আলো ও অন্ধকারের কুমকুম
শিল্পকর্ম :: নাজিব তারেক
মনি হায়দার
প্রকাশ: ১৭ জুলাই ২০২৬ | ০৮:১২
| প্রিন্ট সংস্করণ
কে? বালিশে হেলান দিয়ে আধশোয়া সলিল সুজন ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায় দরজার দিকে।
তাকিয়েই বিস্মিত, একজন মহিলা রুমের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে চুপচাপ। এক হাতে ফুটফুটে একটা পাঁচ-ছয় বছরের ছেলের হাত ধরা। আধশোয়া থেকে উঠে বসে সলিল। মহিলা স্থির, অনড় এবং একই সঙ্গে ধ্যানস্থ। বিছানার ওপর এলেবেলে রাখা শার্টটা টেনে শরীরে লাগিয়ে পা নামিয়ে দাঁড়ায় সলিল, আপনি রুম খুঁজছেন? কত নাম্বার রুম আপনার?
মৃদু হেসে ঘাড় নাড়েন তিনি। আমি আপনার মোবাইলে বাজানো রবীন্দ্রসংগীত শুনছি।
ঠিক বুঝলাম না।
একটু বসি আপনার রুমে?
আসুন।
পরিপাটি রুমের মধ্যে তিনি প্রবেশ করে সামনের সোফায় বসেন। শরীরের সঙ্গে লেপ্টে আছে ছেলেটা। টেবিলের ওপর রাখা চিপসের প্যাকেটটা ছেলেটার হাতে দেয় সলিল, কী নাম তোমার বাবু?
বাবু!
চিপসের প্যাকেটটা হাতে নিয়ে খুশিতে হাসছে।
সত্যি তোমার নাম বাবু?
বাবুর মা হাসে, হ্যাঁ ওর ডাক নাম বাবু।
আপনি?
আমি কুমকুম, সংক্ষেপে কুমু। আপনার রুমের দুই রুম পরে আমাদের রুম। আমরা, মানে আমি বাবুর বাবার সঙ্গে একটা বিয়ের অনুষ্ঠানে এসেছি মাইজদী। বিয়ের অনুষ্ঠান শেষ, আমাকে হোটেলের সামনে নামিয়ে দিয়ে চলে গেছেন তিনি জরুরি কাজে। ফিরতে ঘণ্টাখানেক সময় লাগবে। আমি রুমের দিকে যাচ্ছিলাম বাবুকে নিয়ে কিন্তু আপনার খোলা রুম পার হওয়ার সময় গান শুনে...
বুঝতে পেরেছি। হাসে সুজন, রবীন্দ্রসংগীতই বাজছে আমার মোবাইলে... আপনি অন্য গান শুনবেন? মোবাইল হাতে নেয়।
না, আমি রবীন্দ্রসংগীতই শুনবো।
কোনটা শুনবেন?
রবীন্দ্রনাথের প্রতিটি গান শোনার যদি সুযোগ থাকে, শুনবো।
সলিল মোবাইল হাতে নিয়ে ইউটিউবে গান খুঁজতে খুঁজতে জবাব দেয়, কুমু আপনি সত্যিই বলেছেন, রবীন্দ্রনাথের প্রতিটি গানই শোনা যায়, অনুভব করা যায়, ধারণ করা যায়, শ্রান্ত হওয়া যায়, মগ্ন রূপের অতলে তলিয়েও যাওয়া যায় নিরন্তর, কিন্তু গান শোনা শেষ হবে না।
রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যার কণ্ঠে বেজে ওঠে রবীন্দ্রনাথ– ‘আমার সকল দুখের প্রদীপ জ্বেলে দিবস গেলে করব নিবেদন–/ আমার ব্যথার পূজা হয় নি সমাপন...।’
মানুষের জীবনে হঠাৎ এমন মুহূর্ত আসে, যা অভাবিত, অকল্পনীয়। মাইজদী শহরের মেইন রোডের রেইনবো হোটেলের পাঁচ তলায় ৫১০ নম্বর রুমে যা ঘটছে, কয়েক মিনিট আগেও চিন্তা তো ভালো, স্বপ্নও দেখেনি সুজন। রুমে অসাধারণ সুন্দরী কুমু কোত্থেকে এসে দরজায় দাঁড়ায় আর এখন রুমের মধ্যখানে সোফায় বসে গভীর তন্ময়তার সঙ্গে শুনছেন রবীন্দ্রনাথকে। আড়চোখে তাকায় সলিল, নির্ভার দুধে আলতা রঙের কোমল কমনীয় মুখ। ঠোঁটজোড়া খানিকটা পুরু। লম্বা নাকের দুই পাশে দুটি চোখে আশ্চর্য শ্যামল জলপদ্ম ভেসে বেড়ায়। চওড়া কপালের ওপর কয়েকগাছি চুল ফ্যানের বাতাসে দাউ দাউ উড়ছে। গোটা শরীর কালো আলখেল্লায় আবৃত। পায়ে চামড়ার সুদৃশ্য স্যানডেল। কুমুর শরীরকোষ থেকে নির্মল মধুর বন্যার কণ্ঠের সঙ্গে ভেসে আসছে শালদুধের কাম গন্ধ।
গানটা শেষ হলে আরেকটা শুরু হওয়ার মধ্য-সময়ে কুমু জানতে চাইলেন, আপনি কোথা থেকে মাইজদী এসেছেন?
আমি ঢাকা থেকে এসেছি, রবীন্দ্রনাথের জন্মজয়ন্তীর একটা অনুষ্ঠানে অতিথি হয়ে। সন্ধ্যার পর অনুষ্ঠান শেষ হয়ে গেলে খাওয়া-দাওয়া সেরে হোটেল রুমে চলে এলাম।
কী করেন আপনি?
আমি ঢাকায় একটা কলেজে ইংরেজি সাহিত্য পড়াই।
কৌতুকে নেচে ওঠে কুমুর আঁখিপল্লব, বুকের গভীর থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস বের হয়ে আসে– অনুষ্ঠান কেমন হলো?
দারুণ হয়েছে, চিন্তার চেয়েও সুন্দর হয়েছে অনুষ্ঠান। মাইজদীর জেলা প্রাথমিক শিক্ষা বিভাগের প্রধান আন্না পুনম। তিনি আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। ঢাকা থেকে আমার সঙ্গে ড. সরকার আবদুল মান্নান, গল্পকার মোখলেস মুকুল, কবি নূরুল হক এসেছেন। বিকেলে মাইজদীর সুবর্ণচরের সরকারি কলেজে রবীন্দ্রনাথকে স্মরণে এনে অনুষ্ঠানে তিন-চারশ ছাত্রছাত্রীসহ সমাজের নানা স্তরের শ্রোতার উপস্থিতিতে আমরা আলোচনা করেছি। এমন অনুষ্ঠান বা মনস্বী শ্রোতা সাধারণত ঢাকায় পাওয়া যায় না। আলোচনা শেষে স্থানীয় শিল্পীরা রবীন্দ্রসংগীত গেয়ে শুনিয়েছেন। আমার আজকের দিনটা রবীন্দ্রময়। ঢাকা শহরে এমনটা হয় না আজকাল।
ঠিকই বলেছেন আপনি, ঢাকা খুব ব্যস্ত শহর, আপন মনে বলেন কুমু।
ঢাকায় কোথায় থাকেন আপনি?
আমরা থাকি খিলগাঁও।
বাবুর বাবা কী করেন?
ব্যবসা।
কিন্তু আপনি নিজেও তো মোবাইলে গান শুনতে পারেন–
রুমের মধ্যে পাথরের নীরবতা নেমে আসে কয়েক মুহূর্ত, কুমু দরজা দিয়ে বাইরে তাকান, না পারি না। পারি না বলেই তো বুভুক্ষের মতো আপনার রুমে ঢুকে গান শুনছি।
সলিল অবাক তাকিয়ে থাকে কুমুর দিকে, কী বলবে, কী প্রশ্ন করবে বুঝে উঠতে পারছে না।
আপনি বুঝতে পারেননি বোধহয়? পাল্টা প্রশ্ন করেন কুমু।
মাথা নাড়ে সলিল, রাইট। ঠিক বুঝতে পারছি না । দেখতে পাচ্ছি আপনার হাতে দামি মোবাইল। গান শুনতে সমস্যা কোথায়?
আমি ছায়ানটে গান শিখেছি সাত বছর। একই সঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অনার্স পড়ছিলাম অর্থনীতিতে। আমার মা মারা গেছেন আমি যখন নবম শ্রেণিতে পড়ি। বাবা আরেকটা বিয়ে করেন। খারাপ বলব না সৎমাকে। সংসারে মোটামুটি ভালোই ছিলাম। পিতার সংসারে অভাব না থাকায় অনেক ঝামেলা ছিল না তেমন। কিন্তু সমস্যা তৈরি করেছে আমার শরীর, শরীরের রং, আমার অনাঘ্রাতা সৌন্দর্যমাখা যৌবন। প্রাচীন প্রবাদ আছে না, আপনা মাংস হরিণা বৈরী। ক্লাসের বন্ধুরা প্রেম নিবেদন করে, চাচাতো ভাই, মামাতো ভাইরা তো পারলে পালিয়ে গিয়ে বিয়ে করে আমাকে। অথচ আমার একমাত্র সাধনা– শিল্পী হওয়ার। বিশেষ করে রবীন্দ্রসংগীত গাইতে আমার খুব ভালো লাগে। মিতা হক ছিলেন আমার আইডল। তিনি যখন ঢলে ঢলে গাইতেন, আমার মনে হতো রবীন্দ্রনাথ অলক্ষে দাঁড়িয়ে মিতাদির গাওয়া শুনছেন, এমনই ধ্যানমগ্ন ছিলেন। কিন্তু বিশিষ্ট ব্যবসায়ী আহমেদ বদরুল হকের সঙ্গে ধুম করে আমার বিয়ে হয়ে যায়। যেহেতু সংসারে বাবা ছাড়া কেউ ছিল না, প্রতিরোধ করার উপায়ও ছিল না। অবশ্য বাবার কাছে বদরুল হক কথা দিয়েছিল, বিয়ের পর আমার পড়াশোনা ও গান গাওয়ায় কোনো সমস্যা হবে না। বিয়ের কয়েক মাস কোনো সমস্যা হয়নি।
মা!
বাবু হাই তুলছে।
রুমের মধ্যে বইছে জীবনকথা, যন্ত্রণার জলপ্রপাত। সলিলের ধারণা, কুমু বুকের গহিনে অনেক দিন ধরে জমিয়ে রাখা বেদনাভারাক্রান্ত ঘটনা কাউকে বলতে চাইছিলেন। কিন্তু শোনার মতো কাউকে পাচ্ছিলেন না। হয়তো এই গভীর নির্জন রাতে আমাকে পেয়ে রবীন্দ্রসংগীতের সুরের আবহে স্থানকালপাত্র বিবেচনা না করেই নিজেকে উজাড় করে দিতে চাইছেন।
ও দুপুরের দিকে এক ঘণ্টা ঘুমায়, আজ জার্নির কারণে ঘুমুতে পারেনি।
সলিল বিছানা থেকে নামে, এখানে ওকে শুইয়ে দিই?
একটু চমকে ওঠেন কুমু। দৃষ্টি রাখেন হাতের ঘড়ির দিকে– না, রাত এগারোটা বিশ মিনিট। যে কোনো সময় বাবুর বাবা চলে আসতে পারেন– কুমু বলতে বলতে মোবাইল টিপে কানের কাছে নেন, রিং বাজছে, ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করছেন কুমু, হ্যালো তুমি কোথায়? কতক্ষণ লাগবে তোমার?
আরও আধা ঘণ্টা দেরি হবে।
কেন?
বর ও কনের সঙ্গে ঝগড়া হচ্ছে।
ঠিক আছে মিটিয়ে আসো। হাসেন কুমকুম কুমু— আরে না ভয় পাব কোনো? তুমি বর-কনের ঝগড়া মিটিয়ে আসো। আমি আর বাবু রুমে আছি। বাই।
ফোন কেটে দেন কুমু, তাকায় সলিলের দিকে, এমন সুন্দর সময় আমি অনেক দিন পাইনি। আমি আমাকে নিয়ে গল্প করা একদম ভুলে গিয়েছিলাম। আমি যে আমি সেটাও মনে ছিল না।
বিয়ের পর আপনার স্বামী গান গাইতে নিষেধ করে দিয়েছেন না? জানতে চাইলেন সলিল সুজন।
আমাকে সরাসরি বাবুর বাবা গান গাইতে, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করতে নিষেধ করেননি।
তাহলে?
বাবুর দাদি আমার সামনে পাহাড় হয়ে দাঁড়ালেন। আমি পরে বুঝতে পেরেছি– মা ও ছেলের পরিকল্পনায় ঘটনা ঘটছে। বাবুর দাদি আমাকে বললেন, আমাদের বাড়ির ছেলের বউ গান গাইবে, বাড়ির জন্য অসম্মানজনক। আর বড় ব্যাপার, ধর্মে নিষেধ আছে। আমরা ধর্মের বাইরে যেতে পারব না।
খুব লো ভলিউমে মোবাইলে বেজে চলেছে রবীন্দ্রনাথের গান বিভিন্ন শিল্পীর কণ্ঠে। মুখোমুখি সুজন আর কুমু। বাবু ঘুমিয়ে গেছে। অনেকটা জোর করেই বাবুকে তুলে নিজের বিছানার ওপর শুইয়ে দেয় সলিল।
আপনি মানুষটা অন্যরকম– মন্তব্য করেন কুমু।
হাসে সলিল, এবং সেই থেকে আপনার গান গাওয়া বন্ধ?
আমি বাবুর বাবার কাছে জানতে চাইলাম– বিয়ের সময়ে তো আমাকে ওয়াদা করেছিলে, আমি গান গাইতে পারব।
স্বভাবসুলভ মৃদু কণ্ঠে জবাব দেয় বদরুল হক, কুমকুম আমি তো গান গাইতে তোমাকে বাধা দিচ্ছি না এবং কখনও দেব না। আমার ওয়াদা তো ওয়াদাই।
কিন্তু আমার শাশুড়ি আম্মা...
ওটা তোমার আর তোমার শাশুড়ির ব্যাপার। এ বিষয়ে আমাকে না জড়ানোই ভালো।
মানে তুমি মাকে কিছু বলবে না?
কোনো ছেলের কি উচিত মায়ের নীতি ও আদর্শের বাইরে যাওয়া? সরি, কুমু আমি তেমন ছেলে নই–
আপনাকে ফাঁদে আটকে...
গভীরতম একটা দীর্ঘশ্বাস ত্যাগ করেন কুমু, আপনি বুঝতেই পারছেন। ইতোমধ্যে পেটে কন্যা চলে এসেছে। কোথাও কোনো শিকল নেই, দড়ি নেই, দেয়াল নেই কিন্তু আমি বন্দি হয়ে গেলাম।
হঠাৎ হালকা বজ্রপাতের শব্দ শুনতে পায় জানালার বাইরে এবং সঙ্গে সঙ্গে বৃষ্টি। সলিল উঠে বাকি জানালাটাও খুলে দেয়। বৃষ্টির ছাট রুমের মধ্যে প্রবেশ করে অলৌকিক সুন্দরের দৃশ্যপট তৈরি করে। নিকটেই তীব্র শব্দে বজ্রপাত হলো, আকাশে দেখা দেয় বিদ্যুতের তীব্র ঝলক। সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যুৎ চলে যায় হোটেল ও মাইজদী শহর থেকে। জানালার দিক থেকে হাতড়ে ফিরতে ফিরতে সলিল অভয় দেয়, কুমু আপনি ভয় পাবেন না। আমি আসছি...
অন্ধকারে সামনে বাড়ানো সলিলের হাতের স্পর্শ লাগে বসে থাকা কুমুর মুখের ওপর। সরি– আমি বুঝতে পারিনি।
হাসেন কুমকুম কুমু, আমি জানি।
রুমের মধ্যে হঠাৎ অন্ধকারের মুখোমুখি দুজনে বসা। বাইরে বজ্রপাত আর বৃষ্টি। কুমকুম কুমুর মোবাইলে ফোন আসে বদরুল হকের, তুমি কী করছো?
রুমের মধ্যে শুয়ে আছি বাবুকে নিয়ে। হ্যাঁ বাবু ঘুমিয়েছে।
জানালা আটকে দাও।
আমি অন্ধকারে জানালার কাছে যেতে পারব না। তুমি কতক্ষণে আসবে?
আসতে দেরি হবে, তুমুল বৃষ্টি, চোখে কোনো কিছু দেখা যায় না। তুমি শুয়ে পড়।
ওকে।
অন্তত মোবাইলে গান শুনতে পারতেন! বলল সুজন।
গাইতে না পারলেও আমি মোবাইলে গান লোড করে শুনতাম কিন্তু একদিন আমার শাশুড়ি মোবাইল নিয়ে সব গান ডিলিট করে দিলেন। বললেন– গান গাওয়া যেমন হারাম, গান শোনাও। এরপর আমি সুরহীন পৃথিবীর এক মানুষে পরিণত হলাম। অনেক দিন বা বছর পর আজ আপনার রুমের সামনে দিয়ে যাওয়ার সময়– ‘তুমি কেমন করে গান করো হে গুণী, আমি অবাক্ হয়ে শুনি...’ রবীন্দ্রসংগীতটা শুনে দাঁড়িয়ে গেলাম আপনার দরজায়, কোনো অনুমতির প্রার্থনা না করেই। হয়তো আপনি আমাকে কোনো নির্লজ্জ ভেবেছেন, গলা ধরে আসে কুমুর, আমাকে ক্ষমা করবেন।
ক্ষমা আপনাকে করতে পারব না কিন্তু যতদিন বেঁচে থাকব আপনার দেওয়া এই রাত্রির গান চিরকাল আমি মনে রাখব।
অন্ধকারে কুমকুমের মুখে হাসি ফোটে বাইরের বিদ্যুৎ ঝলকের মতো, আমিও মনে রাখব।
সত্যি রাখবেন? সাবধানে গভীর গোপনে জানতে চান সলিল।
বিশ্বাস করুন, মনে রাখব। হয়তো আলোয় মনে না পড়লেও অন্ধকারে আপনি ও রবীন্দ্রনাথ আমার মনের সামনে আসবেনই।
আমার মনে হয়, অন্ধকারে আমার রুমে আপনার আর ঘুমন্ত বাবুর থাকা ঠিক হচ্ছে না।
আমিও ভাবছি।
চলুন, পৌঁছে দিয়ে আসি।
অন্ধকার তো।
মোবাইলের আলোতে যাওয়া যাবে।
ঘুমন্ত বাবুকে বুকের সঙ্গে জড়িয়ে রুম থেকে বের হয়ে আসে সলিল। পেছনে মোবাইলের আলো জ্বালিয়ে আসছেন কুমু। দুই রুম পরের রুমের সামনে দাঁড়িয়ে নিজের ব্যাগ থেকে চাবি বের করে দরজা খোলে। পেছনে সলিলের কাঁধের ওপর ঘুমন্ত বাবু। ভেতরে ঢুকে বিছানার ওপর বাবুকে শুইয়ে দিয়ে তাকায় জানালার দিকে– খোলা জানালা বন্ধ করে দিই?
দিন।
সলিল জানালা দুটো বন্ধ করে রুমের মধ্যখানে আসে, ছেলের পাশে আরেকটা বালিশে আধ হেলান দিয়ে আধশোয়া কুমু। দুজনার হাতে মোবাইলের আলো। দুজনে তাকায়, চোখ নামিয়ে নেয়। বাতাসে দরজার পর্দা উড়ছে হালকা বাঁয়ে।
আমি আসি, আপনি দরজাটা দিন– দরজার দিকে পা বাড়ায় সলিল।
আমার ভয় লাগবে দরজা লাগাতে।
তাহলে?
আপনি বসুন সোফায় যতক্ষণ আলো না আসে, বিনম্র গলা কুমকুমের।
ঠিক আছে, কিন্তু আমার রুমের দরজা খোলা, বন্ধ করে আসি?
দ্রুত আসবেন, নইলে আমি ভয়ে মরে যাব।
দ্রুতই আসছি... রুম থেকে ঝড়ের গতিতে বের হয়ে যায় সলিল। নিজের রুমে এসে টেবিলের ওপর রাখা তালা-চাবি এনে দরজা বন্ধ করে কেবল কুমকুমের রুমের দরজায় দাঁড়িয়েছে, তখনই বিদ্যুৎ চলে আসে। চারদিকটা আলোয় ভরে ওঠে। অসহায় লাগে সুজনের। বোকা বোকা দৃষ্টিতে সব পৌরুষের শক্তি জোগাড় করে তাকায় কুমুর দিকে, আসি!
কুমকুম অতল গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে অজস্র আশা ও হতাশায়। তালা খুলে রুমের মধ্যে ঢুকে কুমকুম যে সোফায় বসেছিল, সেই সোফায় পাথরের মতো বসে থাকে– সত্যি কুমকুম নামে সেই গান্ধর্ব নারী এসেছিল আমার এই রুমে? নিজেকে বিশ্বাস করাতে পারছে না সলিল সুজন।
- বিষয় :
- গল্প