ঢাকা শনিবার, ১১ জুলাই ২০২৬

কালের আয়নায়

আমরা দেখেও শিখিনি, ঠেকেও শিখিনি

আমরা দেখেও শিখিনি, ঠেকেও শিখিনি
×

আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী

প্রকাশ: ২৯ মে ২০২০ | ১২:০০ | আপডেট: ৩০ নভেম্বর -০০০১ | ০০:০০

'ঈদের ছুটির আমেজ নিয়ে বাড়ি থেকে ফিরে এলাম'- এ কথা বলার মতো ক্ষমতা এখন বাংলাদেশের একটি মানুষেরও নেই। লম্বা ঈদের ছুটিতে দলবেঁধে মানুষ ছুটেছিল গ্রামে। এখন ফিরে আসছে দলবেঁধেই। করোনাভাইরাসও ছড়িয়েছে অনুরূপ হারে। অর্থাৎ প্রথমদিকে সরকার দৃঢ়-ব্যবস্থাপনা করায় মনে হচ্ছিল, সরকার সফল। কভিড-১৯ নিয়ন্ত্রিত হতে চলেছে। লকডাউন, সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কর্তৃক নির্দেশিত স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার ব্যাপারে কড়াকড়ি আরোপ করায় করোনা মহামারি নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ সরকারের সাফল্য চারদিকে প্রশংসিত হচ্ছিল। তারপরই আবার এই বিয়োগান্ত অধ্যায়ের শুরু।

করোনা নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশে আগের কঠোরতা আর নেই। করোনাভাইরাসের সংক্রমণ উল্লেখযোগ্যভাবে নিয়ন্ত্রণ করার আগেই ব্যবসায়ীদের চাপে গার্মেন্ট ফ্যাক্টরি খুলে দেওয়া, লকডাউন তুলে নেওয়া, স্বাস্থ্যবিধি ও সামাজিক দূরত্ব সাধারণ মানুষ কর্তৃক মেনে না চলা, কঠোর ব্যবস্থা চালু রাখার ব্যাপারে সরকারের সিদ্ধান্তহীনতা বর্তমান অবস্থার জন্য দায়ী।

কথায় বলে- কেউ দেখে শিখে, কেউ ঠেকে শিখে। আমরা দেখে শিখিনি, ঠেকেও শিখিনি। জাপান ও পেরুর উদাহরণ চোখের সামনে থাকতে আমরা দেখে কিংবা ঠেকেও শিখলাম না কেন? জাপান লকডাউন, দীর্ঘদিন স্কুল-কলেজ, যানবাহন বন্ধ রাখা ইত্যাদি ব্যবস্থা কঠোরভাবে না মেনেই ভাইরাসের বিস্তার বন্ধে সক্ষম হয়েছে। জাপান কন্টাক্ট ট্রেসিংয়ে কিংবা গণপরীক্ষার ওপরেও জোর দেয়নি। তার শিক্ষিত জনসমাজ কোনো সরকারি বিধিনিষেধের বাধ্যবাধকতা ছাড়াই ভাইরাস থেকে নিজেদের বেঁচে থাকার সচেতনতা প্রকাশ করেছে।

দেশটির পাবলিক হেলথ সেন্টারে ৫০ হাজার শিক্ষিত নার্স রয়েছেন, যাদের অন্য সময় কাজ ছিল ইনফ্লুয়েঞ্জা ও যক্ষ্ণার সংক্রমণ শনাক্ত করা। এখন তাদের করোনাভাইরাস শনাক্ত করার জন্য নিয়োগ করা হয়েছে। তারা রোগ শনাক্ত করা ও রোগ সংক্রমণ বন্ধ করার ব্যাপারে বিরাট সাফল্য দেখিয়েছেন। শিক্ষিত এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার জনসমাজ জাপানকে করোনাভাইরাস ঠেকাতে সাহায্য করেছে। জাপানের এক অধ্যাপক মিকিহিতো বলেছেন, জনসাধারণকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন রাখার নীতি গ্রহণ না করে তিনটি নীতি অনুসরণ করে জাপান জরুরি অবস্থামুক্ত হতে পেরেছে। এই তিনটি নীতি হলো- ক্লোজড স্পেস, ক্রাউডেড স্পেস এবং ক্লোজড কন্টাক্ট থেকে দূরে থাকো।

করোনার বিরুদ্ধে যুদ্ধে জাপানের সাফল্যের আরেকটা বড় কারণ আছে। মাত্র একজন রোগী শনাক্ত হতেই জাপান তার ৫০ লাখ স্বাস্থ্যকর্মীকে মাঠে নামায়। অন্যদিকে, ব্রিটেন ও আমেরিকা রোগী শনাক্ত হওয়ার প্রথমদিকে সমস্যাটিকে উপেক্ষা করে এবং ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার পর কন্টাক্ট ট্রেসার নিয়োগ এবং তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া শুরু করে। ট্রাম্প সাহেব তো প্রথমে করোনাকে তুচ্ছ করে বলেছিলেন, এটা দু'দিনের ফ্লু। দু'দিনেই সেরে যাবে। তিনি প্রথমে মাস্ক পরাটাও নিরুৎসাহিত করেছিলেন। পরে দেখা গেছে, এক সরকারি অনুষ্ঠানে তিনি নিজেই মাস্ক পরেছেন।

বিশ্বে করোনা দেখা দিতেই সবচেয়ে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিল পেরু। প্রকাশিত খবরে বলা হয়েছে, করোনাভাইরাসের বিস্তার ঠেকাতে কঠোর যেসব পদক্ষেপ, তার সবই নিয়েছিল পেরু। সবাইকে ঘরে থাকার কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। জারি করা হয়েছিল সান্ধ্য আইন। সীমান্তও বন্ধ করা হয়েছিল। জরুরি অবস্থার আওতায় 'কোয়ারেন্টাইন' বাধ্যতামূলক করা হয়েছিল। দেশে জরুরি অবস্থা জারি করেছিলেন পেরুর প্রেসিডেন্ট মার্টিন ভিসকারা। তবু শেষ রক্ষা হয়নি পেরুর। করোনায় দারুণভাবে বিপর্যস্ত পেরু। এ পর্যন্ত পাওয়া খবরে জানা যায়, করোনা আক্রান্তের সংখ্যা এক লাখ ২৪ হাজার। মৃতের সংখ্যা সাড়ে তিন হাজারের বেশি। দেশের এই অবস্থা দেখে প্রেসিডেন্ট ভিসকারা বেজায় চটে গেছেন। তিনি

তার দেশের মানুষকে বলেছেন 'আত্মকেন্দ্রিক', 'স্বার্থপর'। কিন্তু পেরুর মানুষের অপরাধ কী? অপরাধ, দেশে জরুরি অবস্থা জারির পরও রাজধানী লিমার কাছের একটি শহরের দোকানগুলোতে কেনাকাটার জন্য দারুণ ভিড়। এই ভিড়ের মানুষেরা মুখে মাস্ক পরেছে; কিন্তু সামাজিক দূরত্ব কেউ মানেনি।

প্রেসিডেন্ট ভিসকারা এ জন্য পেরুর মানুষকে দোষ দিলেও দোকানের ভিড়ে দাঁড়ানো এক নারী বলেছেন, 'এখানে না এসে উপায় কী? আমাদের বাসায় তো খাবারের কোনো সংস্থান নেই। দোকানে না এলে না খেয়ে মরতে হবে।' অর্থনীতিবিদ ড. ভার্গাস এবং ড. হুয়ার্তো বলেছেন একই কথা। তারা বলেছেন, 'কেবল মানুষকে দোষ দিয়ে লাভ নেই। সমস্যার মূল কিন্তু অন্যখানে। তা হলো মানুষের দারিদ্র্য।'


পেরুর শহরগুলো এতই জনাকীর্ণ যে সেখানে সামাজিক বিচ্ছিন্নতা বজায় রাখা অসম্ভব ব্যাপার। বাড়িতে ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত মানুষ গাদাগাদি করে বাস করে। একটি কক্ষে পাঁচজন লোক ঘুমায়। দেশটির ৭২ শতাংশ মানুষের অবস্থা অনেকটা দিনমজুরের মতো। জীবিকার জন্য রোজ তাদের বাইরে বের হতে হয়। পেরুর সরকারি হিসাবেই বলা হয়েছে, দেশের ৫১ শতাংশ মানুষের বাড়িতে রেফ্রিজারেটর বা ফ্রিজার নেই। অর্থাৎ তারা ঘরে খাবার সংরক্ষণ করতে পারে না। তাদের রোজই বাজারে যেতে হয়। ফল দাঁড়িয়েছে, পেরুর হাসপাতালগুলোর ৮৫ ভাগ আইসিইউ এখন রোগীতে ভর্তি। চিকিৎসকরা বলছেন, 'বর্তমানের ভয়াবহ অবস্থা সামাল দেওয়ার ক্ষমতা সরকারের স্বাস্থ্য দপ্তরের নেই। স্বাস্থ্য প্রশাসন ভেঙে পড়েছে।'

দরিদ্র পরিবারগুলোকে প্রেসিডেন্ট খাদ্য-প্যাকেট দেওয়ার ব্যবস্থা করেছেন। কিছু প্রণোদনা দানেরও ব্যবস্থা করেছেন। এ সম্পর্কে পেরুর অর্থনীতিবিদ ভার্গাস বলেছেন, 'দরিদ্র পরিবারগুলোকে সাহায্য দেওয়ার ব্যবস্থাটি ভালো। কিন্তু এই খাদ্য-প্যাকেজ বিলির ব্যবস্থাটি বাজে ও দুর্নীতিপরায়ণ (পাঠক, এখানে বাংলাদেশের অবস্থা ভেবে দেখুন)।' আরেক বুদ্ধিজীবী বলেছেন, সরকার প্রণোদনামূলক সাহায্য দিচ্ছে ব্যাংক চেকের মাধ্যমে। পেরুর অধিকাংশ গরিব মানুষের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট নেই। ফলে চেক ভাঙানোর জন্য তাদের ব্যাংকে ভিড় জমাতে হয়। সামাজিক দূরত্ব এই ভিড়ে মোটেই বজায় রাখা যায় না। গরিব মানুষকে দোষ দিয়ে লাভ কী?

পেরুর এ অবস্থার সঙ্গে বাংলাদেশের অনেক মিল রয়েছে। বাংলাদেশে করোনার দাপট যতটা কমেছিল, এখন ততটা বেড়েছে। সরকার লকডাউন শিথিল করতে বাধ্য হয়েছে। সামাজিক দূরত্ব কেউ বজায় রাখছে না। ঈদের ছুটিতে ঢাকা ছেড়ে যাওয়ার ঢল নেমেছিল। এখন ফিরে আসার ঢল নেমেছে। সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, ৩১ মে সাধারণ ছুটি শেষ হবে। মানুষের আসা-যাওয়ার সুবিধার জন্য গণপরিবহন খুলে যাচ্ছে। পরিবহনকর্মীরা দীর্ঘদিন বেকার বসে থাকায় বিক্ষোভ দেখাতে শুরু করেছিল। দিনমজুরদেরও ঘরে বসিয়ে রাখা যাচ্ছে না। ঢাকা শহরে শপিংমল, দোকানপাট খুলে গেছে। মানুষ বাধ্য হয়েছে স্বাভাবিক জীবনযাপন শুরু করতে। কিন্তু মৃত্যুদূতের ছোবল তাতে কমেনি; বরং বহুগুণ বেড়েছে। শিগগিরই ঢাকার হাসপাতালগুলোর অবস্থা লিমার হাসপাতালগুলোর অবস্থায় পৌঁছলে বিস্মিত হওয়ার কিছু নেই।

এ অবস্থার জন্য দায়ী করব কাকে? পেরুতে যেখানে এত কঠোর ব্যবস্থা নিয়েও অসচেতন ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য তা সফল করা যায়নি; বাংলাদেশেও কি অনুরূপ অবস্থাই বর্তমান বিপর্যয়ের জন্য দায়ী নয়? কেবল সরকারকে এ জন্য দায়ী করে লাভ নেই। দায়ী জনগণের অর্থনৈতিক অবস্থাও; দেশটির ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত জনসংখ্যা। করোনা সংকটের শুরুতে শেখ হাসিনা যে বিচক্ষণতার সঙ্গে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সক্ষমতা দেখিয়েছেন, তা বহির্বিশ্বের প্রশংসা লাভ করেছিল। তাহলে এখন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে চাচ্ছে কেন?

এর একটি মাত্র জবাব- পেরুর এক অর্থনীতিবিদের কথাকে ধার করে বলতে হয়, এর জন্য দায়ী জনগণের মধ্যে দারিদ্র্য ও অশিক্ষা এবং সরকারের অদক্ষ প্রশাসন। এবারের সংকটে স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়েছে- গাড়ির চালক যতই দক্ষ ও পারদর্শী হোন, তার গাড়ির চাকা অচল হলে গাড়ি চলে না। এবার প্রমাণিত হয়েছে- শেখ হাসিনা যতই দক্ষ ও বিজ্ঞ রাষ্ট্রপরিচালক হোন, তার প্রশাসন তেমন সচল নয়। গাড়ির এই অচল চাকা চালকের সব দক্ষতা ও সাফল্যকে ব্যর্থ করে দিচ্ছে। বাংলাদেশ একটি উন্নয়নশীল দেশ; কিন্তু তার দরিদ্র জনসংখ্যা বিশাল।

ইউরোপের ধনী দেশগুলোতেই যেখানে লকডাউন শক্তভাবে চালু রাখা যাচ্ছে না, সেখানে বাংলাদেশে তা শক্তভাবে চালু রাখা অসম্ভব। তা ছাড়া বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ব্যক্তিগত গাড়ি নেই। তাই গণপরিবহন এ দেশে দীর্ঘকাল বন্ধ রাখা যায় না। দোকানপাট, শপিংমল খুলে দিতেই হবে। সেইসঙ্গে শিল্প ও কলকারখানাও। এবং তা-ই হচ্ছে।

কিন্তু এ ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ ও নীতিমালা অনুসরণে তার প্রশাসনের ব্যর্থতা অথবা অক্ষমতা লজ্জাজনক। গার্মেন্টস মালিকদের চাপে সরকারি প্রশাসন যখন ফ্যাক্টরিগুলো খুলে দেয়, তখন পরিকল্পিতভাবে পর্যায়ক্রমে ফ্যাক্টরিগুলো কি খোলা যেত না? ফ্যাক্টরি কর্মীদের স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে বাধ্য করা যেত না? ঈদের সময় এমন করে শহরে আসা-যাওয়ার পথগুলো হুট করে খুলে দেওয়া হলো কেন? লকডাউন কি পর্যায়ক্রমে তুলে নেওয়া যেত না? এখন শিথিল লকডাউনের কথা বলা হলেও লকডাউন বাস্তবে আর আছে কি? সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার কথা এখানে আর না তোলাই ভালো।

পেরুর স্বাস্থ্য প্রশাসন ভেঙে গেছে। বাংলাদেশে তার অস্তিত্ব আছে কি? বাংলাদেশের স্বাস্থ্য মন্ত্রকের অযোগ্যতা ও দুর্নীতি এখন হাটবাজারে আলোচনার বিষয়। আমাদের কপাল ভালো। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশ মেনে আমাদের কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক এবার কৃষি উন্নয়নের ওপর জোর দেওয়ায় এবং বৃষ্টির মৌসুম আসার আগে হাওরসহ সকল জেলায় ফসল কেটে কৃষকের গোলায় তোলার ব্যবস্থা করায় হয়তো এই মহামারির সহযাত্রী দুর্ভিক্ষ ও অর্থনৈতিক মন্দার ঝড় বাংলাদেশকে তেমন স্পর্শ করবে না। বিদেশের অনেক অর্থনীতিবিদও তাই মনে করেন।

শেখ হাসিনা যদি করোনার এই বিপর্যয় প্রতিরোধ করতে চান, তাহলে কেবল সুষ্ঠু নির্দেশনা দিলেই চলবে না; তাকে ধাক্কা দিয়ে তার অচল প্রশাসন সচল করতে হবে। যেমন করেছেন নিউজিল্যান্ডের নারী প্রধানমন্ত্রী। তাতে যদি কেউ তাকে 'কর্তৃত্ববাদী' বলে, বলুক। তার এই কর্তৃত্ববাদ মানুষকে বাঁচাবে, দেশকে বাঁচাবে।

আরও পড়ুন

×