ঢাকা শুক্রবার, ১৭ জুলাই ২০২৬

একাত্তরের জয়মাল্য তার প্রাপ্য

একাত্তরের জয়মাল্য তার প্রাপ্য
×

আবু সাঈদ খান

প্রকাশ: ১৭ জুলাই ২০২০ | ১২:০০


বিএনপি নেতার তকমা নিয়ে স্বাধীনতার ইশতেহার পাঠক, মুজিব বাহিনীর সংগঠক, জাসদের প্রতিষ্ঠাতাদের অন্যতম শাজাহান সিরাজ (৭৭) বিদায় নিলেন। বিএনপিই ছিল তার সর্বশেষ রাজনৈতিক ঠিকানা। ১৯৯৪ সালে তিনি বিএনপিতে যোগ দেন। ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে তিনি বিএনপির সাংসদ ও মন্ত্রী ছিলেন। ১/১১-এর পরে আর রাজনীতিতে সক্রিয় হননি। স্বাস্থ্যগত কারণে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছিলেন। তবে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে তার মানসিক দূরত্বও তৈরি হয়। এ বিষয়ে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা অবহিত আছেন। এই দূরত্ব সৃষ্টির একটি ঘটনার আমিও সাক্ষী।
সম্ভবত ২০১৬ সালের ঘটনা। হঠাৎ করে একদিন শাজাহান সিরাজের ফোন পেলাম। এক যুগের অধিক সময় পর এই প্রথম কথোপকথন, ফোনালাপ।
১৯৬৯ সালে শাজাহান সিরাজ যখন কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের তুখোড় নেতা, '৭০-এ ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক এবং '৭১-এ স্বাধীন বাংলাদেশ ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের চার নেতার অন্যতম, তখন আমি ফরিদপুরে ছাত্রলীগের কর্মী। স্বাধীনতা-উত্তরকালে তার সঙ্গে আমার পরিচয় ও ঘনিষ্ঠতা। একসঙ্গে জাসদ করেছি, একই মিছিলে হেঁটেছি, একই মঞ্চে বক্তৃতা করেছি, বাকবিতণ্ডাও করেছি। অনেক কথা, অনেক স্মৃতি। তবে তিনি সর্বদাই বড় ভাইয়ের আসনে, আমি ছোট ভাই হিসেবে তার স্নেহধন্য। সে যাই হোক, তিনি ফোনে বললেন, 'আমি তোমার লেখা পড়ি, টকশোতে তোমার কথা শুনি। তুমি ঠিক জায়গায়ই আছ?' কৌতুকের সুরেই বললাম, 'আপনি কোন জায়গায় আছেন?' বললেন, তিনি আর দলীয় রাজনীতিতে নেই; যতদিন বাঁচবেন, নতুন প্রজন্মের কাছে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস তুলে ধরবেন। অনেক কথা বললেন। কথা প্রসঙ্গে এলো বঙ্গবন্ধু প্রসঙ্গ। বঙ্গবন্ধুর বিপরীতে মেজর জিয়াকে দাঁড় করানোর হীন রাজনীতিতে সুর মেলানোর কথা তুলতেই বললেন, এ জন্য জাতির কাছে ক্ষমা চাইবেন। তার কথা- বঙ্গবন্ধু সবার ওপরে, তার নামেই যুদ্ধ হয়েছে, তার সঙ্গে কারও তুলনা চলে না। তিনি আগামী ৩ মার্চ স্বাধীনতার ইশতেহার পাঠ দিবসে সব সত্য তুলে ধরবেন বলে জানালেন। ৩ মার্চের সভায় আমাকে বক্তা হিসেবে থাকার অনুরোধ করলেন। আমি একদিন সময় নিলাম। শেষ পর্যন্ত আমাকে রাজি হতে হলো। শাজাহান ভাই জানালেন, আনোয়ার হোসেন মঞ্জু ও মতিউর রহমান চৌধুরী আলোচক হিসেবে সম্মতি দিয়েছেন।
৩ মার্চ প্রেস ক্লাব মিলনায়তনে আয়োজিত সভায় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কৌতূহলী কর্মী, সাংবাদিক, মুক্তিযোদ্ধাদের সমাগম হয়েছিল। তার এলাকা টাঙ্গাইলের কালিহাতী থেকে অনেক লোক এসেছিলেন। তবে বিএনপির কোনো পরিচিত মুখ ছিলেন না। ৩ মার্চ উদযাপন কমিটির আহ্বায়ক বা সভাপতি এক সময়ের মহানগর জাসদ নেতা নজরুল ইসলাম খান সভাপতিত্ব করেন। আনোয়ার হোসেন মঞ্জু ও মতিউর রহমান চৌধুরী এলেন না। আমাকে লম্বা বক্তৃতা করতে হলো।
শাজাহান ভাই তখন শারীরিকভাবে দুর্বল; তার দেহে বাসা বেঁধেছে ঘাতক ক্যান্সার। তখন তিনি মানসিকভাবেও বিপর্যস্ত। তার পরও আমার করা সমালোচনা মাথা পেতে নিয়ে বললেন, খোলা মনে নতুন প্রজন্মের কাছে সত্য কথা বলে যাবেন। তিনি বঙ্গবন্ধুকে স্বাধীনতার মহান স্থপতি হিসেবে সবার ওপরে তার স্থান উল্লেখ করে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের সব নায়কের ভূমিকার কথা তুলে ধরেন। সিরাজুল আলম খানের নেতৃত্বে নিউক্লিয়াস গঠনসহ সংগ্রামের দীর্ঘ ইতিহাসের বর্ণনা করেন। যতদূর মনে পড়ে, সেক্টর কমান্ডার হিসেবে জিয়া, তাহের, জলিল, মঞ্জুরের অবদানের কথাও বলেছিলেন।
সংবাদপত্র ও টেলিভিশনে এই সংবাদ প্রচারিত হওয়ার পর রাজনৈতিক অঙ্গনে গুঞ্জন শুরু হয়। শাজাহান সিরাজ কি বিএনপিতে থাকছেন না? তবে তিনি বিএনপি থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে পদত্যাগ করলেন না, দলের সঙ্গে যোগাযোগও রাখলেন না। বিএনপিও এসব নিয়ে উচ্চবাচ্য করল না।
এই সভার পর বেশ কয়েকটি টিভি চ্যানেল তাকে টকশোতে আমন্ত্রণ করে। আমি অন্তত দুটি টকশোয় মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক আলোচনায় তার সঙ্গে সহ-আলোচক ছিলাম। তিনি সত্য কথনে আর দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভোগেননি। সম্ভবত এই ইস্যুতেই বিএনপির সঙ্গে তার দূরত্ব বেড়ে যায়।
এরপর থেকে তার স্ত্রী রাবেয়া সিরাজ, মেয়ে সারওয়াত সিরাজসহ তার নিকটজনের উদ্যোগে প্রতিবছরই ৩ মার্চ স্বাধীনতার ইশতেহার পাঠ দিবসে আলোচনা সভা হয়েছে। সেখানে আ স ম আবদুর রব, আবদুল কাদের সিদ্দিকী বীরউত্তম, ডা. জাফরুল্লাহ্‌ চৌধুরীসহ অনেক বিশিষ্টজন বক্তৃতা করেছেন। আমিও একাধিকবার বক্তৃতা করেছি। কখনও কোনো বিএনপি নেতাকে বক্তৃতার জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। শাজাহান সিরাজ বিভিন্ন সময়ে বলেছেন, তিনি নির্মোহভাবে মুক্তিযুদ্ধের কথা লিখবেন। জানি না, এ কাজে হাত দিয়েছিলেন কিনা।
ঘটনাবহুল ও বর্ণাঢ্য তার জীবন। দু'বার করটিয়া সাদত কলেজ ছাত্র সংসদের সহসভাপতি ছিলেন। ঢাকায় এসে উনসত্তরে গণঅভ্যুত্থানে প্রথম সারির সৈনিক। আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার জন্য ১৯৭০ সালে ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৭১ সালে গঠিত স্বাধীন বাংলাদেশ ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের চার সদস্য, যারা চার খলিফা বলে যারা খ্যাত হয়েছিলেন, তিনি তাদের অন্যতম। সিরাজুল আলম খানের নেতৃত্বে গঠিত নিউক্লিয়াসের (স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী পরিষদ) সদস্য ছিলেন। স্বাধীনতার পতাকা পরিকল্পনায় ভূমিকা রেখেছেন। ১৯৭১ সালের ৩ মার্চ পল্টনের সমাবেশে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের উপস্থিতিতে স্বাধীনতার ইশতেহার পাঠ করেছেন। যে ইশতেহারে স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের ঘোষণা করা হয়। রবীন্দ্রনাথের 'আমার সোনার বাংলা' গানকে স্বাধীন বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে স্বাধীন বাংলাদেশের সর্বাধিনায়ক ঘোষণা করা হয়।
একাত্তরে বাংলাদেশ লিবারেশন ফোর্স (বিএলএফ) বা মুজিব বাহিনীর অন্যতম সংগঠক ছিলেন তিনি। একাত্তরে তার আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কথা অনেকেই জানেন না। একাত্তরে যখন মুজিব বাহিনী গঠন নিয়ে প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের সঙ্গে চার যুবনেতার (শেখ ফজলুল হক মণি, সিরাজুল আলম খান, আবদুর রাজ্জাক ও তোফায়েল আহমেদ) দ্বন্দ্ব হয়। এই যুবনেতারা মুজিবনগর সরকারের নেতৃত্বের অনুমোদন ছাড়াই ভারত সরকারের সহায়তায় মুজিব বাহিনী গঠন করেন। একপর্যায়ে তারা সরকারের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেন। তখন মুজিব বাহিনীর পক্ষে শাজাহান সিরাজকে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষার জন্য লিয়াজোঁ কর্মকর্তার দায়িত্ব প্রধান করা হয়। দায়িত্বপ্রাপ্ত হয়ে তিনি সরকার ও মুজিব বাহিনীর মধ্যে সম্পর্ক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
জাসদের প্রতিষ্ঠাদের তিনি অন্যতম। সাত সদস্য বিশিষ্ট আহ্বায়ক কমিটির সদস্য ছিলেন। প্রথম পূর্ণাঙ্গ কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এবং ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। এবং জাসদে (সিরাজ) সাধারণ সম্পাদক ও সভাপতি ছিলেন।
রাজনৈতিক উত্থান-পতনের কোনো প্রভাব তার এলাকার মানুষের ওপর পড়েনি। এলাকায় তিনি সর্বদাই জনপ্রিয়। তিনি তিনবার জাসদ থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। বিএনপি থেকে আরও দু'বার (১৯৯৬ ও ২০০১) সাংসদ হলেন। দুই দফা মন্ত্রীও হলেন। বন ও পরিবেশমন্ত্রী হয়ে থ্রি স্টোক স্কুটার ও পলিথিন শপিং ব্যাগ নিষিদ্ধ করেন এবং তা বাস্তবায়নে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলেন।
মন্ত্রী হিসেবে তার এমন দক্ষতার পরিচয় দেওয়া সত্ত্বেও বলতে চাই- যে শাজাহান সিরাজ হাজার হাজার তরুণকে সাম্যবাদী সমাজের স্বপ্ন দেখিয়েছেন, সমাজ বিপ্লবের চেতনায় উদ্বুদ্ধ করেছেন, নিজেও জেল-জুলুম-নির্যাতন সয়েছেন; সেই লড়াকু যোদ্ধার অতি দক্ষিণপন্থি বিএনপিতে যোগদান বড্ড বেমানান। একান্ত আলাপচারিতায় মনে হয়েছে- এ ভুল তাকেও পীড়া দিত।
এটি স্বীকার্য যে, একশ' ভাগ আলোয় ভরা কোনো জীবন নেই। প্রত্যেকের জীবনে আলো আছে, আবার আঁধারও আছে। ভালো-মন্দ দুই-ই আছে। সবকিছু মিলেই জীবন। কোনো মানুষকে জীবনের একটি কালপর্বের মধ্যে বিচার করার সুযোগ নেই। তাই আমরা বিএনপি নেতার আসনে বসিয়ে শাজাহান সিরাজের সংগ্রামী জীবনকে খাটো করে দেখতে পারি না। প্রসঙ্গক্রমে, বিএনপিতে যেসব মুক্তিযোদ্ধা আছেন, তাদের একাত্তরের ভূমিকাকে আমরা অগ্রাহ্য করতে পারি না। একাত্তরকে একাত্তরের জায়গায় দাঁড়িয়ে দেখতে হবে। সে বিবেচনায় মুক্তিযোদ্ধারা এখন কে কোন দলে আছেন তা বিচার্য নয়।
সবাই একবাক্যে মানবেন, বাষট্টি-চৌষট্টির শিক্ষা আন্দোলন, ছেষট্টির ছয় দফা আন্দোলন, উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান ও একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে শাজাহান সিরাজের ভূমিকা অসামান্য। এই গুরুত্বপূর্ণ অবদানের জন্য যথাযথ সম্মান ও স্বীকৃতি তার প্রাপ্য।
সাংবাদিক ও লেখক
[email protected]

আরও পড়ুন

×