লিবিয়ায় বাংলাদেশি হত্যা
জীবিকার জন্য জীবনহানি নয়
সম্পাদকীয়
প্রকাশ: ২৯ মে ২০২০ | ১২:০০ | আপডেট: ৩০ নভেম্বর -০০০১ | ০০:০০
লিবিয়ায় ২৬ বাংলাদেশিসহ ৩০ অভিবাসীর হত্যাকাণ্ড কেবল বাংলাদেশি হিসেবে নয় বরং মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবেই আমরা নিন্দা জানাচ্ছি। তবে স্বাভাবিকভাবেই আমরা বেশি শোকাহত, একে তো তারা বাংলাদেশি; ভাগ্যান্বেষণে এমন দেশে পা দিয়েছিলেন। কিন্তু তারা নিজের কিংবা পরিবারের ভাগ্য পরিবর্তন তো করতে পারেননি বরং ফিরবেন লাশ হয়ে। পরিবারগুলোর এমন যাতনা আমাদের আরও বেদনাহত করছে। স্বাভাবিকভাবে যে কোনো হত্যাকাণ্ডই আমাদের ব্যথিত করে। আর এখানে ৩০ জনের গণহত্যার ঘটনা কতটা উদ্বেগজনক তা বলার অপেক্ষা রাখে না। সংবাদমাধ্যমের ভাষ্যে এ গণহত্যার যে বিবরণ দেখা যাচ্ছে, তাতে আমরা আরও বিস্মিত। মানব পাচারকারী চক্রের এক সদস্যের প্রতিশোধ নিতে তারা ৩০ জনকে হত্যা করে। এমনকি এ ঘটনায় আহত হয় আরও ১১ বাংলাদেশি।
আমরা জানি, দেশে এখনও মানব পাচারকারীরা কতটা সক্রিয় রয়েছে। মানব পাচারের বিরুদ্ধে এ সম্পাদকীয় স্তম্ভে আমরা বারবার উদ্বেগও জানিয়ে আসছিলাম। এমনিতেই লিবিয়া একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ। দেশটির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে যখন সেখানে গৃহযুদ্ধ চলছে, সে সুযোগ নিয়ে প্রায় এক দশক ধরে মানব পাচারকারী চক্র সক্রিয় হয়ে উঠেছে। ভূমধ্যসাগরের কাছে লিবিয়ার বিভিন্ন সীমান্তে ক্যাম্প করে তারা লোকজনকে জিম্মি করে ছোট ছোট নৌকায় ইউরোপে পাঠাচ্ছে। প্রায়ই সেখানে দুর্ঘটনা ঘটছে। ইতোমধ্যে ভূমধ্যসাগরে নৌকাডুবিতে আমাদের অনেক সম্ভাবনাময় তরুণের সলিলসমাধি ঘটেছে। বাংলাদেশ থেকে লিবিয়ায় কর্মী পাঠানো পাঁচ বছর ধরে বন্ধ থাকলেও অবৈধ পথে যাওয়া বন্ধ নেই। দালাল ও মানব পাচারকারী চক্রের ফাঁদে পড়ে কম টাকায় ইউরোপে যাওয়ার লোভে অভিবাসনপ্রত্যাশীরা এ নিষিদ্ধ পথে পা বাড়াচ্ছে। তাতে তারা দুর্ঘটনার শিকার যেমন হচ্ছে, তেমনি এ ঘটনার মতো মাঝেমাঝেই হত্যাকাণ্ডের শিকার হচ্ছে। এসব মৃত্যু অত্যন্ত দুঃখজনক।
আমরা জনশক্তি রপ্তানি ইতিবাচক হিসেবেই দেখছি। আমরা জানি, আমাদের প্রবাসী শ্রমিকদের পাঠানো রেমিট্যান্সই আমাদের অর্থনীতির অন্যতম ভিত্তি। তাদের মাধ্যমে কেবল বৈদেশিক আয়ই অর্জিত হচ্ছে না, একই সঙ্গে আমাদের যুবকদের কর্মসংস্থানেরও ব্যবস্থা হচ্ছে। কিন্তু তাই বলে আমরা এমন অবৈধ অভিবাসন চাই না। আমরা চাই না মানব পাচারকারীদের হাতে পড়ে আমাদের সম্ভাবনাময় তরুণদের স্বপ্নের মৃত্যু ঘটুক। জীবিকার আগে অবশ্যই জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা চাই।
যারা জীবিকার জন্য এখন এভাবে ঝুঁকি নিচ্ছেন, তাদের অবশ্যই বিষয়টি মাথায় রাখতে হবে। কারও প্ররোচনায় নয় বরং নিজের সাধারণ কাণ্ডজ্ঞান দিয়ে বিষয়টি বুঝতে হবে। যেখানে নিরাপত্তা নেই, যে পথে বৈধতা নেই, রাষ্ট্রের কোনো সাহায্য পাওয়ার আশা নেই, সে পথে কেন পা বাড়ানোর মাধ্যমে কেবল নিজেকেই নয়, একই সঙ্গে পরিবারকেও সংকটে ফেলছে। আমরা জানি, যারা বিদেশে যান অনেকেই নিজের শেষ সম্বল জমিজমা পর্যন্ত বিক্রি করে যান। কেউ যান অনেক টাকা ঋণ করে। ফলে এ ক্ষেত্রে ভেবেচিন্তেই পদক্ষেপ নেওয়া চাই। আমরা চাই বিদেশে একেবারে শ্রমিক হিসেবে নয়, শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ নিয়ে দক্ষ জনশক্তি হিসেবেই যাওয়া দরকার। তাতে যেমন কাঙ্ক্ষিত অর্থ উপার্জন করা সহজ হবে, একই সঙ্গে এর মাধ্যমে দেশের ভাবমূর্তিও উজ্জ্বল হবে। এ ক্ষেত্রে সংশ্নিষ্ট কর্তৃপক্ষকে দৃষ্টি দিতেই হবে।
লিবিয়ায় বাংলাদেশি হত্যার ঘটনায় প্রশাসনের করণীয় রয়েছে। ইতোমধ্যে লিবিয়ার কাছে বাংলাদেশ বিচার চেয়েছে বলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন। লিবিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে পুরো ঘটনার তদন্তসহ জড়িতদের গ্রেপ্তার, দোষীদের যথাযথ শাস্তি ও ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার জন্যও অনুরোধ জানিয়েছে বাংলাদেশ। আমরা মনে করি কেবল অনুরোধ নয়, আন্তর্জাতিক শক্তির সহায়তায় তা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে লিবিয়ায় যেসব প্রবাসী কাজ করছেন, তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা দরকার। আমরা জানি, লিবিয়ার যে মিজদাহ শহরে হত্যাকাণ্ড ঘটেছে সেখানে এখন যুদ্ধাবস্থা বিরাজ করছে। সেখানকার ত্রিপোলির পরিস্থিতিও ভালো নয়। এমন নাজুক যেসব জায়গায় বাংলাদেশিরা নিরাপত্তাহীনতায় বাস করছে, তাদের দেশে নিরাপদে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
একই সঙ্গে দেশে অধিক কর্মসংস্থানে মনোযোগ বাড়ানো চাই। কেবল সরকারি প্রচেষ্টাই নয়, কর্মসংস্থান বাড়াতে বেসরকারি উদ্যোগ যেমন প্রয়োজন, তেমনি ব্যক্তিপর্যায়ে এমনকি যারা পড়াশোনা শেষ করে চাকরির বাজারে প্রবেশ করতে চান, তাদের উল্লেখযোগ্য অংশও নিজেদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলতে পারেন। আর অবশ্যই প্রশাসনকে মানব পাচারকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিতেই হবে। এভাবে অন্য দেশে অসহায় নাগরিকের মৃত্যু কেউ মেনে নেবে না।