স্মরণ
মহান মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমান
খায়রুল কবীর খোকন
প্রকাশ: ২৯ মে ২০২০ | ১২:০০ | আপডেট: ৩০ নভেম্বর -০০০১ | ০০:০০
আজ বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বীরউত্তমের ৩৯তম শাহাদাতবার্ষিকী। ১৯৮১ সালের এই দিনে তিনি চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে একদল বিপথগামী বা বিভ্রান্ত সেনাসদস্যের হাতে নিহত হন। মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমান পাকিস্তান প্রত্যাগত সামরিক বাহিনী সদস্যদের একাংশের মতলববাজিতে একটি বিশৃঙ্খল সময়ের শিকারে পরিণত হন। নিজের প্রতিষ্ঠিত দল বিএনপির অভ্যন্তরীণ বিরোধ নিষ্পত্তির লক্ষ্যে একটি দলীয় বৈঠকে সভাপতিত্ব করার উদ্দেশ্যে দু'দিনের চট্টগ্রাম সফরে গিয়ে সার্কিট হাউসে রাত্রিযাপন করছিলেন তিনি। সেই সুযোগই গ্রহণ করে চক্রান্তকারীরা। এই চট্টগ্রামের সেনানিবাসেই 'মেজর' পদে কর্মরত থাকা অবস্থায় একাত্তরের মার্চে তিনি মুক্তিযুদ্ধের সশস্ত্র লড়াইয়ে যোগ দেন। কালুরঘাট রেডিও স্টেশন থেকে তার কণ্ঠে উচ্চারিত হয়েছিল স্বাধীনতার ঘোষণা।
একাত্তরে জিয়াউর রহমান ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডার ও 'জেড ফোর্স' ব্রিগেড কমান্ডার। পঁচাত্তর-পরবর্তী সময়ে দেশপ্রেমিক রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট। রাজনৈতিক অস্থিরতামুক্ত, গণতান্ত্রিক, দারিদ্র্যমুক্ত, সুষম সমাজব্যবস্থার একটি বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিলেন তিনি।
মধ্যবিত্ত উচ্চশিক্ষিত বাবার ও নজরুল সংগীতশিল্পী মায়ের সন্তান জিয়াউর রহমান ছিলেন অঙ্গীকারবদ্ধ এক তরুণ। মেধাবী শিক্ষার্থী বাবা-মায়ের আদরের 'কমল' কবি কাজী নজরুল ইসলামের বিদ্রোহী সত্তাকে চিনে নিয়েছিলেন সেই কৈশোরে। আর পাকিস্তান মিলিটারি একাডেমিতে অধ্যয়নের সময়টাতেই নেতৃত্বদানে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের নয় মাসকালের শেষ পাঁচ মাস জিয়াউর রহমান ব্রিগেড কমান্ডার হিসেবে জেড ফোর্স কমান্ডার হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেন। বীরউত্তম খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমান দেশ স্বাধীন হওয়ার পরে সেনাবাহিনীর উপপ্রধান হন। তিনি তার দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করে যান। যদিও সিনিয়র মোস্ট কর্মকর্তা হিসেবে তার সেনাপ্রধান হওয়ার কথা ছিল। সেটা নিয়ে তার মনোকষ্ট থাকলেও তিনি হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়েননি। পেশাদার সেনা অফিসার হিসেবে জিয়া দায়িত্ব পালন করে যান। যখন যেখানে ছিলেন, কোনো অবস্থাতেই পেশাগত শৃঙ্খলাবোধ লঙ্ঘন করে অপেশাদারি বিকার, সংকীর্ণতা, স্বার্থান্ধতাকে কখনও গুরুত্ব দেননি। ফলে রাষ্ট্রই তাকে বারবার দায়িত্ব দিয়েছে। তিনি তা পবিত্র কর্তব্য হিসেবে পালন করে গেছেন সর্বোচ্চ ত্যাগ আর নিষ্ঠা দিয়ে, দক্ষতা আর শ্রমনিষ্ঠা দিয়ে। পঁচাত্তরের আগস্ট-পরবর্তীকালে ক্ষমতার শীর্ষে উঠেছিলেন রাষ্ট্রের প্রয়োজনে।
রাষ্ট্রপতি হিসেবে জিয়াউর রহমান বহুদলীয় গণতন্ত্র কায়েমের লক্ষ্যে সব রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন প্রক্রিয়া চালু করেন। বাকশাল পর্ব পেরিয়ে এই সময় আওয়ামী লীগও নতুন করে নিবন্ধিত দল হিসেবে যাত্রা শুরু করে। বর্তমান আওয়ামী লীগকে দেখা যায় জিয়াউর রহমানকে নিয়ে তীব্র সমালোচনা করতে। অথচ মুক্তিযুদ্ধের এই বীর সেনানীকে 'বীরউত্তম' খেতাব দিয়েছিল স্বাধীন বাংলাদেশ সরকার।
জিয়াউর রহমান দেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে যে সংস্কার কাজগুলো বাস্তবায়ন করছিলেন, তার মধ্যে রয়েছে বিখ্যাত 'স্বেচ্ছাশ্রমে খাল কাটা' কর্মসূচি। সারাদেশের ভরাট হয়ে যাওয়া খাল ও নদী পুনর্খনন ছিল একটি সফল উন্নয়ন উদ্যোগ। আমলাগোষ্ঠীকে কোদাল হাতে, টুকরি হাতে খালাকাটার কাজ করতে হয়েছে। এই কর্মসূচিটি বিশ্বব্যাপী প্রশংসিত হয়েছিল। কৃষির জন্য সেচকাজ, মৎস্য-উৎপাদন বৃদ্ধি এবং কম-বাজেটে স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে এই যে হাজার হাজার কিলোমিটার খালকাটা কর্মসূচি, এটা আমাদের অনেক কিছু শিখিয়েছে।
দেশে দুর্নীতি, চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই সাধারণ অপরাধসমূহ কমিয়ে ফেলতে সক্ষম হয়েছিলেন জিয়াউর রহমান। বাংলাদেশে সেই সময়কার পত্রপত্রিকা তার সাক্ষ্য দেয়। তাছাড়া এ দেশে তৈরি পোশাক রপ্তানির শিল্প এবং মধ্যপ্রাচ্যে জনশক্তি রপ্তানি কাজে সাফল্য অর্জনের পথ দেখান জিয়াউর রহমান। শিল্পকারখানা প্রতিষ্ঠায় বেসরকারি বিনিয়োগ উন্মুক্ত করে দিয়েছিলেন এবং ব্যাপকভাবে শিল্পকারখানা প্রতিষ্ঠায় উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করেছিলেন।
জিয়াউর রহমান মুসলিম বিশ্বে বাংলাদেশের একটি বিশেষ ভাবমূর্তি গড়ে তুলেছিলেন। আবার চীনের সঙ্গেও নতুন কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালিয়ে সাফল্য অর্জন করেন। তিনি দক্ষিণ এশীয় সহযোগিতা সংস্থা (সার্ক) প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখেছিলেন এবং প্রাথমিক আলোচনা সম্পন্ন করেছিলেন। তিনি বাংলাদেশে সবুজ বিপ্লবের জন্ম দিয়েছিলেন। আরও নানা কাজে হাত দিয়েছিলেন জাতীয় উন্নয়নে অগ্রসর হওয়ার লক্ষ্য নিয়ে। যদিও ষড়যন্ত্রকারীদের কারণে সব কাজ সমাপ্ত করতে পারেননি। মুক্তিযোদ্ধা ও কর্মবীর এই জাতীয়তাবাদী নেতাকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দিলেও ষড়যন্ত্রকারীদের উদ্দেশ্য সফল হয়নি। তার আদর্শ, বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ ও উন্নয়ন চির অমর।
শহীদ জিয়ার মৃত্যু নেই।
বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব, সাবেক সংসদ সদস্য ও সাবেক ডাকসু সাধারণ সম্পাদক