণ্যের পার্সেল এক্সপ্রেস ট্রেন, কৃষকবন্ধু ডাক সেবা, ভ্রাম্যমাণ বাজার, ট্রাক চলাচলের নিশ্চিয়তা, ত্রাণে আলু ও সবজি অন্তর্ভুক্তি, কৃষিপণ্য ও আম্পানের পর আম পরিবহনে প্রণোদনা, উন্মুক্ত কৃষিপণ্য মার্কেটপ্লেস 'ফুড ফর নেশন' উদ্বোধনের মতো ব্যবস্থা নিয়েছে। খাদ্য উৎপাদনে কৃষকদের সহায়তা দিতে ৬৪ জেলায় একজন করে কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দিয়েছে। এসব ব্যবস্থার ফলে কৃষিপণ্যের বাজারজাতকরণ তাৎক্ষণিকভাবে সহজতর হয়েছে নিঃসন্দেহে; কিন্তু প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি সমাধান।
আমরা দেখেছি, অতীতে কৃষক টমেটো, বেগুন, ভুট্টা ও আলু রাস্তায় ফেলে প্রতিবাদ জানিয়েছে। কারণ উৎপাদন খরচও উঠছে না। অথচ আমাদের কৃষক উৎপাদন খরচ মিটিয়ে সামান্য বাড়তি আয়েই তৃপ্ত। আমরা দেখছি, করোনার জন্য কৃষিপণ্যের দাম পড়ে গেছে। তার মানে, ভোক্তারা কম দামে ভোগ করতে পারছে? মোটেই নয়। কৃষক তার উৎপাদিত পণ্য সঠিকভাবে বাজারজাত করতে পারছে না। ফলে মাঠপর্যায়ে কৃষিপণ্যের দাম পড়ে গেছে। অন্যদিকে, বাজারে সরবরাহ কম থাকায় দাম বাড়ছে ভোক্তা পর্যায়ে।
মানুষের আয় কমে যাওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই চাহিদাও কমে গেছে, ক্রয়ক্ষমতা কমে গেছে। মধ্যবিত্ত তার খাবার টেবিলে আইটেম কমিয়ে দিয়েছে। অনেক প্রতিষ্ঠানিক ক্রেতার (বিশ্ববিদ্যালয়, হোটেল, ক্যাডেট কলেজ) চাহিদা নেই। চাহিদা না থাকার কারণে সঠিক দাম না পেলে কৃষক তার উৎপাদন কমিয়ে দেবে অথবা উৎপাদন করবে না। কৃষক যাতে উৎপাদন কমিয়ে না দেয় সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
কৃষি উৎপাদন চাঙ্গা রাখতে কৃষক ছাড়াও বাজার ব্যবস্থার অন্য কুশীলবদের সংযুক্ত রাখতে হবে।
মনে রাখতে হবে, উৎপাদন হচ্ছে সরবরাহ চেইনের একটি অংশ মাত্র। বাকি অংশ কৃষকের উৎপাদিত পণ্য ভোক্তার কাছে পৌঁছানো। এই চেইনে কৃষকের বাইরে বাজার ব্যবস্থার অনেক কুশীলব সরাসরি জড়িত। অনেক উৎপাদিত কৃষিপণ্য পচনশীল বলে সংগ্রহ ও বাজারজাতকরণে দেরি করা যায় না। যেমন বেগুন, ঢেঁড়স, শিম, টমেটো, শসা, লাউ, ফুলকপি, বাঁধাকপি ইত্যাদি পচনশীল কৃষিপণ্য নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই সংগ্রহ ও বিক্রয় করতে হয়।
এ অবস্থায় আড়ত, পাইকারি ও খুচরা বাজারব্যবস্থা স্বাস্থ্যবিধি মেনে চালু রাখতে হবে। শাকসবজি, ফলমূল ও অন্যান্য কৃষিপণ্যের সরবরাহ চেইনের সব কুশীলব যেমন পাইকার, আড়তদার, খুচরা ব্যাপারী, পরিবহন শ্রমিক- সবাইকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে কাজ করতে হবে।
আমরা জানি, গত এক যুগে দেশে সবজি উৎপাদনে রীতিমতো বিপ্লব ঘটেছে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার মতে, বিশ্বে সবজি উৎপাদনে বাংলাদেশের অবস্থান তৃতীয়। ১ কোটি ৬০ লাখ কৃষক পরিবার সবজি চাষে জড়িত। বর্তমানে দেশে ১ কোটি ৬২ লাখ টন সবজি উৎপাদন হয়। কিন্তু করোনার প্রভাবে যদি কৃষক উৎপাদিত পণ্য বাজারজাতকরণ করতে না পারে, তাহলে জাতীয় পর্যায়ে খাদ্য ঘাটতি থেকে পরিত্রাণ পাওয়া কঠিন হবে।
প্রশ্ন হচ্ছে, এ ক্ষেত্রে করোনাকালীন ও পরবর্তী সময়ের করণীয় কী? প্রথমত, বেসরকারি প্রক্রিয়াজাতকারী কোম্পানিগুলো আরও বেশি কৃষিপণ্য কিনে প্রক্রিয়াজাতকরণ করতে পারে। প্রয়োজনে নামমাত্র মুনাফা রেখে তাদের কাছে বিক্রয় করা যেতে পারে। বিক্রয় করতে না পারার চেয়ে কম দামে বিক্রয় ভালো।
দ্বিতীয়ত, প্রাতিষ্ঠানিক ভোক্তাকে সম্পৃক্ত করে উৎপাদিত কৃষিপণ্যের ভোগ ধরে রাখতে হবে। যেমন পুলিশ লাইন্স, ক্যান্টনমেন্ট, আইসোলেশন সেন্টার, জেলখানা। সুপার মার্কেটের সঙ্গে মাঠপর্যায়ের কৃষক গোষ্ঠীর সংযোগ স্থাপন করতে হবে। যে যে এলাকায় বিশেষ বিশেষ সবজি ও ফলমূল বেশি উৎপাদিত হয়, সেসব এলাকায় কৃষকদের সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক ভোক্তার সংযোগ বাড়াতে হবে।
তৃতীয়ত, স্থানীয় পর্যায়ে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তাদের হাতে কৃষকদের তালিকা আছে, উৎপাদিত পণ্যের ধরন ও পরিমাণ জানা আছে। নির্বাচন কমিশনের কাছে ভোটার তালিকা আছে। বিবিএসের সামাজিক সুরক্ষা তালিকা আছে। কোথায় কী পরিমাণ উৎপাদন ও কী সংখ্যক ভোক্তা আছে সে অনুযায়ী কৃষিপণ্য স্থানান্তর চালিয়ে যেতে হবে। উৎপাদিত কৃষিপণ্যের সরবরাহ নিরবচ্ছিন্ন ও নির্বিঘ্ন রাখতে পণ্যবাহী যানবাহন যাতে হয়রানির শিকার না হয়, সেটা নিশ্চিত করতে হবে।
চতুর্থত, সমাজের ধনী শ্রেণি এ মুহূর্তে বেশি বেশি শাকসবজি ও ফলমূল ভোগ করার মাধ্যমে কৃষকদের সহায়তা করতে পারে। তাতে অর্থের ঘূর্ণায়মান হবে, কৃষকরা উৎপাদনে বিনিয়োগ করবে ও সরবরাহ বাড়বে। পর্যাপ্ত ভোগ না করলে উৎপাদক তার উৎপাদিত কৃষিপণ্য বাজারজাতকরণ করতে পারবে না। ফলে উৎপাদন কমিয়ে দেবে ও খাদ্য নিরাপত্তা বিঘ্নিত হবে। জাতিসংঘের কৃষি ও খাদ্য সংস্থার সুপারিশ অনুযায়ী, একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষের খাদ্য তালিকায় প্রতিদিন ৪০০ গ্রাম শাকসবজি, ফলমূল থাকার কথা। কিন্তু বাংলাদেশে এর পরিমাণ মাত্র ২০০ গ্রাম। প্রতিষেধক আবিস্কার না হওয়া পর্যন্ত করোনা মোকাবিলায় পর্যাপ্ত শাকসবজি, ফলমূল খেতে হবে, যা শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াবে।
পঞ্চমত, কৃষকরা যাতে উৎপাদিত কৃষিপণ্য ন্যায্য দামে বাজারজাত করতে পারে তার জন্য কৃষিপণ্য উৎপাদনের এলাকায় বিপণন ব্যবস্থা চালু রাখতে হবে। কাজটি ডিজিটাল টেকনোলজির মাধ্যমেও করা যেতে পারে।
করোনাকালে আমরা নতুন করে অনুধাবন করছি, কৃষিই আমাদের ভরসা। কৃষকদের বাঁচিয়ে রাখতে হবে। একই সঙ্গে দেখা গেছে, বিভিন্ন পর্যায়ে কৃষিপণ্যের দাম নিয়ে আলোচনা হলেও সুনির্দিষ্ট ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাব আছে। পাশের দেশ ভারতেও কৃষিব্যয় ও মূল্য কমিশন আছে, যেখানে ২৬ কৃষিপণ্যে সর্বনিম্ন দাম সহায়তা (এমপিএস) দেওয়া হয়। এমন মূল্য কমিশন আমাদের খুবই প্রয়োজন। পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে কৃষিপণ্য বাজারজাতকরণ সমস্যা সমাধানে কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের কর্মকাণ্ড উপজেলা পর্যন্ত বিস্তৃত করতে হবে। সর্বোচ্চ উৎপাদন ও সুষ্ঠু বাজারজাতকরণ কেবল করোনা সংকটে নয়, দীর্ঘমেয়াদে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে। প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র কৃষকদের নগদ সহায়তা প্রদান করা গেলে তা সংকট সত্ত্বেও কৃষি প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে সহায়ক হবে।
লেখকদ্বয় যথাক্রমে অধ্যাপক কৃষি ব্যবসা ও বিপণন বিভাগ ও অধ্যাপক কৃষি অর্থনীতি বিভাগ, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ
[email protected]
[email protected]