বহুরৈখিক গল্পের বুনন
রাসেল আজাদ বিদ্যুৎ
প্রকাশ: ১৭ জুলাই ২০২৬ | ০৮:০৮
| প্রিন্ট সংস্করণ
হাতে কলম তুলে নিয়েছেন, লিখে চলেছেন একের পর এক গল্প, উপন্যাসিকা ও উপন্যাস। ‘বাজার কাটতি লেখক’ তকমা নিয়ে প্রকাশ করে চলেছেন একের পর এক বই; অথচ উপন্যাস ও গল্পের পার্থক্য নির্ণয়ে ব্যর্থ। সমকালে এমন উদাহরণ খুঁজে পাওয়া যাবে বিস্তর। এদিক থেকে কথাসাহিত্যিক শাহীন আখতার যে পুরোপুরি সফল, সে কথা নির্দ্বিধায় বলা যায়। বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে নন্দিত এই লেখকের ‘তালাশ’, ‘সখী রঙ্গমালা’, ‘ময়ূর সিংহাসন’, ‘অসুখী দিন’সহ অন্যান্য উপন্যাসের পাশাপাশি ‘বোনের সঙ্গে অমরলোকে’, ‘শিষ ও অন্যান্য গল্প’, ‘আবারও প্রেম আসছে’, ‘ভালোবাসার পরিথি’, ‘মানচিত্র’সহ অন্যান্য গ্রন্থের গল্প পাঠে। লেখনীর বিষয় ভাবনাতে বৈচিত্র্য লক্ষ্য করা যায়। অবশ্য এই আলোচনা শাহীন আখতারের রচনাগুলো নিয়ে তাঁর ভাবনার জগতের অনুসন্ধান নয়। মূলত এটি তাঁর ‘নির্বাচিত ২০’ বইটিতে স্থান পাওয়া গল্পের পাঠ সমালোচনা। সে কারণে উপরোক্ত কথাগুলো প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে।
‘নির্বাচিত ২০’– এই শিরোনাম থেকে এটি স্পষ্ট যে পাঠক মনে ছাপ ফেলে যাওয়ার মতো ২০টি গল্প বইতে স্থান দেওয়া হয়েছে। পাঠ শেষে এটিও উপলব্ধি হয়– গল্প বাছাইয়ে লেখক ও প্রকাশকের বিষয়-বৈচিত্র্যকে প্রাধান্য দিয়েছেন। প্রথম গল্প ‘মেকআপ বাক্স’ দিয়ে আলোচনা শুরু করা যাক– যে গল্পের বুননে তুলে আনা হয়েছে দুই বোনের সম্পর্কের গভীরতা। যেখানে আমরা দেখি বেশ্যাবৃত্তির কারণে মৃত্যু ছোট বোন মালার দাফন নিয়ে যে জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে, তার সমাধান সহজ নয়। তারপরও বড় বোন মল্লিকা তাঁর ছোট বোনের দাফন করতে মরিয়া। তাঁর ভাষ্য, ‘মালা বেশ্যা কি বারোভাতারি যা-ই হোক– বেওয়ারিশ তো নয়।’ এই যে বোনের পেশাদারি পরিচয়কে তুচ্ছ করে, অন্য সবার মতো তাঁর শেষকৃত্য সম্পন্ন করার যে আকাঙ্ক্ষা, তা দারুণভাবে মনে আঁচড় কাটে। যার প্রেক্ষিতে আমরা দেখতে পাই, কীভাবে গরুর গাড়িতে করে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে লাশ দাফনের ঠিকানা খুঁজে নেওয়া। যাত্রাপথে মল্লিকার সঙ্গী অন্ধ মেকআপম্যান এক ধরনের রহস্যের আবহ তুলে আনে গল্পে।
দ্বিতীয় গল্প ‘বোনের সঙ্গে অমরলোকে’ দুই বোনকে ঘিরে হলেও এতে খানিকটা জাদুবাস্তবতার দৃশ্যায়ন তুলে আনা হয়েছে। ‘হ্যাজাক জ্বালিয়ে রাস্তার যেখানটায় খোঁড়াখুঁড়ি চলছে, সেই অন্ধকার ভূগর্ভ থেকে আমার ছোট বোন সাড়ে পাঁচতলায় উঠে আসে।’ গল্পের সূচনার এই দেড় লাইন পড়েই পাঠকের মনে এক ধরনের গোলকধাঁধা তৈরি হয়। এরপর গল্পের পথ মাড়িয়ে ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসা যায় গোলকধাঁধা থেকে। তখনই খুঁজে পাওয়া যায় কাহিনির প্রকৃত নির্যাস।
লেখক জাদুবাস্তবতার আশ্রয় নিয়েছেন ‘সাপ, স্বামী, আশালতা ও আমরা’ গল্পেও। আশালতা নামে এক নারী সাপে রূপান্তরিত হওয়ার আগে আরও কিছু ঘটনার সাক্ষী হই আমরা। যা এই সমাজ-বাস্তবতা নিয়ে আলাদা করে ভাবনার খোরাক জোগায়। অন্যদিকে ‘আলৌকিক ছড়ি’ গল্পে পুরাণের ঘটনাবলির আশ্রয় নিয়ে রোহিঙ্গাদের জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণ এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, যা কিছুটা হলেও পাঠকমনে নিপীড়িতের বেদনা জাগিয়ে তোলে।
‘নেতাজি ঔষাধালয়’ গল্পে দেশভাগ, মুক্তিযুদ্ধ এবং এক চিকিৎসকের আদর্শ ও পেশাদারি জীবনের চিত্র এমনভাবে তুলে আনা হয়েছে, যা সীমিত পরিসরেও কয়েক দশকের দৃশ্য যেভাবে মনের পর্দায় তুলে ধরেছে, তা এক কথায় অনবদ্য।
‘সবুজ পাসপোর্ট’ গল্পে রহমতুল্লাহ নামে এক বৃদ্ধের যে মাতৃভূমির প্রতি টান, তা কোনোভাবেই উপেক্ষা করা যায় না। দেশভাগের কারণে বিহারের ছাপরা থেকে প্রাণভয়ে ছুটে আসা এই বৃদ্ধ ও তাঁর বংশধরের যাপিত জীবনের পুরোটাই করুণ রসের চিত্র এঁকেছে। অন্যদিকে ‘আসতান’ গল্পে সমাজের উঁচু ও নিচু দুই শ্রেণির মানুষের ভাবনার জগৎ ও জীবনযাপনের পার্থক্যটা স্পষ্ট করে তুলেছে বাস্তবতার নিরিখে।
‘আমিরজান বিবির সংবর্ধনা’ একাত্তর-পরবর্তী সেই সময়কে ধারণ করেছে, যখন বীরাঙ্গনা আর মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে নানা মহলে স্বার্থসিদ্ধির মহোৎসব শুরু হয়েছে। যেখানে প্রাপ্তির বদলে বঞ্চনা হয়ে উঠেছে প্রধান। তবে ‘তিনি গুঁড়া মরিচের ব্যবহার জানতেন’ ও ‘পাঁচটা কাক ও একজন মুক্তিযোদ্ধা’ গল্পে একাত্তরকে ধারণ করা হয়েছে একটু ভিন্নভাবে। এ ছাড়াও ‘ভার্জিন মেরির আত্মহত্যা’, ‘আবারও প্রেম আসছে’, ‘ভালোবাসার পারিধি’, ‘মধুপূর্ণিমার রাতের গল্প’, ‘শিস’, ‘তাজমহল’, ‘আমবাগানের সখা’, ‘ঠান্ডা চা’, ‘বৈকালিক ভ্রমণ’ ও ‘চাঁদের পাহাড়’ গল্পগুলোতে মিশে আছে বিষয় বৈচিত্র্য ও ভিন্ন রকম বয়ান। এক কথায়, ‘নির্বাচিত ২০’ হয়ে উঠেছে বহুরৈখিক গল্পের বুনন। পাঠের পর যার অনুরণন থেকে যায় দীর্ঘ সময়; চলচ্চিত্রের মতো যার দৃশ্যগুলো মনের পর্দায় ভেসে ওঠে বারংবার।
- বিষয় :
- গল্প