ঢাকা বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই ২০২৬

স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা এবং অণুজীব বিজ্ঞানী

স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা এবং অণুজীব বিজ্ঞানী
×

ডা. সমিরুল ইসলাম বাবু

হোসাইন মোহাম্মদ জাকি

প্রকাশ: ০৭ জুলাই ২০২০ | ১২:০০

করোনাকালে সারাদেশের আমজনতাকে যখন ঢাকা মেডিকেলমুখী হতে হয় আর প্রভাবশালীদের হতে হয় সিএমএইচমুখী, আমাদের দুর্বল স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনাটা তখন উপলব্ধি করা যায় হাড়ে হাড়ে। স্বাস্থ্য খাতের এই অব্যবস্থাপনার অন্যতম আরেকটি দিক হলো- চিকিৎসক ব্যতীত অন্যান্য ডিসিপ্লিনের গ্র্যাজুয়েটদের স্বাস্থ্য খাত সম্পৃক্ততায় ঘাটতি। এমনই একটি ক্ষেত্র অণুজীববিজ্ঞান তথা মাইক্রোবায়োলজি। মহামারির এই সময়ে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অণুজীব কভিড-১৯ মোকাবিলায় বিশ্বব্যাপী অণুজীব বিজ্ঞানী ও ভাইরোলজিস্টরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। অথচ বাংলাদেশের দৃশ্যপটে তারা অনুপস্থিত।
মাইক্রোবায়োলজিস্ট মূলত দু'ধরনের। চিকিৎসক মাইক্রোবায়োলজিস্ট ও গ্র্যাজুয়েট মাইক্রোবায়োলজিস্ট। যারা কোনো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অণুজীববিজ্ঞান বিষয়ে অনার্স-মাস্টার্স সম্পন্ন করেন, তারা হচ্ছেন গ্র্যাজুয়েট মাইক্রোবায়োলজিস্ট। আর এমবিবিএস ডাক্তারদের মধ্যে যারা পরবর্তী সময়ে ছয় মাস বা এক বছর মেয়াদি মাইক্রোবায়োলজির ওপর সুনির্দিষ্ট প্রশিক্ষণ নেন, তাদের বলা হয় চিকিৎসক মাইক্রোবায়োলজিস্ট। আমেরিকা-কানাডার মতো দেশে করোনাভাইরাসসহ অন্য যে কোনো সংক্রামক ব্যাধি ও মহামারি মোকাবিলায় চিকিৎসক ও গ্র্যাজুয়েট মাইক্রোবায়োলজিস্টরা হাসপাতাল ও ল্যাবে হাতে হাত রেখে কাজ করছেন। কিন্তু যথাযথ নীতিমালার অভাবে বাংলাদেশে সেই সুযোগ এখনও তৈরি হয়নি। বাংলাদেশের কোনো ডায়াগনস্টিক ল্যাব বা হাসপাতালে বর্তমানে কোনো গ্র্যাজুয়েট মাইক্রোবায়োলজিস্ট কর্মরত নেই। আছেন ডাক্তার মাইক্রোবায়োলজিস্ট ও মেডিকেল টেকনোলজিস্ট।
এ প্রসঙ্গে যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অণুজীব বিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মো. ইকবাল কবীর জাহিদ বলেন, আমেরিকায় গ্র্যাজুয়েট মাইক্রোবায়োলজিস্টরা ভাইরাসটির টেস্টিং ও ডিটেকশনে প্রত্যক্ষভাবে কাজ করছেন। এটিকে নিয়ে সেখানে জিনোম সিকোয়েন্সিং, বিভিন্ন ধরনের ইমিউনলজিক্যাল ও সেরেলজিক্যাল পরীক্ষা-নিরীক্ষাসহ নানা ধরনের কার্যক্রম চলছে। যার মধ্য দিয়ে তারা এই ভাইরাস ও তার ইনফেকশন সম্পর্কে বিভিন্ন ধরনের তথ্য সংগ্রহ করছেন। গ্র্যাজুয়েট মাইক্রোবায়োলজিস্টরা পিসিআরের মাধ্যমে ভাইরাসটি পজিটিভ নাকি নেগেটিভ সেটি পরীক্ষা করেন। পজিটিভ হলে ভাইরাল লোডটা কত, সেটি খতিয়ে দেখেন। এই তথ্যগুলোর ওপর নির্ভর করে ডাক্তাররা ট্রিটমেন্ট মডিউল তৈরি করেন।
এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ বেশ খানিকটা পিছিয়ে আছে। মেডিকেল টেকনোলজিস্ট ও চিকিৎসক মাইক্রোবায়োলজিস্টরা কিন্তু ভাইরাস চিহ্নিত করার জন্য প্রয়োজনীয় মলিকিউলার বায়োলজির টেকনিকগুলোর ব্যাপারে দক্ষ নন। এ বিষয়ে তাদের সম্যক জ্ঞান নেই, থাকার কথাও নয়। অতি মাত্রায় সংক্রামক এই ভাইরাসগুলোকে কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে, সেই প্রযুক্তি তারা জানেন না। যে কারণে প্রতিটি ক্ষেত্রেই তারা সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন। স্যাম্পল কালেকশন থেকে শুরু করে স্যাম্পল ট্রান্সপোর্টেশন, স্যাম্পল প্রসেসিং, টেস্টিং, ইন্টারপ্রেটেশন অব ডাটা- প্রত্যেকটি ধাপ এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিটি ধাপেই ভুল হওয়ার সমূহ ঝুঁকি থাকে। ফলস পজিটিভ বা ফলস নেগেটিভ ডাটা আসতে পারে। বর্তমানে বেশ কয়েকটি কভিড-১৯ টেস্টিং ল্যাবে গ্র্যাজুয়েট মাইক্রোবায়োলজিস্টরা স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে কাজ করছেন এবং সেই সব ল্যাবে আরটি-পিসিআর পরীক্ষার প্রত্যাশিত ফলাফল পাওয়া যাচ্ছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষ থেকে ল্যাবের টেবিলে টেবিলে জীবাণুর সঙ্গে যাদের সংসর্গ, সেই জীবাণু ব্যবস্থাপনায় গ্র্যাজুয়েট মাইক্রোবায়োলজিস্টদের সংযুক্তি প্রজ্ঞার পরিচায়ক হবে নিঃসন্দেহে। সংক্রামক ভাইরাসটিকে সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারায় একের পর এক অনেক ডাক্তার, নার্স ও হাসপাতাল ব্যবস্থাপক করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন, হচ্ছেন। কোথায়, কখন, কীভাবে একটি সংক্রামক জীবাণু থাকতে পারে; কত ভিন্ন ভিন্ন ভাবে তাকে জীবাণুমুক্ত করা যেতে পারে- গ্র্যাজুয়েট মাইক্রোবায়োলজিস্টরা তাদের শিক্ষাজীবনে এসব বিষয়ে গভীর জ্ঞান অর্জন করে থাকেন। এই প্রেক্ষাপটে করোনা ওয়ার্ডগুলোকে সঠিকভাবে জীবাণুমুক্ত রাখতে গ্র্যাজুয়েট মাইক্রেবায়োলজিস্টরা সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে পারতেন।
উন্নত দেশগুলোর মতো বাংলাদেশেও মেডিকেল টেকনোলজিস্ট, চিকিৎসক মাইক্রোবায়োলজিস্ট এবং গ্র্যাজুয়েট মাইক্রোবায়োলজিস্টদের সমন্বয়ে একটা দলগত ব্যবস্থাপনা কার্যকর করা আবশ্যক। স্বাস্থ্য খাতের নীতি নির্ধারকরা মাল্টি ডিসিপ্লিনারি এই অ্যাপ্রোচ ব্যবহার করলে করোনাভাইরাস এবং অন্য যে কোনো মহামারি মোকাবিলায় কাঙ্ক্ষিত সাফল্য পাওয়া যাবে বলে আশা করা যায়।
গবেষক

আরও পড়ুন

×